× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শারদীয় উৎসব

জগজ্জননীকে বরণে প্রস্তুত সনাতন ধর্মাবলম্বীরা

দুলাল আচার্য, সাংবাদিক

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:১৩ পিএম

জগজ্জননীকে বরণে প্রস্তুত সনাতন ধর্মাবলম্বীরা

আজ মহাষষ্ঠী। দেবী দুর্গার আগমন ঘটে এ দিনেই। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এটি শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল সূচনা। মর্ত্যে মায়ের আগমনে আনন্দের বন্যা বয়ে যায় গ্রাম থেকে শহরজুড়ে। শারদীয় পূজার এ দিনে দেবীকে বরণ করে নেয়া হয় নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। ষষ্ঠীর কল্পারম্ভ, বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে দেবীর পূজা শুরু হয়। মন্দির-মণ্ডপে সাজসজ্জা, ঢাকের বাদ্য আর উলুধ্বনিতে পরিবেশ মুখরিত হয়। মহাষষ্ঠীর এই দিনে ভক্তরা দেবীর শরণাপন্ন হয় শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধির কামনায়। দেবী দুর্গার আগমন যেন অশুভ শক্তির বিনাশ আর শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তা।

শরৎকাল মানেই জগজ্জননী দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা। অসুর নাশকারী দেবীর পৃথিবীস্পর্শে পূর্ণতা পায় ঋতুরাণী শরৎ। এবার দেবী ধরায় আসবেন গজে চড়ে অর্থাৎ হাতির পিঠে চড়ে এবং চলে যাবেন দোলায় অর্থাৎ পালকিতে চড়ে। হিন্দু শাস্ত্র মতে, এবার দেবীর আগমন সুখ ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত- যা শস্য-শ্যামলা বসুন্ধরার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, দোলায় গমন মানে মহামারি বা মড়কের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা কিছুটা অশুভ ইঙ্গিতই বহন করে। 

হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয়া দুর্গাপূজা। প্রতিবারের মতো দেবীবরণে এবারও প্রস্তুত সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। সবাই সমবেত হবেন মায়ের চরণতলে। জগজ্জননীর সন্তুষ্টি লাভে পাঁচ দিনব্যাপী পূজার্চ্চনায় মাতবে সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষজন। উৎসবের রঙ ছড়িয়ে পড়বে সবখানে। প্রার্থনা থাকবে কলুষমুক্ত সমাজ, সুন্দর দেশ ও সুস্থ পৃথিবী গড়ার। মানবধরা আজ নানা অপশক্তির কোপানলে। গোটা বিশ্ব আজ যুদ্ধ-সংঘাত আর অস্থিরতার মুখোমুখি। বলা যায়, বিশ্ব আজ সংকটের মধ্য দিয়ে পথ অতিক্রম করছে। এই বৈশ্বয়িক সংকট থেকে মুক্তিই স্রষ্টার কাছে সৃষ্টের প্রার্থনা। এই সংকটে জগৎমাতা দেবী দুর্গার সুদৃষ্টি সর্বাগ্রে একান্ত প্রয়োজন। মায়ের আশীর্বাদ পর্যবসিত হোক এই বসুন্ধরায়। দূর হোক অন্ধকার, ছড়িয়ে পড়ুক আলো। মানুষের মাঝে উদয় হোক শুভবুদ্ধি। বিরাজ করুক শান্তির সুবাতাস। এমন প্রার্থনাই রইল আনন্দময়ীর কাছে।

সনাতন ধর্মে দেবী দুর্গা পরমা প্রকৃতি ও সৃষ্টির আদি কারণ। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে তিনি শিবের স্ত্রী পার্বতী, কার্তিক ও গণেশের জননী এবং কালীর অন্যরূপ। দেবী দুর্গার পুরো কাঠামোতে থাকে ৮টি মূর্তি। এটি তার সংহতি শক্তি বা সকল শক্তির ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখানো এক রূপের স্থিতি। যেমন গীতাতে শ্রীকৃষ্ণ তার এক অঙ্গে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন। তেমনি সর্বশক্তি মায়েরও সেইরূপ এক কাঠামোতে পরিস্ফুটন করা হয়েছে। প্রত্যেক জাতি, দেশ, রাষ্ট্র চারটি শক্তির মাধ্যমে গঠিত হয় এবং প্রসার ও স্থিতি লাভ করে। এই চারটি শক্তি হচ্ছে জ্ঞান, ক্ষেত্র, ধন ও জনশক্তি। গীতাতে যাকে বলা হয়েছেÑ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র বর্ণরূপে। মূলত এ ভাগ কোনো ভেদ বা পৃথকীকরণ নয়, একের মধ্যেই যে এ চারের অবস্থান তাতেই দেখানো হয়েছে। দেবী দুর্গা কাঠামোতে জাতি ভেদ নয়, প্রকৃত প্রস্তাবে একই দেহে চারগুণের এক দেহে অবস্থিত চার শক্তির কথাই গীতাতে বলা হয়েছে। কাঠামোতে প্রধান রূপ মায়ের। মা দুর্গার আধ্যাত্মিক রূপ হলো দুঃখ, দুর্গতিনাশিনী সর্বকল্যাণ কাম্য দশভুজা মা এক কিন্তু অনন্ত অসীম সকল স্থাবর।

সন্তানের (ভক্তকুল) শেষ আশ্রয় মা। সুখে-দুঃখে সবকিছুতেই মা, তাই তার রূপ মাতৃরূপ। ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন, মায়ের ওপর সন্তানের জোর বেশি খাটে, তাই মাতৃরূপে তার আরাধনাই হিন্দুদের কাছে অধিক প্রাধান্য। তাই মায়ের দশ হাত সর্বব্যাপিত্বের প্রতিনিধি। সন্তানের কল্যাণ কামনায় সব সময় মন্দের সঙ্গে মা যেমন যুদ্ধরত, এখানে মন্দের রূপ অসুরের সঙ্গে মায়ের শক্তি আলাদা করে বর্ণনায় দেখা যায়। ১. শ্রী লক্ষ্মী ধনশক্তি মাÑ জগৎ পালিনা মা বিষ্ণু শক্তি, ২. শ্রীশ্রী সরস্বতীÑ মায়ের জ্ঞানের বা সাত্ত্বিকতার প্রতীক, ৩. শ্রীশ্রী গণেশÑ গণদেবতা বা জনশক্তির রূপ/শূদ্র বর্ণ, ৪. শ্রীশ্রী কার্তিকÑ মায়ের ক্ষাত্রশক্তি পরাক্রমশালী চির তারুণ্য যুবশক্তি, ৫. সিংহÑ হিংস্রতা, পশুত্ব এবং রজগুণের প্রতীক, ৬. অসুরÑ অহংকার, কাম ও তমোগুণের প্রতীক।

আসলে সকল শক্তির আধার মা। তাই অশুভ (অসুর) শক্তিকে মা রেখেছেন পদতলে অর্থাৎ জগতে কোনো ভালো কাজ করতে হলে মাকে যেমন প্রয়োজন দৈব ও কল্যাণ শক্তিরূপে, তেমনি প্রয়োজন ইষ্ট লাভের জন্য হিংস্র পশুশক্তি ও অশুভ (কাম) ক্রোধ, দম্ভ, দর্প, অজ্ঞানতাকে পদদলিত করা। দুর্গাপূজার প্রধান আবেদন হলো ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’ অর্থাৎ সকল অশুভ শক্তির নির্মূল করার জন্যই পৃথিবীতে প্রতিবছর দুইবার দেবী দুর্গার আগমন হয়। প্রাচীনকাল থেকেই বছরের চৈত্র মাসে বসন্তকালে বাসন্তী নামে পৃথিবীতে মা দুর্গা আবির্ভূত হন, যা হিন্দু সম্প্রদায়ের বাসন্তীপূজা হিসেবে।

বিশ্বব্যাপী বইছে নির্মল সম্প্রীতি থেকে উৎসারিত উৎসবের ফল্গুধারা। সাড়ম্বরে দুর্গোৎসব পালনের মধ্য দিয়ে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও কল্যাণময় অবস্থানের বিকাশ আরও বিস্মৃত এবং বিকশিত হয়। উপরন্তু অশুভ শক্তির পরাজয় ঘটিয়ে মঙ্গলদায়ক, শুভশক্তি ও ইতিবাচক চেতনার সম্প্রসারণ ঘটে। সামাজিক সহিষ্ণুতা ও উদারতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের তীক্ষ্ন নজরদারি এ ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখে।

অসুরের দলপতি মহিষাসুরকে বধ করে দেবকুলকে রক্ষা করেছিলেন দুর্গতিনাশিনী দুর্গা। সেই থেকে বিজয় ঘটে শুভশক্তির। দেবীর আগমন ঘটে অন্যায়ের বিনাশ ঘটিয়ে সজ্জনদের প্রতিপালনের অঙ্গীকার নিয়ে মানুষের মধ্যে নৈতিক আদর্শ জাগ্রত করার জন্য। মানুষের চিত্ত থেকে যাবতীয় দীনতা ও কলুষতা দূরীভূত করার জন্য। এজন্য দুর্গোৎসব ধর্মীয় উৎসব হলেও তা সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। সম্প্রদায়গত বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে এক পরম আনন্দের সোপানে দাঁড় করাচ্ছে। শারদীয় দুর্গোৎসব সবার জন্য থাকে উন্মুক্ত। দেবী দুর্গার আগমনী আনন্দকে সবাই ভাগাভাগি করে নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। বাঙালি জাতি নিরন্তর উন্মুক্ত উৎসবমুখর পথে চলতে পছন্দ করে। এই পছন্দের স্রোতোধারায় এই ক’দিন ভিন্ন আমেজ ও ভিন্নতর সুবাতাস বয়ে যাবে দেশজুড়ে।

যুদ্ধ-সংঘাতমুক্ত পৃথিবী মায়ের কাছে এই মুহূর্তের প্রার্থনা। মা তার ভক্তকুলকে সকল অপশক্তির হাত থেকে রক্ষা করবেন অতীতের মতো। ধর্ম মানুষে মানুষে প্রীতি, প্রেম, সহিষ্ণুতা, ঐক্য ও শান্তির ডাক দিয়ে যায়। তারপরও অসুরের আকস্মিক উন্মত্ততা নষ্ট করে দেয় আবহমানকালের প্রীতিধন্য পারস্পরিক অবস্থানকে, ধ্বংস করে দেয় দীর্ঘকালীন হৃদ্যতাকে। সৃষ্টি হয় বৈষম্য, বিভেদ, হিংসা, অন্যায় ও অকল্যাণ আর এজন্যই মঙ্গলদাত্রী দেবী দুর্গার আগমন ঘটে কল্যাণ ও শান্তিকে সংস্থাপন করার জন্য। বিশ্বে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন থাকবে, দূর হয়ে যাবে সব সংকীর্ণতা ও বিভেদ। মানুষে মানুষে সম্প্রীতি রক্ষা হোক।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা