মানব সম্পদ ও উন্নয়ন
সাদেকুর রহমান
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:০০ এএম
প্রতিটি মানুষ জন্মগ্রহণ করে অমিত সম্ভাবনা নিয়ে। মানুষের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার ভবিষ্যৎ ঠিক হয়ে যায় না। ‘মানুষ’ শুধু মানুষ হিসেবেই জন্মগ্রহণ করে। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের মেধা, বুদ্ধি, প্রজ্ঞাÑ এগুলো সম্পর্কে জানা যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভিতরের প্রতিভা প্রকাশ পেতে থাকে। তাই মানুষকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ মানুষই একমাত্র প্রাণীÑ যারা নিজের মেধা, বুদ্ধি, প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে অন্যের উপকার করতে পারে।
সম্পদ বলতে বোঝায়, যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়। সাধারণত সম্পদকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলো হলোÑ ১. প্রাকৃতিক সম্পদ ও ২. মানবসৃষ্ট সম্পদ। সম্পদ বলেই একজন মানুষ দ্বারা অন্যজন উপকৃত হয়। মানুষ পারিবারিক ও সমাজের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সামাজিক জীব হয়ে ওঠে। মানুষ সম্পদে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভিতরের প্রতিভার সন্ধান খুঁজে পায়। মানুষের ভিতরে লুকায়িত প্রতিভা খুঁজে বের করে নিয়ে আসার মাধ্যমেই মানুষ সম্পদে পরিণত হয়। মানুষকে শুধু দৈহিক কাঠামোর আবরণের ভিতরে সীমাবদ্ধ করে রাখার সুযোগ নেই। মানুষকে নিজের প্রতিভার পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের।
বর্তমানে সারা বিশ্বেই মানব সম্পদ একটি আলোচিত বিষয়। বাংলাদেশ বর্তমানে পপুলেশন ডিভিডেন্ডের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে মানব সম্পদ বিষয়টি আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে দেশের মানব সম্পদের পরিমাণ বেশি, বর্তমান বিশ্বে ওই দেশ তত বেশি উন্নত। জনসংখ্যা কম কিংবা বেশি কোনো বিষয় নয়। মানুষকে সম্পদে পরিণত করার জন্য সকল দেশই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো দেশ ধীরগতিতে যাচ্ছে, অন্য দেশ দ্রুতগতিতেÑ এই যা ব্যবধান।
মানব উন্নয়ন সূচক নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিবছর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এটি প্রকাশ করে থাকে ইউএনডিপি। সর্বশেষ জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউ এনডিপি) মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩০তম। এই প্রতিবেদনে ১৯৩টি দেশকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। এই প্রতিবেদনটি তৈরির সময় সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছেÑ শিক্ষা, গড় আয়ু ও মাথাপিছু আয়। শিক্ষা, আয় ও স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এ সূচকগুলো মানব সম্পদ গঠনের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৪ এ মানব সম্পদ উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। মানব উন্নয়ন সূচকের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো শিক্ষা। একজন মানুষ যদি শিক্ষিত হয়, এর ইতিবাচক প্রভাব ব্যক্তির জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পড়ে। এর ফলে শুধু ব্যক্তি না, দেশও উপকৃত হয়।
শিক্ষা হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। উন্নত বিশ্বে শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষার মাধ্যমে একটি দেশের নাগরিকদের জ্ঞান, মেধা ও প্রতিভার বিকাশ ঘটে থাকে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৪ অনুযায়ী দেশের সাক্ষরতার হার ৭৭.৯ শতাংশ। এদের মধ্যে পুরুষ ৮০.১ এবং মহিলা ৭৫.৮। শুধু সাক্ষরতার হার বাড়লেই দেশের মানব সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে বিষয়টি এমন নয়। শিক্ষার গুণগতমানের পরিবর্তন হলেই মানব সম্পদের পরিমাণ বাড়বে। শিক্ষায় বিনিয়োগ একটি দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন করে দেয়। মানুষের মনের ও আচরণের পরিবর্তন নিয়ে আসে। শুধু তাই নয়, মানুষের ভবিষ্যতে জীবনকে আরও সুন্দর করে। মানুষ সব সময় ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত থাকে। উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকগণ জীবিকা নির্বাহের উপায় নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে। শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে যেকোনো বিষয় নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কম থাকে। শিক্ষিত মানুষ যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের মেধা ও বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে থাকেন। শিক্ষা মানুষের ভবিষ্যৎ জীবনকে সুন্দর করে এবং আয়ের খাতকে প্রসারিত করে।
গড় আয়ুও মানব সম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদের্শক। গড় আয়ুর সঙ্গে একটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত। ১৯৭০ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কতগুলো বিষয়কে মানুষের মৌলিক চাহিদা হিসেবে প্রকাশ করে। এগুলো হলোÑ খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। স্বাস্থ্য মানব সম্পদ গঠনের ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে একটি দেশের গড় আয়ুর সম্পর্ক রয়েছে। যে দেশের মানুষের গড় আয়ু বেশি হয় তারা সাধারণত সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে থাকে। একটি দেশের মানুষ দীর্ঘ আয়ু পায় তখনই যখন ওই দেশের মানুষ পুষ্টিহীনতায় কম ভোগে।
শরীর গঠনের জন্য যেসব খাদ্য দরকার, সেগুলো পেতে কোনো অসুবিধা হয় না। শরীরে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে। এ ক্ষেত্রে বলা যায় যে, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। আইসিডিডিআরবির তথ্য মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৫ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। গুরুতর অপুষ্টিতে ভুগছে ৬ লাখ শিশু। এটি দেখায় যে, আমাদের দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান সন্তোষজনক নয়। স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে বিনিয়োগ একটি দেশের দক্ষ মানব সম্পদ গঠনে ভূমিকা রাখে।
একজন মানুষ যদি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়, তা হলে ওই ব্যক্তির উৎপাদনশীলতা অনেক বৃদ্ধি পায়। যদি কোনো মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকে তা হলে তার দ্বারা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। শুধু তাই নয়, তার পারিবারিক ও সামাজিক জীবনও সুন্দর হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর ৩ মাস (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৪)।
বর্তমানে সবার জন্য সঠিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। এটি না হওয়ার পিছনে কারণ হিসেবে আছে জনবল সংকট, স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রিকরণ করতে না পারা, মানসম্মত আধুনিক স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা।
সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সহযোগিতা মানব সম্পদ গঠনের জন্য দরকার হয়। একটি দেশের দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকদের জন্য মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণ করার পাশাপাশি মানব সম্পদ গঠনের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এ কাজগুলো করতে পারলে একটি দেশের পক্ষে মানব সম্পদ তৈরি করা সহজ হয়।
মাথাপিছু আয়ের সঙ্গেও মানব সম্পদ গঠনের সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু ২৮২০ মার্কিন ডলার, যা উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম। মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার মান জড়িত। মানুষের আয় বেশি হলে জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। আয় বেশি হলে মানুষের ব্যয়ও বেশি। আয় বেশি হলে বিনিয়োগের পরিমাণও বেশি হয়। আমাদের দেশে প্রতিবছর অনেক ছেলেমেয়ে লেখাপড়া ছেড়ে দেয় শুধু পরিবারের আয় কম থাকার কারণে। মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ বাড়ানো গেলে দেশের মানুষের অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
বাংলাদেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ৯৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। যা মোট বাজেটের ১২.১ শতাংশ। মোট জিডিপির মাত্র ১.৭২ শতাংশ শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ। যেখানে ইউনেস্কো সুপারিশ হলো জিডিপির অনন্ত ৪-৬ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ১৫-২০ শতাংশ।
বর্তমান যুগ হলো তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। শুধু সাধারণ শিক্ষায় মনোযোগ দিলে হবে না। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার দিকেও নজর দিতে হবে। এ দুই খাতে সরকারের বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি করা দরকার। এ ছাড়াও বাংলাদেশে ছাত্রদের জন্য দক্ষতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন ধরনের স্কিলের কোর্স চালু করা যেতে পারে। বিশেষ করে, সফট স্কিলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের অবস্থা সন্তোষজনক নয়।। যুব ও ক্রীড়া অধিদপ্তরের অধীন যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আরও যুগোপযোগী বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ হলো কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের শ্রমশক্তির ৪৫.০০ ভাগ মানুষ এই কাজের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ বিশ্বে মৎস্য উৎপাদনে ৩য় স্থানে রয়েছে। শুধু তাই নয়, সবজি উৎপাদনে ৩য়, ধানে ৪র্থ ও আলুতে ৬ষ্ঠ স্থানে রয়েছে। তাই কৃষি প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ানো দরকার। বাংলাদেশ খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। শিক্ষার্থীদেরকে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ কিংবা মৎস্য চাষের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। এর ফলে তারা নিজেদের বাড়ির আশপাশেই তাদের অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগ করতে পারবে। কৃষিখাতের ওপর যত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে, এই দেশের শ্রমশক্তির ব্যবহার তত বেশি বাড়বে। শ্রমশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ার মানেই হলো কর্মসংস্থানের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা সাধারণত পড়ালেখা শেষ করে চাকরির জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু তাদেরকে যদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তবে তারা কৃষিকাজেই যুক্ত হতে আগ্রহী হবে। বর্তমানে দেশে পোল্ট্রি শিল্পের খুব চাহিদা। দেশের শ্রমশক্তিকে এ খাতে আসতে উৎসাহিত করা দরকার। এজন্য তরুণদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা দরকার। তখন মানুষ চাকরির জন্য অপেক্ষায় থাকবে না। নিজের অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রস্তাব করা হয়েছে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। যা বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার জন্য অনেক কম। বাংলাদেশের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা এখনও সহজলভ্য করা সম্ভব হয়নি। দেশের কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসেবা আরও বাড়ানো যেতে পারে। দেশে নার্স, স্বাস্থ্য টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেওয়া দরকার। দেশে স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
মাথাপিছু আয় বাড়ানোর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে দেশে বেকারত্বের হার ৪.৬৩ শতাংশ। এটি হ্রাস করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি দুই পর্যায় হতেই কাজ করতে হবে। বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে হবে। ফলে মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এটি মানুষের জীবনযাত্রার মানও বাড়াবে।