× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিদেশি সংবাদমাধ্যম

স্বাধীনতার ঘোষণা : বয়ান ও বাস্তবতা

ফাহাদ বিন মর্তুজা, ইন্ডিপেনডেন্ট রিসার্চার

প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৫ ১২:১৭ পিএম

স্বাধীনতার ঘোষণা : বয়ান ও বাস্তবতা

২০০৯ সালে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদের হাইকোর্ট বেঞ্চ ডা. এমএ সালামের দায়ের করা এক জনস্বার্থ রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রায় দেনÑ জিয়াউর রহমান নন, শেখ মুজিবুর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আদালতের রায়ে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তারের পূর্বেই শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া মওদুদ আহমদের লেখা ‘ইরা অব শেখ মুজিব’ এবং জিয়াউর রহমানের ১৯৭২ ও ১৯৭৭ সালের দুটি বক্তব্য উল্লেখ করে বলা হয়Ñ জিয়াউর রহমান নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেননি। মওদুদ আহমদের বইয়ে তার নিজস্ব কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি, বইটিতে কেবল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ তারিখে প্রণীত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের উল্লেখ রয়েছে (পৃষ্ঠা ৫), আর এটা মনে করা অস্বাভাবিক যে জিয়াউর রহমান নিজের কীর্তি নিজে প্রচার করতে থাকবেন, ফলে বিচারকদ্বয় যে কারণ দেখিয়ে রায় দিয়েছেন তা ছিল বিস্ময়কর।

শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে রায় দেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে বিচারক কেন ইতিহাস লেখার দায়িত্ব নিলেন? এ ছাড়া কোন আইনি প্রক্রিয়ায় এ রায় দেওয়া হয়েছে তার একটি সঠিক ব্যাখ্যা দরকার। কারণ বাংলাদেশে দ্য অ্যাভিডেন্স অ্যাক্ট (অ্যাক্ট নং ১ অব ১৮৭২) থেকে সেকশন ৮১ বাদ দেওয়ার কারণে পত্রিকাকে সাধারণত প্রমাণ (অ্যাডমিসিবল প্রুফ) হিসেবে বিবেচনা করা হয় না [ওমিটেড বাই সেকশন ৩ অ্যান্ড সেকেন্ড সিডিউল অব দ্য বাংলাদেশ ল’স] (রিভিশন অ্যান্ড ডিক্লারেশন) অ্যাক্ট ১৯৭৩; ভারতে সেকশন ৮১ থাকলেও সুপ্রিম কোর্টের আদেশে পত্রিকাকে অ্যাডমিসিবল প্রুফ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না)। আরও বড় পরিসরে যে প্রশ্নটি সাধারণভাবে করা যায় তা হলো, সংবাদপত্রের ওপর ভিত্তি করে প্রমাণ করা যায় কিনা শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন? 

১৯৭১ সালে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো প্রধানত দুটি সংবাদ-উৎস থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণার কথা জানায় : একটি হচ্ছে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম (যেমন, পিটিআই বা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া, ইউএনআই বা ইউনাইটেড নিউজ অফ ইন্ডিয়া), অপরটি হচ্ছে সামরিক সরকারের অধীনস্থ পাকিস্তান রেডিও। পত্রিকায় যা লেখা হয়, বিশেষ করে ভারতীয় সংবাদপত্রেÑ তা সব সময় সঠিক হয় না, যেমনÑ স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কিত সংবাদ দেওয়ার সময় বিদেশি পত্রিকা শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মগোপনে (আন্ডারগ্রাউন্ড) থাকার কথা জানায় (ইস্ট পাকিস্তান কাট অব ফ্রম ওয়ার্ল্ড এজ হেভি ফাইটিং রকস সিটিস, মার্চ ২৬ ১৯৭১, আসাহি ইভেনিং নিউজ), এটা ভুল তথ্যÑ শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, আত্মগোপনে যাননি। এ ছাড়া ২৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখে রেডিওতে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার সংবাদটিতে একাধিক পত্রিকা ভুল করে মেজর জিয়াউর রহমানের নাম ‘মেজর জিয়া খান’ লিখেছে (এসব পত্রিকার মধ্যে রয়েছে, মার্চ ২৯, ১৯৭১ : দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য সিডনি মর্নি হেরাল্ড, দ্য ম্যানিলা টাইমস; মার্চ ৩১, ১৯৭১, 1971 : দ্য ব্যাংকক পোস্ট, দ্য টাইমস অব লন্ডন, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া), এসব পত্রিকাগুলোর মধ্যে অনেক পত্রিকা খবরের উৎস হিসেবে ইউএনআই (জিয়া খানস অ্যাপিল ফর রিকগনিশন, মার্চ ৩০, ১৯৭১, দ্য সেস্টসম্যান), পিটিআই (কনফিউজিং ওয়ার রিপোর্টস ইন পাকিস্তান, মার্চ, ২৯, ১৯৭১, সান ফ্রানসিসকো ক্রোনিক্যাল) কে উল্লেখ করেছে। এমনকি ইউপিআই (ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল) লিখেছিল, শেখ মুজিব মরিচের গুঁড়া, সোডার বোতল নিয়ে পাকিস্তানিদের প্রতিহত করতে বলেছেন (ইস্ট পাকিস্তান সিডিউজডস, সিভিল ওয়ার ব্রেক আউট, মার্চ ২৭, ১৯৭১, দ্য বোস্টন গ্লোব)!

সুতরাং ইউএনআই, পিটিআিই, ইউপিআই থেকে তথ্য নিয়ে যেসব পত্রিকা স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে লিখেছিল (যেমন, বাংলা দেশ ডিক্লেয়ারস ইনডিপেনডেন্সÑ স্ট্রেট ফাইটিং ইন ঢাকা অ্যান্ড চিটাগাং, দ্য স্টেটসম্যান (কালকাট্টা); বাংলা দেশ ডিক্লেয়ারস ফ্রিডমÑ রহমানস স্পেপ ফলোস আর্মি ক্রাকডাউন, দ্য স্টেটসম্যান (নিউ দিল্লি); বেঙ্গলি ইনডিপেনডেন্টস ডিক্লেয়ার বাই মুজিব, বুয়েন্স আয়ারস হেরাল্ড, আর্জেন্টিনা; মুজিব স্টেপস আপ ইনডিপেনডেন্ট রিপাবলিক, হংকং স্টান্ডার্ড) সেসব পত্রিকার খবর নির্ভুল ছিল, এটা মনে করার কারণ নেই। রেডিও থেকে শুনেও যদি নাম ভুল হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, শেখ মুজিব ঘোষণা দিয়েছেন, এমন তথ্য পত্রিকাগুলো কতটা যাচাই করে দিয়েছিল।

পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের বহিষ্কার করার কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কিত তথ্যগুলো বেশিরভাগ বিদেশি সংবাদপত্র নিজেদের সংবাদদাতার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে সংগ্রহ করতে পারেনি, ওই সময় পূর্ব পাকিস্তান থেকে খবর সরাসরি সংগ্রহ করা যাচ্ছিল না (১০,০০০ সিভিলিয়ানস রিপোর্টেড কিলড ইন বেঙ্গল স্ট্রেইপ, নিউ দিল্লি, মার্চ ২৭, ১৯৭১, রয়টার, বালটিমোর সান)। মাত্র ৩ জনের নাম জানা যায় যারা ঢাকায় ১৯৭১ সালের ২৫ থেকে ২৭ মার্চের মধ্যে সংবাদ সংগ্রহ করেন, তারা হলেন সাইমন ড্রিং, আরনল্ড জেটলিন এবং ফটোগ্রাফার মাইকেল লরেন্ট। তাদের সরবরাহকৃত সংবাদ, ছবি যেসব পত্রিকা প্রকাশ করেছে, সেসব পত্রিকা ছাড়া বাকি অন্য সব পত্রিকা ভারত ও পাকিস্তানে অবস্থিত বিভিন্ন ব্যক্তি, সংস্থার সাহায্য নিয়ে খবর প্রকাশ করেছিল। কৌতূহলোদ্দীপক হচ্ছে, সাইমন ড্রিং ১৯৭১ সালে সরাসরি জানতে পারেননি যে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। ব্যক্তিগত ভাবে ই-মেইলে আরনল্ড জেটলিন এর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘ আই ডিড নট হেয়ার আইদার শেখ মুজিবস সাপোসজড ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স অর দ্য ওয়ানস ব্রডকাস্ট ফ্রম চট্টগ্রাম।’ (৭ আগস্ট, ২০১৭, ই-মেইল)। ঢাকায় থাকা সাংবাদিকরা যারা সে সময়ে সরাসরি ঢাকা থেকে খবর সংগ্রহ করেছিল, তারা কেউই শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়ে জানেন না। তাই যেসব সাংবাদিক বিদেশে ছিল তাদের সাক্ষ্যতে শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া প্রমাণ হয় না। সাংবাদিক ডেভিড লোশাকের একটি বই নিয়েও ভুল ইতিহাস প্রচার করা হয়েছে (পাকিস্তান ক্রাইসিস : ডেভিড লোশাকের দাবি সঠিক নয়, ফাহাদ বিন মর্তুজা, ১৩ মে ২০২৫, দৈনিক দিনকাল) যদিও ডেভিড লোশাক তখন ভারতে থেকে সংবাদ প্রকাশ করছেন (বিশ্ব সংবাদপত্রে স্বাধীনতা যুদ্ধ, আবদুল্লাহ জাহিদ, ২৯ মার্চ ২০১৯, প্রথম আলো)।

পাকিস্তানি সংবাদ মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত খবর প্রসঙ্গে আসার আগে আমাদের মনে রাখতে হবে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চেয়ে কেউ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনা যায়, তাই শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন প্রচার করে পাকিস্তানি সামরিক শাসক পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশে হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধ গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করে থাকতে পারে। এ ছাড়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার অপরাধে নিয়ন্ত্রিত আদালতে শেখ মুজিবুর রহমানের শাস্তি দেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়, তাই পাকিস্তান সামরিক শাসকের অধীনস্থ সংবাদমাধ্যম (যেমন, পাকিস্তান রেডিও) থেকে প্রচারিত শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার খবরটি বস্তুনিষ্ঠ নয়। মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান রেডিও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে অনেক মিথ্যা খবর প্রচার করেছিল। তাই পাকিস্তান রেডিওর মাধ্যমে যেসব বিদেশি পত্রিকা শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণা দেওয়ার খবর জানিয়েছিল (যেমন, ২৭ মার্চ ১৯৭১ : লিডার অব রিবেলস ইন ইস্ট পাকিস্তান রিপোর্টেড সিজড, নিউইয়র্ক টাইমস; রিবেল লিডার অ্যারেস্টেড ইন পাকিস্তান ওয়ার, দি ওয়াশিংটন পোস্ট; পাকিস্তান শেখ অ্যারেস্টেড, শিকাগো ট্রিবিউন), সেসব পত্রিকার খবরের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়, একই কারণে ১৯৮৮ সালে মুসা সাদিক ও রেজাউর রহমানের নেয়া টিক্কা খানের সাক্ষাৎকারে মুজিবের ঘোষণা দেওয়ার যে দাবি করা হয় তা অগ্রহণযোগ্য, যেখানে পাবলিক রিলেশন অফিসার সিদ্দিক সালিক সামরিক আউটডোর অপারেশন রুমে থেকেও ঘোষণার কথা জানতে পারেনি (উইটনেস টু স্যারেন্ডোর, সিদ্দিক সালিক, ইউপিএল, ২০১৭, পেজ ৭২,৭৫) সেখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিক্কা খান কীভাবে জানলেন, তার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নেই।

একইভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বিদেশি টেলিভিশন, রেডিওতে প্রচারিত শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কিত খবরটি সঠিক কি না তা যাচাই না করেই প্রচার করা হয়েছে। কোনো পত্রিকা বা সংবাদ মাধ্যম যখন একটি খবর প্রকাশ করে, তখন সেই খবরের উৎস কী এবং তা কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটা বিবেচনা করতে হবে। উপরিউক্ত কারণে ১৯৯৬ সালে করা স্যার এডওয়ার্ড হিথের দাবিও (বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে স্যার এডওয়ার্ড হিথ, মুসা সাদিক, ১৬ মার্চ ২০২৩, ইত্তেফাক) গ্রহণযোগ্য থাকে না। অতএব বিদেশি সংবাদ মাধ্যমের খবরের ভিত্তিতে প্রমাণ করা যায় না শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা