এস. এম হাসানুজ্জামান
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:১৬ পিএম
দুর্গাপূজা, দক্ষিণ এশিয়ার সমাজজীবনে কেবল একটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়; বরং এটি বহু বর্ণিল সামষ্টিক ঐতিহ্যের প্রতীক, সহাবস্থান এবং ইতিহাস-সঞ্জাত বাঙালি সংস্কৃতির মৌল ভিত্তি। শত শত বছর ধরে এই উৎসব কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও এই উৎসবের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত থেকেছে। এটি একটি সামাজিক বন্ধন, যেখানে প্রতিটি মানুষ তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, সামাজিক দায়িত্ব ও সহনশীলতার প্রতিফলন পায়। যা সমাজে মিলনমেলার আবহ সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই আনন্দমুখর পরিসর এখন এক নতুন ধরনের বিপন্নতায় আক্রান্তÑ প্রযুক্তির অদৃশ্য আগ্রাসন, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ভুয়া তথ্য, ডিপফেক ছবি ও ভিডিও এবং অনিয়ন্ত্রিত গুজবের সুনামি।
আধুনিক সভ্যতায় তথ্যপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা যাদের হাতে, তারাই সমাজের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অ্যালগরিদমিক কাঠামো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রযাত্রা মানুষের চিন্তা, আবেগ ও আচরণকে অভূতপূর্বভাবে প্রভাবিত করছে। যে যুগে সত্য-মিথ্যার সীমানা ছিল স্পষ্ট, সেই যুগ পেরিয়ে আমরা এসেছি এমন এক সময়ে, যেখানে একটি ভিডিও বা ছবি সত্য নাকি প্রযুক্তি-সৃষ্ট বিভ্রমÑ তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দুর্গাপূজার মতো আবেগপ্রবণ উৎসব এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর গুজবের জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর ক্ষেত্র।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, উৎসবকালীন সময়ে গুজব ও উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশ তথা এ ভূখণ্ডের ইতিহাসে গুজব-নির্ভর সহিংসতা নতুন কিছু নয়। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত বহুবার দেখা গেছে, কোনো একটি ভিত্তিহীন খবরের কারণে গ্রামজুড়ে আগুন লেগে গেছে, নিরীহ মানুষের বাড়িঘর ভস্মীভূত হয়েছে, প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে। এক দশক আগেও একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে রামুতে বৌদ্ধবিহার ধ্বংস করা হয়েছিল। একইভাবে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, দিনাজপুরসহ দেশের নানা স্থানে দুর্গাপূজার সময় সামান্য উস্কানিকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে। আমরা মনে করি, গুজবকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভিত দুর্বল করাÑ এ এক সুপরিকল্পিত কৌশল।
বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিদ্যমান থাকলেও গুজব প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট কার্যকর নয়। কারণ, আইন প্রয়োগ প্রায়শই ঘটনার পর হয়, অথচ গুজব প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন ঘটনার পূর্বেই ব্যবস্থা নেওয়া। এজন্য রাষ্ট্রকে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যেখানে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সামাজিক কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করবে। একই সঙ্গে জনগণকে তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
মিডিয়া হলো সমাজের আয়না। কিন্তু যদি মিডিয়া অযাচিতভাবে গুজবকে প্রচার করে, তবে সমাজের ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যায়। গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রতিটি খবর প্রচারের আগে বহুমুখী উৎস থেকে যাচাই করতে হবে।
আইন, রাষ্ট্র কিংবা মিডিয়া একা কিছু করতে পারবে না, যদি না নাগরিকরা সচেতন না হয়। প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব হলো, কোনো সন্দেহজনক ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার আগে তা যাচাই করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি যেমন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি সমাধানের পথও দেখাতে পারে।