শারদীয় দুর্গোৎসব
ড. নিখিল রঞ্জন বিশ্বাস
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৪৮ এএম
দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসব শুরুর বেশ আগে থেকেই হিন্দুসমাজে একটি সাজ সাজ রব এবং আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। এ উৎসবটি এখন সকলের কাছে একটি আকর্ষণীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। তাই দুর্গাপূজাকে সর্বজনীন দুর্গোৎসবও বলা হয়। এ উৎসবের ভেতর দিয়ে সকলের মধ্যে একটি মেলবন্ধনের সেতু তৈরি হয়। দুর্গাপূজা শরৎকালে অনুষ্ঠিত হয় বলে এটি শারদীয় দুর্গোৎসব বলেও পরিচিত। মা দুর্গা এবং তার সঙ্গীসাথিদের অবয়ব দেখে মনে প্রশ্ন জাগেÑ এসব অবয়বের পেছনে কোনো ইতিহাস আছে কি না। অথবা এর কি কোনো দার্শনিক ব্যাখ্যা আছে?
সনাতন ধর্মে সাকার ও নিরাকার উভয় প্রকার উপাসনার ব্যবস্থা আছে। উপনিষদের ঋষিরা ছিলেন মূলত নিরাকারবাদী। তারা নিরাকার ব্রহ্মোপাসনার কথা বলেছেন। ওম্ (ওঁ) ছিল সেই নিরাকার ব্রহ্মের প্রতীক। বেদে একেশ্বরবাদের কথাও আছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি’। অর্থাৎ সেই সদ্বস্তু বা ঈশ্বর এক, মানুষ তাকে বহু বলে থাকেন। বিভিন্ন দেবদেবী মূলত সেই এক ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপভেদ মাত্র। হিন্দুধর্মে পরব্রহ্ম বা ঈশ্বরের শক্তিকে মাতৃরূপে কল্পনা করে তার পূজা করা হয়। দুর্গা, কালী, চণ্ডী, লক্ষ্মী, সরস্বতী প্রভৃতি সেই ব্রহ্মশক্তিরই মাতৃরূপ। পুরাণে এই মাতৃরূপকে নানা নামে অভিহিত করা হয়েছে। বেদে বিশ্বস্রষ্টাকে ব্রহ্ম, পরমাত্মা, পুরুষ প্রভৃতি অভিধায় অভিহিত করা হয়েছে। দেবী দুর্গা এবং বিভিন্ন মাতৃদেবী ব্রহ্মশক্তিরই মূর্ত প্রতীক। শাক্তদের মতে, ব্রহ্ম এবং তার শক্তি অভিন্ন। তাই শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, ‘যেমন জল ও তাহার তরলতা, দুগ্ধ ও তাহার ধবলত্ব, মণি ও তাহার জ্যোতি, সমুদ্র ও তাহার তরঙ্গ; তেমনি ব্রহ্ম ও তাহার শক্তি অভিন্ন।’ ব্রহ্মের তিনটি শক্তিÑ জ্ঞানশক্তি, ইচ্ছাশক্তি ও ক্রিয়াশক্তি। এই ব্রহ্মশক্তি প্রকৃতির সর্বত্র বিরাজিত। দেবী দুর্গা এই শক্তিত্রয়ের সমষ্টি। তাই শ্রীশ্রীচণ্ডীতে বলা হয়েছে, যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।/ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥/ যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা / নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥
দুর্গা, গৌরী, নারায়ণী কাত্যায়নী, শিবদূতী, চণ্ডী, চণ্ডিকা, চামুণ্ডা, কালী, ভদ্রকালী, মহামায়া, জগদ্ধাত্রী প্রভৃতি শক্তিরূপিণী মূর্তি দুর্গারই বিভিন্ন নাম। বর্তমানে আমরা যে রূপে দুর্গাপূজা করে থাকি তা অনেকটাই কৃত্তিবাসের রামায়ণভিত্তিক। উক্ত গ্রন্থে বলা হয়েছে, শ্রীরামচন্দ্র তার শত্রু রাবণকে বধ করার জন্য অকালে (দক্ষিণায়নে) নিদ্রিতা দেবীর বোধনপূর্বক তার পূজা করেছিলেন। দেবীর এই অকালবোধন শরৎকালে হয়েছিল। তবে বাল্মীকির মূল রামায়ণে এ কাহিনী নেই। এই মহাপূজার কথা ভাগবতপুরাণ, বৃহদ্ধর্মপুরাণ, মার্কণ্ডেয়পুরাণ, কালিকাপুরাণ, বৃহন্নন্দিকেশ্বরপুরাণ, বামনপুরাণ, দেবীপুরাণ প্রভৃতি গ্রন্থে নানাভাবে বর্ণিত আছে। আগমসন্দর্ভ, রুদ্রযামল প্রভৃতি তন্ত্রশাস্ত্রেও দুর্গাপূজার ব্যবস্থা আছে। শ্রীশ্রীচণ্ডী মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত। সেখানে দেবী দুর্গা কর্তৃক মধুকৈটভ, মহিষাসুর প্রভৃতি অসুরদের নিধনের এবং দেবীমহিমার কাহিনী বর্ণিত আছে। বিভিন্ন পুরাণে দুর্গাপূজা সম্পর্কে একই কাহিনী নানাভাবে বিধৃত করা হয়েছে।
রামায়ণে লঙ্কার রাজা রাবণকে যেভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছে বাস্তবে সেরূপ দেখা যায় না। রামায়ণে রাবণের দশ মাথা এবং তিনি ছিলেন রাক্ষস। কিন্তু রাবণের বংশধর বর্তমান শ্রীলঙ্কাবাসীদের দশ মাথা তো দূরের কথা দুই মাথাও দেখা যায় না। আবার তারা তো মানুষ, রাক্ষস নয়। অনেকে রামায়ণে রাম-রাবণের যুদ্ধকে রূপক হিসেবে দেখেছেন। রাম-রাবণের যুদ্ধ মানে আর্য-অনার্যদের যুদ্ধ। রাম ছিলেন আর্যদের প্রতিনিধি আর রাবণ ছিলেন অনার্যদের প্রতিনিধি। শ্রীলঙ্কার মানুষেরা ছিলেন অনার্য। তাই তাদের রাক্ষস হিসেবে বর্ণনা করেছেন ঋষিকবি বাল্মীকি। কিন্তু মাইকেল মধুসূদন তার মেঘনাদবধ কাব্যে রাবণকে সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ বলেছেন আর লক্ষ্মণকে তস্কর বলে গালি দিয়েছেন। মহাভারতে বলা হয়েছে, ভগীরথ স্বর্গ থেকে গঙ্গা আনয়ন করেছেন। কিন্তু গঙ্গার উৎপত্তি তো হিমালয় পর্বত। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে মধু-কৈটভ এবং মহিষাসুরকে অসুর বলা হয়েছে। রামায়ণ-মহাভারত পুরাণের অনেক কাহিনীই রূপকের আবরণে ঢাকা। অসুর শব্দটির দ্বারা এখন দেববিরোধী বিশেষ ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে বুঝায়। কিন্তু বেদের বহু স্থলে অসুর শব্দটি ইন্দ্র এবং অন্যান্য প্রধান দেবতাদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। অসুর শব্দের মূল অর্থ বলবান বা প্রাণবান। অসুঃ= প্রাণ।
আমাদের মুনি, ঋষি এবং সাধকরা ছিলেন কল্পনাবিলাসী। তারা ঈশ্বরকে একভাবে দেখে তৃপ্তি লাভ করেননি। তাদের কল্পনায় এবং শিল্পীর আঁচড়ে দেবদেবীর এত রূপ, এত বৈচিত্র্য। কালের বিবর্তনধারায় মা দুর্গা, মা সরস্বতী, মা লক্ষ্মী এবং আরও বহু দেবদেবীর অবয়বে রূপান্তর ঘটছে নিরন্তর। তবে ভক্তের কাছে রূপান্তরের কোনো মূল্য নেই। ব্রহ্মশক্তিরূপিণী মা দুর্গা ভক্তের হৃদয়ে আগেও যেমন ছিল এখনও তেমনি আছে। পরমেশ্বর বা তার শক্তি যে রূপেই আমাদের কাছে ধরা দিক না কেন জ্ঞান-ভক্তিই আসল। জ্ঞানীরা তাকে জ্ঞানের দ্বারা জানতে চায় আর ভক্তেরা তাকে ভক্তির দ্বারা পেতে চায়। ঈশ্বর বা তার শক্তিকে মাতৃরূপে কল্পনা করে তার আরাধনা করা ভক্তের পক্ষে অতি সহজ। মা এবং সন্তানের সম্পর্ক যত গভীর তা আর কোথাও নেই। শ্রীরামকৃষ্ণ, সাধক রামপ্রসাদ প্রভৃতিরা মাতৃপূজা করেই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। তাই আমরাও প্রতিবছর মা দুর্গার চরণে পুষ্পার্ঘ্য প্রদান করে তার কৃপা লাভ করতে ব্যাকুল হই। দুর্গা শব্দের এক অর্থ যিনি দুর্গতি নাশ করেন। অন্য অর্থ যিনি দুর্গ নামক অসুরকে বধ করেছিলেন তিনি দুর্গা। পুরাণকারেরা দেবী দুর্গাকে নিয়ে যত কাহিনীই রচনা করেন না কেন আসলে তা রূপকের আবরণে ঢাকা। শুভ শক্তির প্রতিরূপ হলো জগজ্জনী দুর্গা আর অশুভ শক্তির প্রতিরূপ হলো অসুর।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের সব চেয়ে বড় উৎসব। ভারতের অন্যান্য প্রদেশের হিন্দুদের চেয়ে বাঙালি হিন্দুরা সাড়ম্বরে এবং ব্যাপকভাবে এ উৎসবটি পালন করে থাকেন। সমাজজীবনে দুর্গাপূজার তাৎপর্য অনেক ব্যাপক। দুর্গাপূজার সময় যত এগিয়ে আসে আমাদের মন ততই আনন্দে ভরে ওঠে। প্রবাসীরা ঘরে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। পিতামাতা সন্তানের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন। সাধ্যমতো সকলে ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন জামাকাপড় কেনেন এবং আত্মীয়-স্বজনদের উপহার দেন। পূজার কয়দিন বাঙালি হিন্দুদের ঘরে ঘরে আনন্দের ফোয়ারা বয়ে যায়। বিবাহিত কন্যারা স্বামীগৃহ থেকে পিতৃগৃহে আসেন। কথিত আছে, মা দুর্গাও এই সময় ভোলানাথের গৃহ থেকে পিতৃগৃহে পদার্পণ করেন। এ প্রতীকী রূপটি আমাদের সমাজজীবনে অনেক তাৎপর্যমণ্ডিত।
ছোটবেলা দেখেছি, দশমীর দিনে মা দুর্গার বিদায়ের সময় কি বিষাদের ছায়া নেমে আসত। মা-কাকিমাদের কান্নায় দুর্গামন্দির বিষণ্নতা ধারণ করত। সন্ধ্যায় মেলা থেকে ফিরে এসে শুরু হতো গুরুজনদের প্রণাম করার পালা। মা-কাকিমা-জেঠিমারা ঘরের দুয়ারে একটি থালায় করে লাড়ু-মিষ্টি ও ধান-দুর্বা নিয়ে বসে থাকতেন। যারা প্রণাম করতে আসত তাদের মিষ্টিমুখ ও আশীর্বাদ করতেন। কিন্তু এ সংস্কৃতি এখন আর তেমন দেখা যায় না। এখন দুর্গাপূজা হয়ে গেছে কেবল আনন্দ আর উৎসবের বিষয়।
দুর্গাপূজার অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিকটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দুর্গাপূজার মাধ্যমে সমাজের কিছু মানুষ তাদের পেশাকে টিকিয়ে রাখতে পারছেন এবং আর্থিক দিক দিয়ে তারা কিছুটা উপকৃত হচ্ছেন। মৃৎশিল্পী, বাজনদার, পুরোহিত প্রভৃতি পেশার মানুষেরা দুর্গাপূজার সময়ে আর্থিক দিক দিয়ে কিছুটা হলেও উপকৃত হন। দুর্গাপূজার সময় বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে। মেলায় হরেক রকমের জিনিস কেনাবেচা হয়। এর মাধ্যমেও সমাজের অর্থনৈতিক শক্তি মজবুত হয়। দুর্গাপূজার মাধ্যমে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়।