পাহাড়ে চাঁদাবাজি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪১ এএম
আমাদের তিন পার্বত্য জেলাÑ রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। শান্ত এই পাহাড়ি জনপদ কখনও নানা চক্রান্তে, কখনও গুজবে, কখনও-বা তুচ্ছ কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে হঠাৎই অশান্ত হয়ে ওঠে। সম্প্রতি খাগড়াছড়িতে এক মারমা কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এর বিচার চাওয়ার দাবিতে সংগঠিত ‘আন্দোলন’কে কেন্দ্র করে প্রাণ গেছে তিনজনের। সেনা সদস্যসহ আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন। গুইমারায় পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে বেশ কয়েকটি দোকানপাট ও বসতি। যদিও ধর্ষণ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ডাক্তারি পরীক্ষায় প্রমাণ হয়েছে, কিশোরীটি ধর্ষণের শিকার হয়নি তবুও এই অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামে উদ্বেগ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে একের পর এক ভুয়া ভিডিও, অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে তাতে সহিংসতাকে আরও উস্কে দেওয়া হয়েছে। এসবের উৎস খুঁজে বের করা এবং সেটা বন্ধে প্রশাসন এবারও ব্যর্থ হয়েছে, যা দুঃখজনক। এদিকে টানা অবরোধে ভেঙে পড়েছে পাহাড়ের অর্থনীতি আর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। রোজগার হারিয়েছেন পাহাড়ের প্রান্তিক চাষি, ছোট দোকানি থেকে পরিবহন কিংবা হোটেল-মোটেল মালিক-শ্রমিকরা। এর প্রভাব পড়েছে পাহাড়ের পুরো অর্থনীতিতে। অবরোধ স্থগিত করা হলেও এবং পরিস্থিতি এখন কিছুটা শান্ত হলেও আবার যে উত্তেজনা বাড়বে না তা হলফ করে বলা যাচ্ছে না।
পার্বত্য অঞ্চলে অশান্তি, সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার বিষয়গুলো নতুন নয়। এখানকার জাতিগত বৈচিত্র্য, বিবদমান বিভিন্ন উগ্রবাদী গোষ্ঠী বা সংগঠনের তৎপরতায় পাহাড়ের অস্থিরতা যেন এক জটিল বাস্তবতা। সাম্প্রতিক সময়ে অশান্তির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে চাঁদাবাজি। পাহাড়ের প্রতিটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে একাধিক গোষ্ঠীর চাপ, অবৈধ টোল ও চাঁদা দাবির কারণে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও কৃষকরাও দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। এই দুষ্টচক্রটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই করছে না, পাহাড়ি অঞ্চলের সামাজিক শৃঙ্খলাও ভেঙে দিচ্ছে। কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়োজিত ঠিকাদাররাও চাঁদাবাজ চক্রের কবল থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। দেখা গেছে, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠন নিজেদের রাজনৈতিক দাবিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। বলা হচ্ছে, এই অর্থ পাহাড়ি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষ এর সুফল পাচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষ আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জন-আস্থা কমছে।
১ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘পাহাড়ে অশান্তির নেপথ্যে চাঁদাবাজি’ শীষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সশস্ত্র চাঁদাবাজদের দাপটে অতিষ্ঠ তিন পার্বত্য জেলার মানুষ। জানা গেছে, তিন পার্বত্য জেলায় কমপক্ষে ১৫টি সম্প্রদায়ের বসবাস। যাদের একটি অংশ কুকি-চিন, জনসংহতি সমিতি জেএসএস, ইউপিডিএফ ও ম্রো ন্যাশনাল পার্টির (এমএনপি) সক্রিয় সদস্য। এসব সংগঠনের একাধিক সদস্য রয়েছে চাঁদাবাজের তালিকায়। পাহাড়ের বাসিন্দাদের অধিকার নিশ্চিত করা আর শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার থাকতে দেখা গেলেও নেপথ্যে এসব সংগঠন চাঁদাবাজিতে সক্রিয়। গোয়েন্দাদের দাবি, ভারতের মণিপুর, মিজোরাম ও মিয়ানমারের চিন রাজ্য তাদের অন্যতম ঘাঁটি। এই চাঁদার অংশ যায় ওইসব ঘাঁটিতে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সেখান থেকেই এই অঞ্চলে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে। আরও জানা গেছে, গত ৭ মাসে পাহাড়ে ১০১টি চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে। সবশেষ ধর্ষণ ঘটনায় তোলপাড়ের আগে গত ২৫ মার্চ খাগড়াছড়ির লারমা বাজারে আগুন দেয় সন্ত্রাসীরা। অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ২৪টি দোকান পুড়ে একেবারে নিঃস্ব হন ৩০ ব্যবসায়ী। অভিযোগ রয়েছে, ঈদ ও বৈসাবি উৎসবমুখর পরিস্থিতিতে চাঁদা না দেওয়ায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে পাহাড়িদের একটি অংশ। আর এসব তৎপরতাই দাবিয়ে রাখছে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি।
আমরা মনে করি, এই চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। কারণ, সরকারি তহবিল থেকে পাহাড়ের উন্নয়নে হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও চাঁদাবাজির কারণে সেই সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে না। ফলে যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাক্ষেত্র উন্নত হওয়ার বদলে এক ধরনের অচলাবস্থা বিরাজমান। এতে তরুণদের কর্মসংস্থানের পথও সংকুচিত হচ্ছে। ফলে তাদের একটি অংশ উগ্রবাদসহ নানা অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে প্রশাসনকে এগোতে হবে, যাতে সবাই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরব হয়। তৃতীয়ত, পাহাড়ের জন্য বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা কার্যকর করতে হবে, যাতে স্থানীয় জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়।
বলা বাহুল্য, পাহাড়ের মানুষ শান্তি চায়। কিন্তু চাঁদাবাজির অভিশাপ সেই শান্তিকে প্রতিনিয়ত বিনষ্ট করছে। এখন সময় এসেছে, সরকার ও স্থানীয় জনগণ একযোগে এই দুষ্টচক্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর। তাহলেই পাহাড় আবার উন্নয়ন, শান্তি ও অগ্রগতির পথে অগ্রসর হবে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর, যে ধর্ষণের ঘটনাকে উপলক্ষ করে এই আন্দোলন তার সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার ‘ধর্ষণের কোনো আলামত পাননি’ বলে জানিয়েছেন পরীক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়া চিকিৎসকরা। স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, কেন এই আন্দোলন? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে প্রশাসনকে। আমরা চাই, খাগড়াছড়ির কিশোরী ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত বাকি দুজনকে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক। সহিংসতা, অগ্নিকাণ্ড, লুটপাটের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হোক। যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়িয়ে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি। সহিংসতায় নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি। পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সর্বোপরি পাহাড়ি ও বাঙালি অধিবাসীদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।