× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কৃষি

আলুর দামে চাষিরা হতাশ, সমাধান চাই

ড. মিহির কুমার রায়, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:০৫ এএম

আলুর দামে চাষিরা হতাশ, সমাধান চাই

আলু উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। দেশে বছরে প্রতি একজন মানুষ আলু খায় ৫১ দশমিক ৫ কেজি। সেদিক থেকে বিশ্বে অবস্থান ৪৪তম। রপ্তানিতে নেই শীর্ষ ১৫ দেশের তালিকায়। তাহলে উৎপাদিত এত পরিমাণ আলু বাজারে ওঠার পর দাম নিয়ে জটিলতা তৈরি হয় কেন। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হিমাগার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) তথ্য অনুযায়ী, এবার রেকর্ড পরিমাণ এক কোটি ৩০ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ৪০ লাখ টন বেশি। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতার প্রভাব পড়েছে দামে। বিসিএসএ বলছে, হিমাগার ফটকে এলাকাভেদে কেজি এখন ১৩ থেকে ১৫ টাকা। অথচ সব মিলিয়ে কৃষকের প্রতি কেজিতে উৎপাদন খরচ হয়েছে ২৫ টাকা। আবার সরকারের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, এবার আলুর গড় উৎপাদন খরচ ছিল কেজিতে ১৪ টাকা। এর সঙ্গে হিমাগার ভাড়া যোগ হবে। ফলে সরকারি হিসাবেই প্রতি কেজি আলুতে কৃষক লোকসান গুনছেন। বিভিন্ন জেলার কৃষকরা যে তথ্য দিয়েছেন তাতে এই লোকসান কেজিতে ১০ টাকার মতো।

মাঠ বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলু উৎপাদনে খ্যাত মুন্সীগঞ্জের প্রান্তিক চাষি এবং হিমাগারে মজুদকারী ব্যবসায়ীরা আলুর দাম না বাড়ায় চরম হতাশ হয়ে পড়েছেন। অনেক আলু ব্যবসায়ী রয়েছেন তারা আলু উত্তোলন না করে দলিল কোল্ডস্টোরেজে রেখে আসছেন। তার কারণ আলু বিক্রি করলেও তারা তাদের খরচটুকু পর্যন্ত ওঠাতে পারছেন না। দেশে অন্যান্য শাকসবজির দাম যেখানে আকাশচুম্বী, সেখানে আলু কেউ ছুঁয়েও দেখছে না। বাজারে আলু বিক্রি না হয়ায় কোল্ডস্টোরেজগুলোও অলস সময় পার করছে। সামনে আলুর দাম বাড়ার সুযোগও তেমন নেই। তার কারণ সামনে আগাম নতুন আলু চলে আসবে। আবার বর্ষার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে পুরোদমে আলুর চাষ। এ সময়ের মধ্যে হিমাগারে যে পরিমাণ আলুর মজুদ রয়েছে তা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি।

আলুর দাম পতনের অন্যতম কারণ হলো আগের বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে আলু চাষ মার খেয়ে ফলন অনেক কম হয়েছিল। তাতে বাজারে আলুর দর বেড়ে ৮০ টাকা পর্যন্ত ঠেকে। সে লোভের কারণেই এ বছর দেশজুড়ে ব্যাপক আলু চাষ হয়েছিল। আবার গত বছরের তুলনায় এ বছর আলু রাখতে হিমাগারের ভাড়াও বৃদ্ধি করা হয়েছে। একদিকে আলুর দরপতন অন্যদিকে আলু হিমাগারে রাখতে যেয়ে খরচ পড়েছে বেশি। তাই চাষি এবং ব্যবসায়ীরা উভয়ই এখন ক্ষতির মুখে পড়ছেন। জেলায় ১০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি আলু উৎপাদন হয়েছে কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে। কিন্তু উৎপাদন হয়েছে তার দ্বিগুণ। আবার এ জেলায় উত্তরাঞ্চলের লাল আলু এসে সয়লাব হয়ে গেছে। সেখানে হিমাগারের তেমন সুযোগ না পেয়ে তারা মুন্সীগঞ্জে এসে আলু রাখছেন। এ জেলার কৃষক এবং ব্যবসায়ীরা আলু নিয়ে মহাসংকটে পড়েছেন। প্রতি কেজি আলু এখন ১৩ থেকে ১৪ টাকায় হিমাগার থেকে বিক্রি করতে হচ্ছে। এখন সামনে যদি আলুর দাম বৃদ্ধি না পায় তাহলে ভবিষ্যতে জেলায় আলু চাষ অর্ধেকে নেমে আসবে। তাতে করে আবারও সাধারণ ক্রেতাকে ৮০ টাকা কেজি দরে আলু খেতে হবে। তাই সরকারকে কৃষকের পাশে এখনই দাঁড়াতে হবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্র আলু কিনে তা দেশের গরিব মানুষের মাঝে বিতরণ করতে হবে। তাছাড়া আলু রপ্তানি বাড়ানো ছাড়াও কোনো গত্যন্তর নেই। এর মধ্যে সরকার ঘোষণা দিয়েছে ২৪ টাকা প্রতি কেজি দরে আলু ক্রয় করবে।

গত ৫ মৌসুমে আলুর উৎপাদন ও বাজার দরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এক বছর উৎপাদন বেশি হলে দাম কম থাকে। লোকসানের মুখে পরের বছর কৃষক উৎপাদন কমালে বাজারে দামও বেড়ে যায়। যেমনÑ ২০২২-২৩ মৌসুমে আলুর মোট উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৪ লাখ ৩১ হাজার ৭৩৬ টন। চাহিদা ছিল ৮৫ থেকে ৯০ লাখ টন। খুচরা পর্যায়ে সরকার প্রতি কেজির দাম নির্ধারণ করে দেয় ৩৫-৩৬ টাকা। কিন্তু তা উপেক্ষা করে চট্টগ্রামের বাজারে বিক্রি হয় ৪৫ টাকার ওপরে, যা পাইকারি পর্যায়ে কেনা হয়েছিল ২৭ টাকায়। আলুর উদ্বৃত্ত থাকার পর কিছু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তখন বাজার অস্থির করে। ফলে বিপাকে পড়েন আলুর ভোক্তারা। কৃষি বিপণন ও সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে তখন এমন পরিস্থিতির কারণও উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কারসাজি করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছে। তারা হিমাগার থেকেও চাহিদা অনুসারে আলু খালাস করছে না। এমন চিত্রের দুই বছর পর দেশে আলুর উৎপাদনে রেকর্ড হয়েছে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে মোট উৎপাদন এক কোটি ৩০ লাখ টন। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি ৪০ লাখ টন। কিন্তু এবারের ভুক্তভোগী চাষি নিজে। হিমাগার খরচসহ ২৫ টাকায় প্রতি কেজি উৎপাদনের বিপরীতে বিক্রি করছেন এলাকাভেদে ১৩-১৫ টাকায়। আলু উৎপাদনকারী জেলাগুলোর কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার দামের যে অবস্থা তাতে অনেক কৃষক আগামী বছর আলু চাষে বিমুখ হতে পারেন। তাতে আগামী বছর আলুর দাম আবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এক মাসে খুচরা পর্যায়ে আলুর দাম ১১ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু গত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে দর কমেছে ৫৬ দশমিক ৯০ শতাংশ। 

দেশে আলুর উৎপাদন বাড়লেও রপ্তানি সেই হারে বাড়ছে না। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে রপ্তানি হয়েছিল ৬৮ হাজার ৭৭৩ টন আলু। ২০২২ সালে ৭৮ হাজার ৯১০ টন আলু রপ্তানি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার টন। ২০২৪ সালে তা আরও কমে হয়েছে ১২ হাজার ১১২ টন। তবে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৭০ হাজার টন আলু রপ্তানি হয়েছে। উদ্বৃত্ত থাকায় রপ্তানি আরও বাড়ানোর তাগিদ কৃষকের। বছরের ধারাবাহিকতা হিসাবে ধরলে রপ্তানির ক্ষেত্রেও মৌসুমভেদে বড় আকারের উত্থান-পতন দেখা যায়। এখন সমাধান কীÑএ নিয়ে চিন্তাভাবনার সময় এমেছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ) যে চিঠি দিয়েছে সেখানে একটি সমাধানের পরামর্শ উল্লেখ করা হয়েছে যেমনÑ ১. কৃষকদের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমাগার ফটকে আলুর ন্যূনতম বিক্রয় মূল্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা জরুরি; ২. দেশের ৫৫ লাখ পরিবারকে ১৫ টাকা কেজি দরে দেওয়া চালের পাশাপাশি ১০ কেজি করে আলু দিতে পারে সরকার ৩. এটা সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করতে পারেও ৪. তারা সারা দেশে টিসিবির মাধ্যমে আলুর ট্রাকসেল করারও পরামর্শ দিয়েছে ৫. সমাধানের পরামর্শ নিয়ে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, টিসিবির মাধ্যমে বিতরণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকে। আলুর ভর্তুকি বিষয়ে অর্থ বরাদ্দের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ে সিদ্ধান্তের ওপর ভর্তুকির বিষয়টি নির্ভর করছে ৬. জানা গেছে, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর আলুর বহুমুখী ব্যবহার, সংরক্ষণ ও বিপণন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে রংপুর বিভাগসহ দেশের ১৬টি জেলায় ৪৫০টি অহিমায়িত মডেল ঘরে আলু সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল। গত অর্থবছরে রংপুর জেলায় ৭৫টি অহিমায়িত মডেল ঘরের মধ্যে ৪৫টিতে আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। আলুঘরগুলো কাজ করছে। সরকারের টাকা না থাকলে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি তহবিল এই বিরল সফল প্রকল্পে আরও অর্থলগ্নি করেতে পারে। আত্রাইয়ের চাষিরা সহজ শর্তে ঋণ পেলে নিজেরাই ঘর বানিয়ে নেবেন বলে জানালেন।

সরকারকে আলুচাষিদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম কৃষিপণ্য আলু নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। দেরি না করে বসতে হবে হিমাগারের মালিকদের সঙ্গে। আমাদের বিকল্প কিছুও ভাবতে হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারতের কতগুলো রাজ্যে লম্বা সময়ের জন্য আলু সংরক্ষণের জন্য চাষিদের বাড়িতেই বিশেষ এক ধরনের ঘর বানানো হয়। বাংলাদেশে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আগ্রহে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর আলু উৎপাদন অঞ্চলে এ রকম কিছু ঘর তৈরির পরিকল্পনা নেয়। তারা এটার নাম দেয় ‘অহিমায়িত মডেল ঘর’। নওগাঁর ধামইরহাটের আলমপুরে এ রকমের একটা ঘর দেখেছিলাম। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বলছে, এটি একটি বিজ্ঞানসম্মত মিনি কোল্ড স্টোরেজ। তাদের নকশা করা ঘরে ২৫ থেকে ৩০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণে কৃষকের সাশ্রয় হবে বছরে প্রায় দেড় লাখ টাকা। একটি অহিমায়িত ঘর তৈরি করলে ১৫ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। একেকটি ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল দেড় লাখ টাকা। খুব সহজেই এসব ঘরে আলু চার থেকে ছয় মাস সংরক্ষণ করা যায়। এতে প্রতিবছরে একেকজন আলুচাষির দেড় থেকে পৌনে দুই লাখ টাকা হিমাগার খরচ সাশ্রয় হবে। তা ছাড়া এসব ঘর থেকে চাষি ইচ্ছেমতো আলু বিক্রি করতে পাবেন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা