প্রেক্ষাপট
আবু জুবায়ের
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:১৭ এএম
সম্প্রতি জাতিসংঘের সম্মেলনে ঘটেছে ঐতিহাসিক ঘটনা। ফ্রান্স আর সৌদি আরবের উদ্যোগে ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়ামের মতো প্রায় দশটা দেশ প্যালেস্টাইনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন জাতিসংঘের ১৯৩টা সদস্য দেশের মধ্যে ১৫১টা প্যালেস্টাইনের পক্ষে। এর মানে ৭৮ শতাংশেরও বেশি! গাজায় যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে এই স্বীকৃতি প্যালেস্টাইনিদের জন্য একটা বড় নৈতিক জয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটা কি সত্যিই তাদের জন্য কাজে আসবে? নাকি এটা শুধুই কাগজে-কলমে সান্ত্বনা?
চলুন, আগে ভালো দিকগুলো দেখি। এই স্বীকৃতি প্যালেস্টাইনকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অনেকটা শক্তিশালী করতে পারে। যেমন, তারা এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষমতা পাবে। ফ্রান্সের মতো বড় দেশ যখন বলছে, নতুন প্যালেস্টাইন সরকারে হামাস থাকবে না, তখন হামাসের প্রভাব কমানোর একটা চেষ্টাও হতে পারে। এছাড়া এই স্বীকৃতি ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। অনেক দেশ এখন বলছে, ইসরায়েলকে গাজায় যুদ্ধবিরতি করতে হবে আর ১৯৬৭-এর সীমানায় ফিরতে হবে। এমনকি ইসরায়েলের ভেতরেও ৯ হাজারের বেশি মানুষ পিটিশন সই করে প্যালেস্টাইনের স্বীকৃতির পক্ষে কথা বলেছে। এটা শান্তির পথে একটা আশার আলো। আর এই স্বীকৃতির ফলে প্যালেস্টাইন আরও বেশি অর্থ সাহায্য আর কূটনৈতিক সমর্থন পেতে পারে, যা তাদের রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক হবে।
কিন্তু এখানেই সমস্যা। এই স্বীকৃতি কি সত্যিই বাস্তবিকভাবে কাজ করবে? ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের রামাল্লার একজন সাধারণ মানুষ আবু সাঈদ বলেছেন, ‘কাগজে স্বীকৃতি দিয়ে কী হবে? আমরা চাই বাস্তবে কিছু হোক। ৭৭ বছর ধরে আমরা কষ্টে আছি, অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছি, কিন্তু কিছুই হয়নি।’ তার কথায় সত্যতা আছে। গাজায় ইসরায়েলের অবরোধ এখনও চলছে, ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে ইসরায়েলি বসতি বাড়ছে, এমনকি প্যালেস্টাইনের নেতারা জাতিসংঘে যাওয়ার জন্য ভিসা পর্যন্ত পাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় দেশ এখনও এই স্বীকৃতির বিরোধিতা করছে আর ইসরায়েলকে অস্ত্র দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই স্বীকৃতি ইসরায়েলের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারে, কিন্তু অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা বা অর্থনৈতিক শাস্তি ছাড়া বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। অনেকে মনে করছেন, এটা পশ্চিমা নেতাদের জনমত শান্ত করার একটা ‘মুখরক্ষার’ পদক্ষেপ। গাজার ধ্বংস দেখে পশ্চিমের জনগণ যখন প্রশ্ন তুলছে, তখন এই স্বীকৃতি যেন তাদের শান্ত করার একটা চাল।
আরেকটু গভীরে গেলে দেখা যায়, এই স্বীকৃতি অনেক শর্তের সঙ্গে এসেছে। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, এটা ইসরায়েলের ‘নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু প্যালেস্টাইনিদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে নেওয়ার অধিকারের কথা খুব কমই বলা হয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তো স্পষ্টই বলেছেন, এটা ‘হামাসের জন্য পুরস্কার’ আর তিনি প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতা করবেন। তাই এই স্বীকৃতি যদি বাস্তবে কাজ না করে, তাহলে ফাঁকাবুলির প্রতিশ্রুতি হয়ে যাবে। প্যালেস্টাইনের জন্য এটা তখনই কাজে আসবে, যদি এটি দুই পক্ষের আলোচনার ভিত্তি হয় যেখানে পূর্ব জেরুসালেমকে প্যালেস্টাইনের রাজধানী হিসেবে মানা হবে আর ইসরায়েলের দখলদারি শেষ হবে।
এই পশ্চিমা স্বীকৃতি প্যালেস্টাইনের জন্য একটা ছোট জয়, কিন্তু বড় জয়ের জন্য এটাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনÑ কথা কম, কাজ বেশি করতে হবে। গাজায় যুদ্ধবিরতি জোর করে করাতে হবে, অবরোধ তুলতে হবে, আর দুই পক্ষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্যালেস্টাইনিরা শুধু কাগজে স্বীকৃতি চায় না, তারা চায় এমন একটা রাষ্ট্র যেখানে তারা শান্তিতে বাঁচতে পারে। এই স্বীকৃতি যদি সেই পথের প্রথম পদক্ষেপ হয়, তাহলে এটা ইতিহাসে সোনালি সময় হয়ে থাকবে। নইলে এটা শুধু আরেকটা হতাশার গল্প যোগ করবে। এখন সময় হলো বিশ্ব যেন কথার চেয়ে কাজে প্রমাণ করে, শান্তির জন্য সত্যিকার ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।