জলবায়ু
মো. অহিদুর রহমান
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:০২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
পাহাড় থেকে হাওর, সমতল থেকে সমুদ্র উপকূল, রাজশাহী থেকে ঢাকা সর্বত্রই পানির জন্য হাহাকার। দেশের পানিসম্পদ দিন দিন শেষ হয়ে আসছে। আমরা যদি পানি সমস্যার সমাধান না করি, আমাদের গ্রহটি অন্যগ্রহের মতোই হয়ে যাবে। দেশের নদ-নদী, হাওর, বিল, খাল, পুকুর ডোবা, খাড়িসহ সব জলাভূমি আজ শূন্য থাকে বছরের আট মাস। কৃষক পাচ্ছে না সেচের জন্য ভূ-উপরিভাগের পানি, ভূ-গর্ভের অদৃশ্য পানিসম্পদ ধীরে ধীরে নিচের দিকে চলে যাচ্ছে। নেত্রকোণার সীমান্ত অঞ্চলের আদিবাসীসহ সব পেশাবৈচিত্র্যের মানুষ আজ যেমন ভয়াবহ পানি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তেমনি রাজশাহীর বরেন্দ্র উপকূলের মানুষ সুপেয় এক কলসি পানির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে পানির উৎসের কাছে।
প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করেই মানুষকে টিকে থাকতে হচ্ছে এই পৃথিবীতে। মানুষ তার পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের ফলে পৃথিবীকে উত্তপ্ত করছে। জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। জলাভূমির বিলুপ্তি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, কম বৃষ্টিপাত, গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া, এলনিনোর প্রভাব, ভূমিক্ষয়, অধিক জনসংখ্যা, অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় চাষাবাদ, বনউজাড়, মাত্রাতিরিক্ত ভূ-গর্ভের পানি উত্তোলন, পানি নিয়ে রাজনীতি, জলাভূমির বিলুপ্তির কারণে বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাড়ছে মরুময়তা, সেই দুর্যোগের সঙ্গে দেশের মানুষ যুদ্ধ ও অভিযোজন করে টিকে আছে যুগের পর যুগ।
পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী খরা হয়েছিল চিলির ‘আতাকামা’ মরুভূমিতে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রাচীন অনেক সভ্যতা খরার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং পৃথিবীতে খরায় অনেক প্রাণের বিলুপ্তি হয়েছে। খরার ফলে বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হয়, বনে আগুন লাগে, খরাপীড়িত অঞ্চল উত্তপ্ত থাকে, প্রাণিসম্পদের খাদ্যের সংকট দেখা দেয়, দেখা দেয় পরিবেশগত বিপর্যয়, ভূ-গর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে যায়, উদ্ভিদের স্বাস্থ্য খারাপ হয়, রোগের সৃষ্টি হয়, কীটপতঙ্গ বাড়ে, উৎপাদন খরচ বেশি হয়, উৎপাদন কমে যায় ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৯৭৮, ১৯৭৯ সালে বড় খরা মোকাবিলা করে বাংলাদেশ। তখন শতকরা ৪২ ভাগ জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশে। ১৯৯৭ সালে দীর্ঘস্থায়ী খরায় ৫০ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতি হয়। ১০ লাখ টন ধান ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মরুকরণকে গুরুত্ব দিয়ে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় মরুকরণের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী এক আহ্বান জানানো হয়। ১৯৭৭ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে জতিসংঘ বিশ্ব মরুকরণ বিষয়ক সম্মেলন আয়োজন করে। ১৯৯৪ সালের ১৪ নভেম্বর জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক মরুকরণ প্রতিরোধ সনদ ঘোষণা করে। আমরা যদি এ মুহূর্তে সতর্ক হতে পারি তাহলে হয়তো বিপর্যয় কিছুটা ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে।
১৯৯৪ সালের জুন মাসে কনভেনশনের দলিল চূড়ান্ত করা হয়। এই কনভেনশনে ৫০টি দেশ কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার পর ১৯৯৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়। বাংলাদেশও এই কনভেনশন অনুমোদন করে। পরবর্তীতে খরা ও মরুকরণ সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করে তুলতে ১৭ জুন পালন করা হয় বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস। ভূমি পুনরুদ্ধার, মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধের প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে চলতি বছর পালিত হয়েছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। তবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল নতুন করে মরুকরণ ও খরার ঝুঁকিতে রয়েছে।
আমাদের বাংলাদেশে খরার প্রবণতা আছে কিন্তু মরুকরণ এখনও শুরু হয়নি। খরা, মরুময়তা ও মরুভূমি এক নয়। সব শেষ ‘মরুভূমি হয়ে গেল এমন না’। হাজার বছর আগেও এই উপমহাদেশে খরা ছিল। জাতিসংঘের বিশ্ব পানি উন্নয়ন প্রতিবেদন থেকে তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের সেচের পানির ৮৬ শতাংশ ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা হয়। সেচের ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে দেশগুলোর শীর্ষ পাঁচে রয়েছে বাংলাদেশ। মোট সেচের পানির প্রায় ৯৪ শতাংশ ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করে শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তান। এর পরেই সৌদি আরব তা ৯২ শতাংশ, ভারতে ৮৯ শতাংশ, সিরিয়ায় ৮৭ শতাংশ, মেক্সিকোতে ৭২ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৭১ শতাংশ।
আমাদের দেশে খরাকে প্রকৃতির সুরক্ষার জন্য এখনও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে বলে মনে হয় না। খরা নিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিবেশগত রাজনৈতিক অবস্থানটিও অস্পষ্ট। আমরা জানি খরার এক অন্যতম কারণ অনাবৃষ্টি, তীব্র তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘ অনিয়মিত বৃষ্টিপাত। দীর্ঘ খরা মাটি, পানি, শস্যদানা থেকে গাছপালা, মানুষের খাদ্য থেকে শুরু করে বাস্তুতন্ত্রেও সর্বত্রই প্রভাব পড়ে। খরার করুণ যন্ত্রণা পোহাতে হয় মাটিকে। মাটি এ ক্ষেত্রে সব রস জল হারিয়ে হয়ে পড়ে নিঃসাড় ও কৃষকের চাষের অনুপযোগী। মাটির তলার পানি টেনে তুলতে তুলতে আজ ভূ-গর্ভস্থ পানি আজ অনেক গভীরে চলে গেছে। আর এসবই হয়েছে কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের নামে।
পরিবর্তন হচ্ছে পৃথিবীর। উত্তপ্ত হয়েছে পৃথিবীর বাতাস, এ পরিবর্তনের ফলে কখনও ঘূর্ণিঝড়, কখনও ভূমিকম্প, কখনও অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, কখনও বন্যা, কখনও বিভিন্ন রোগবালাই দুর্যোগ হয়ে হাজির হয়েছে। মারা যাচ্ছে মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাঠের পর মাঠ ফসল। বাড়ছে খাদ্য সংকট। মানুষ হচ্ছে উদ্বাস্তু । ফলে মানুষ হারাচ্ছে তার মাথা গোঁজার ঠাঁই।
বিশ্বের জলাভূমির ৭০ শতাংশ এরই মধ্যে হয়ে পড়েছে মরুকবলিত। সুতরাং মরুকরণ ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য এক বিশাল হুমকি। তবে মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা দেশটি হয়তো একদিন হারিয়ে যেতে পারে মরুভূমির ধূসর বালির গভীরে।