আইনশৃঙ্খলা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:০৬ এএম
বেশ কিছুদিন ধরে ‘মব’ নামে আইনবহির্ভূত হাঙ্গমা, নানা অস্থিরতা-অরাজকতাসহ ছোট ছোট সহিংস ঘটনার ধারাবাহিকতা সমাজে এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি করেছে। এতে বোঝা যায়, চিহ্নিত ও সংগঠিত কোনো গোষ্ঠী কিংবা মহল দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টায় লিপ্ত। এমন বাস্তবতায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনুসন্ধান বলছে, দেশে বড় ধরনের নাশকতার সুযোগ খুঁজছে অপরাধীচক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতার মধ্যেও থেমে নেই নাশকতাকারীরা। তারা ভিন্ন পন্থায় হামলার সুযোগ খুঁজছে। জানা গেছে, অপরাধীদের পরিকল্পনার ছক অনেক বিস্তৃত। এজন্য বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থও বিনিয়োগ হচ্ছে, যা দিয়ে সক্রিয় করা হচ্ছে পেশাদার অপরাধীদেরও।
২৩ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশে ‘চোরাগোপ্তা হামলার শঙ্কা দেশজুড়ে’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, চক্রটি গ্রামাঞ্চলে নিষিদ্ধ চরমপন্থী সংগঠনের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকেও সক্রিয় করে তোলার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করাই এই হামলার মূল উদ্দেশ্য। গোয়েন্দাদের শঙ্কা এ হামলার বড় টার্গেট হতে পারেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও। তালিকায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও। শঙ্কা রয়েছে প্রাণহানিরও। তাই দেশজুড়ে পেশাদার অপরাধীদের তালিকা করে এখনই তাদের আইনের আওতায় আনার কথা বলছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। আসামিদের জামিনের ক্ষেত্রে আরও যাচাই-বাছাইয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলে অংশ নেওয়াদের অনেকেই পেশাদার অপরাধী। তদন্তে উঠে এসেছে, তারা টাকার বিনিময়ে মিছিলে এসেছিল। উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশকে অস্থিতিশীল করতে নানামুখী চক্রান্ত করে যাচ্ছে দলটি। দলটি ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে বিভ্রান্তিমূলক কথা বলে নেতাকর্মীদের প্রতিনিয়ত উস্কানি দিয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, গত তিন মাসে দেশে ১ হাজার ২০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এসবের অধিকাংশের রহস্যভেদ হলেও অনেক ঘটনা এখনও রহস্যাবৃত। এর মধ্যে ৫৭টি গুপ্ত হামলা চালিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া গত কয়েক মাসে রাজধানীসহ দেশে অন্তত ৭৪৬টি ঝটিকা মিছিল করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। কয়েকটি মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণ ও পুলিশের ওপর হামলাও হয়েছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে গ্রেপ্তারকৃতদের ছাড়িয়ে নেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
তবে আশার কথা, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের পর নড়েচড়ে বসেছেন সরকারসহ প্রশাসনের নীতিনির্ধারকরা। এরই মধ্যে অপরাধীদের তালিকা করে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের কাছে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থায় দায়িত্ব পালনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে রাষ্ট্রের কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। ইতোমধ্যে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হামলার বিষয়ে সতর্কও করা হয়েছে। জানা গেছে, কোনোভাবেই অপরাধীদের ন্যূনতম ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্তে সরকার এবং বাহিনীগুলো অটল। শুধু তাই নয়, মব ভায়োলেন্সের মতো অপরাধে কোনো ছাড় নয়Ñ এমন বার্তাও রয়েছে মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে। লক্ষ্য আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা।
আমাদের দেশ নানা সময়ে জঙ্গিবাদ, গ্রেনেড হামলা, বোমা হামলা, বিস্ফোরণ এবং টার্গেট কিলিংয়ের মতো ভয়াবহ সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে যে চোরাগোপ্তা হামলা কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এর পেছনে রয়েছে সুগভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। এখন প্রশ্ন হলো, এ শঙ্কার বিষয়টি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়? এক্ষেত্রে আমরা মনে করি, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরও শক্তিশালী ও সক্রিয় হতে হবে। হামলার আগে পরিকল্পনা, সমন্বয় ও প্রস্তুতির ধাপগুলো শনাক্ত করা গেলে তা নস্যাৎ করা সম্ভব। এজন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, সাইবার মনিটরিং এবং মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ বাড়াতে হবে। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সজাগ থাকতে হবে। কোনভাবেই জনমনে আতঙ্ক ছড়ানো যাবে না। বরং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সন্দেহজনক কোনো তথ্য পেলে দ্রুত জানাতে পারে।
এ কথা সত্য যে, কোনো রাজনৈতিক দল যদি সহিংসতার পথ বর্জন না করে, তবে এ ধরনের চোরাগোপ্তা হামলার শঙ্কা বাড়তেই থাকবে। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে সরে এসে গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবেশ তৈরি করাই হবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তরুণ প্রজন্ম কোনো অন্ধকার শক্তির হাতিয়ার না হয়। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক অঙ্গনে সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য জরুরি।
আমরা আরও মনে করি, এই চোরাগোপ্তা হামলার শঙ্কা কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই নয়, এটি পুরো দেশবাসীর জন্য সতর্কবার্তা। তাই সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিলে দেশের শান্তি ও অগ্রগতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। এই ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সজাগ থাকতে হবে। সম্মিলিত সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধই পারে দেশকে অশুভ তৎপরতার হাত থেকে রক্ষা করতে। শঙ্কাময় পরিস্থিতির অবসান ঘটানো জরুরি। নিরীহ মানুষ যাতে সহিংসতা ও নাশকতার শিকার না হয়, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে। যেভাবেই হোক নাশকতাকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।