সৈয়দা ফারিভা আখতার
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৪৬ পিএম
শিক্ষা হলো জাতির মেরুদণ্ডÑ এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু সেই মেরুদণ্ডকে দৃঢ় করে দাঁড় করানোর মূল কারিগর হচ্ছেন শিক্ষক। শিক্ষক সমাজের আলো ছড়ানো প্রদীপ। যিনি শুধু পাঠদান করেন না বরং একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, নেতৃত্ব ও মানবিকতার বীজ বপন করেন। একজন শিক্ষকের হাত ধরেই একটি শিশু পরিণত হয় পূর্ণাঙ্গ মানুষে। শিক্ষক কেবল পুঁথিগত বিদ্যা শেখান না বরং জীবনের প্রতিটি বাঁকে তিনি হন পথপ্রদর্শক। শিশুর জন্মের পর তার প্রথম শিক্ষক হন তার বাবা-মা। কিন্তু বিদ্যালয়ে প্রবেশের পর থেকেই জীবনের পরিপূর্ণতা আনতে শিক্ষকই হয়ে ওঠেন তার সবচেয়ে বড় অভিভাবক। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা অত্যন্ত মধুর, আন্তরিক ও অমূল্য। এই সম্পর্কের কাছে সবকিছুই হার মানে।
১৯৯৫ সালে ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্রথম পালিত হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস। প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বের শতাধিক দেশে দিবসটি উদযাপন করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই শিক্ষকের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কিন্তু ব্যস্ততার এই যান্ত্রিক জীবনে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই সেই মানুষদের কথা, যারা আমাদের প্রথম হাত ধরে বর্ণমালা শিখিয়েছেন, জীবনের কঠিন সময়ে আমাদের সাহস জুগিয়েছেন, সঠিক-ভুলের পার্থক্য বুঝিয়েছেন। শিক্ষক দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সেইসব মহান মানুষদের অবদান, যাদের কারণে আমরা আজকের আমিত্ব গড়ে তুলতে পেরেছি। প্রতিটি মানুষের জীবনে এমন কিছু শিক্ষক থাকেন, যারা শিক্ষার্থীর মনে অমোচনীয় ছাপ ফেলে যান। আমার শিক্ষাজীবনেও তেমন একজন শিক্ষক ছিলেন। আর তিনি হলেন মো. জিয়াউল হক, রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক।
প্রথমে এই বিষয়টির নাম শুনলেই মনে হতো কতই না কঠিন। কিন্তু তার অসাধারণ পড়ানোর ভঙ্গি ও সহজ ব্যাখ্যা আমাদের কাছে বিষয়টিকে পানির মতো সহজ করে তুলেছিল। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম তার প্রতিটি ক্লাসের জন্য। শুধু পড়াশোনা নয়, জীবনের নানা ক্ষেত্রেও তিনি দিকনির্দেশনা দিতেন। তিনি বলতেন বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হও। প্রকৃত বন্ধু কেবল সুখের সময় নয় বরং দুঃখের সময়েও পাশে থাকে এবং সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে। এমনকি কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কিংবা সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম যেখানেই হোক না কেন তিনি আমাদের সব সময় উৎসাহ দিতেন। তার মতে, একজন শিক্ষার্থীকে কেবল বইয়ের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমেও প্রতিভা বিকশিত করতে হবে।
শিক্ষককে বলা হয় জাতি গঠনের কারিগর। কারণ তিনি শিক্ষার্থীর ভেতরে থাকা প্রতিভাকে লালন করেন। তাকে সঠিক পথে চালিত করেন এবং তার মাঝে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলেন। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আজকের শিক্ষার্থীদের ওপর আর সেই শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলেন শিক্ষক। তারা শুধু বিদ্যার আলো জ্বালিয়ে দেন না বরং জীবনের প্রতিটি ধাপে চলার সাহস ও অনুপ্রেরণাও দেন। শিক্ষকই শেখান কীভাবে ব্যর্থতার ভেতর থেকেও সফলতার পথ খুঁজে নিতে হয়। কীভাবে অন্ধকারের ভেতর থেকেও আলোর দিশা খুঁজে বের করতে হয়।
শ্রদ্ধা জানাই সকল শিক্ষককে, যাদের অবদান আমাদের জীবনকে নতুন আলোয় আলোকিত করেছে। তাদের ভালোবাসা, ত্যাগ, ধৈর্য ও অনুপ্রেরণার কারণেই আমরা নতুন মানুষে পরিণত হয়েছি। তাই শিক্ষক দিবস কেবল একটি দিবস নয় বরং এটি একটি কৃতজ্ঞতার প্রতীক, স্মৃতির ভান্ডার এবং ভবিষ্যতের অনুপ্রেরণা।