আদম বেপারি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:২১ পিএম
প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি প্রবাসে আয়–রোজগার করছেন এবং প্রতিবছর বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রেখেছেন। কিন্তু এই শ্রমিকরা পদে পদে হয়রানি ও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন, প্রতারিত হচ্ছেন। প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে বিদেশগামী শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণার নানা খবর সংবাদমাধ্যমে আসে। বিদেশে চাকরি দেওয়ার নাম করে দরিদ্র মানুষের অনেক কষ্টে সংগ্রহ করা অর্থ প্রতিনিয়ত হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারকচক্র। বিদেশগামীরা সম্পত্তি বিক্রি বা ঋণ করে দালাল ও এজেন্সিকে টাকা দিলেও অনেকে সময়মতো বিদেশ যেতে পারেন না। অনেককে বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই উঠিয়ে দেওয়া হয় বিমানে। তাদের অনেকেই বিদেশের বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পার হতে না পেরে নিঃস্ব, রিক্ত হস্তে ফিরে আসেন। দেশে ফিরেও তারা প্রতারকচক্রের খপ্পর থেকে টাকা উদ্ধার করতে পারেন না। তাদেরকে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়।
সম্প্রতি প্রতারিত ও নিঃস্ব হয়ে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন ২৬৭ জন শ্রমিক। তাদের সবাইকে ট্যুরিস্ট ভিসা করিয়ে দিয়ে মালয়েশিয়া পাঠানো হয়েছিল। শুধু এরাই নয়, গত আট মাসে এভাবে মালয়েশিয়া থেকে ফেরত এসেছেন ৩ হাজারের বেশি বাংলাদেশি। তাদেরকে কাজ দেওয়ার কথা বলে সাড়ে তিন লাখ থেকে ৫ লাখ টাকার চুক্তিতে পাঠানো হয়েছিল।
‘প্রতারণার ফাঁদে নিঃস্ব অনেকে’ শিরোনামে প্রতিদিনের বাংলাদেশে আদম বেপারি চক্রের যে কুকীর্তি উঠে এসেছে তাতে জানা যায়, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ট্যুরিস্ট ভিসায় শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় নেওয়া হয়। কিন্তু চাকরি সংক্রান্ত কোনো বৈধ কাগজপত্র না থাকায় সবাইকে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠায় মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের কতিপয় ট্রাভেল এজেন্সির যোগসাজশে কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরের একটি দালালচক্র এ কাজে জড়িত।
অথচ বিদেশে শ্রম বিক্রি করে ভাগ্য বদলের উদ্দেশ্যে এদের প্রত্যেকেই কয়েক লাখ টাকা দিয়েছেন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোকে। তারা প্রচলিত সব নিয়মকানুন মেনেই বিদেশে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু যারা তাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে চাকরির মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে তাদের সঙ্গে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে তাদের অপরাধ অমার্জনীয়। সেইসঙ্গে পদে পদে প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতারিত হওয়ার খবর উদ্বেগজনক। এভাবে এয়ারপোর্ট থেকে শ্রমিকদের ফেরত আসায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে।
আমরা মনে করি, যেসব এজেন্সি ভুয়া নিয়োগপত্র ব্যবহার করে অথবা ভ্রমণ ভিসায় বিদেশে কর্মী পাঠিয়ে প্রতারণার আশ্রয়ের মাধ্যমে মানুষ নিঃস্ব করছে, বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিকল্প নেই। লাইসেন্সবিহীন যেসব এজেন্সি বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নামে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে অথবা যদি লাইসেন্সধারী কোনো এজেন্সিও এই প্রতারণার আশ্রয় নেয়, তাদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। আইন অনুযায়ী বিদেশে শ্রমিকদের যেতে হলে কোনো একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমেই যেতে হয়। তাদেরই দায়িত্ব নিয়োগকর্তার কাগজপত্র যাচাই করা। আর এজেন্সির দেওয়া কাগজপত্র সঠিক কি না, তা যাচাই করে মন্ত্রণালয়। তাই এজেন্সি তো বটেই সরকারের তরফেও কোথাও গাফিলতি থাকলে তারও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অপরাধী যেই হোক, তাকে শাস্তির আওতায় আনার মাধ্যমেই এই অপরাধে লাগাম টানা সম্ভব।
শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। শুধু মালয়েশিয়াগামীরাই নয়, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ নানা দেশে শ্রমিক পাঠানোর কথা বলে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। বিদেশে চাকরি দিয়ে পাঠানোর নামে তাদের নিঃস্ব করছে। শুধু তাই নয়, বিদেশ-বিভুঁইয়ে তাদেরকে অমানবিক পরিস্থিতির মুখেও ঠেলে দিচ্ছে। বিপদসংকুল পথে যাত্রায় অকাল মৃত্যু, কারাভোগ, বিমানবন্দর থেকে ফেরত আসার মতো ঘটনা তো নিত্যনৈমিত্তিক। তারপরও এই চক্রটির বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ আমরা অতীতে দেখিনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা শ্রমিকরাই আবার নানামুখী ভোগান্তির শিকার হন। আমরা মনে করি, এটি শ্রমিকদের প্রতি কেবল অমানবিক আচরণই নয়, নিষ্ঠুরতাও বটে। প্রতারক রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে অতীতেও নানা সময়ে অভিযোগ উঠেছে। বিগত সরকারের তরফে সময়ে সময়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও শোনা গেছে। কিন্তু তা যেন সবই ছিল ফাঁকা বুলি। কার্যত কোনো পদক্ষেপ নজরে আসেনি। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে উচ্চারণসর্বস্ব তেমন কোনো আশ্বাস বাণী নয়, কঠোরতম পদক্ষেপ প্রত্যাশা করি। প্রতারকচক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করি।