আইসিডিডিআরবির তথ্য
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৫ ১২:১০ পিএম
দেশে পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী কর্মীদের বাল্যবিবাহ ও কিশোরী বয়সে গর্ভধারণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এই কর্মীদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশির (৬৬ শতাংশ) ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, তাদের অধিকাংশই অপ্রাপ্ত বয়সে প্রথমবারের মতো গর্ভধারণ করে। একই সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও গর্ভপাতের হারও এদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি। এসব তথ্য উঠে এসেছে ‘তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে উত্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে। গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার সহায়তায় আইসিডিডিআরবি ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর কড়াইল ও মিরপুর বস্তি এবং গাজীপুরের টঙ্গী বস্তিতে আইসিডিডিআরবির আরবান হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেলেন্সের আওতাধীন এলাকায় গবেষণা কার্যক্রমটি পরিচালিত হয়। এ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় ১৫ থেকে ২৭ বছর বয়সি মোট ৭৭৮ জন বিবাহিত নারী গার্মেন্ট শ্রমিককে। তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের বাল্যবিবাহ ও কিশোরী বয়সে গর্ভপাতের যে চিত্র উঠে এসেছে তা আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করে।
শুধু গার্মেন্ট কন্যারাই নয়, দেশের আপামর নারীদের বিষয়েও একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক সংস্থা ইউএনএফপিএর বার্ষিক প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়, দেশের ৫১ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ১৮ বছর হওয়ার আগেই। আবার ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি এক হাজার মেয়ের মধ্যে ৭১ জন এক বা একাধিক সন্তানের মা। বাল্যবিবাহ ও কম বয়সি মেয়েদের সন্তান জন্ম দেওয়ার এই তথ্য চলতি বছরের জুন মাসে ইউএনএফপিএর বৈশ্বিক জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২৫ বিষয়ক প্রতিবেদনে প্রকাশ করে।
‘নাবালিকা থাকতেই বিয়ে হয় বেশিরভাগ গার্মেন্ট কন্যার’ শিরোনামে প্রকাশিত আইসিডিডিআরবির গবেষণা প্রতিবেদনের সূত্র ধরে প্রতিদিনের বাংলাদেশে বলা হয়, দেশের বেশিরভাগ গার্মেন্ট কন্যার অনেকেই সন্তানের জন্ম দেন ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই। সচেতন প্রতিটি মানুষেরই জানা, বাল্যবিবাহ বেশি হওয়ার কারণে কিশোরীদের গর্ভধারণ বাড়ে। কিশোরী মা হলে তার মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে, সন্তানের মৃত্যু বা অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। বাল্যবিবাহ ও কিশোরী মাতৃত্বের এই দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
কমবেশি প্রায় সবাই জানি বাল্যবিবাহ অপরাধ। এর জন্য শাস্তির ব্যবস্থা আছে। তারপরও বাল্যবিবাহ থেমে নেই। বাল্যবিবাহ রোধে আমাদের খুঁজে দেখা প্রয়োজন কেন বাল্যবিবাহ-প্রবণতা বেড়েছে? কেন বাল্যবিবাহ থামানো যাচ্ছে না? বাল্যবিবাহ কারা দেন? বাল্যবিবাহ দেন প্রধানত মা-বাবা। জড়িত থাকে আত্মীয়স্বজনসহ সমাজের কিছু মানুষ। বাল্যবিবাহের জন্য অভাব এবং দারিদ্র্যও কম দায়ী নয়। আবার অনেক সময় সামাজিক নিরাপত্তা শঙ্কা থেকেও অনেক অভিভাবক কিশোরী কন্যাকে বাল্যবিবাহ দিতে বাধ্য হন। পারিপার্শ্বিকতা থেকে বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন যখন কন্যার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পান না তখন অনেকে সন্তানকে স্কুলে পাঠান না, আবার যারা সন্তানকে কাজে দেন তাদের মধ্যেও অনেক সময় যৌন হয়রানির ভয় থাকে। এসব ক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হলে বাল্যবিবাহের হার কমে আসবে। সেই সঙ্গে এ সমস্যা থেকে পুরোপুরি উত্তরণে প্রয়োজন আমাদের মা-বাবার মানসিকতার পরিবর্তন। তাদের মধ্যে যদি সমৃদ্ধ জীবন সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা যায়, তাহলেও বাল্যবিবাহের প্রবণতা কমে আসবে। আমরা মনে করি, এজন্য সরকার, এনজিও সবাইকে স্ব-স্ব জায়গা থেকে কাজ করতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, বাল্যবিবাহ এবং কিশোরী বয়সে মা হওয়া শুধু এই নারীদের জন্যই বিপজ্জনক নয়, এটি আমাদের নারীর উন্নয়নেও অন্তরায়।
আমরা মনে করি, বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হলে মেয়েদের জন্য ব্যাপক বিনিয়োগ করতে হবে। তাদের শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তাসহ কিছু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা কঠিন হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজন ব্যাপক গণসচেতনতা। এজন্য সরকারি-বেসরকারি উভয় তরফ থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। গণমাধ্যমকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সবাই মিলে কাজ করলেই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ সম্ভব। এজন্য নেতৃত্ব দিতে হবে মহিলা ও শিশু-বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে। মনে রাখতে হবে, কেবল আপনার–আমার সচেতনতা এবং প্রত্যক্ষ ভূমিকাই পারে বাল্যবিবাহ থামাতে। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ নামের অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।