× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ত্রিপুরা রাজপরিবারের বক্তব্য

ইতিহাস বিকৃতি ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে উস্কানি

এ এইচ এম ফারুক, সাংবাদিক

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:১৩ এএম

ইতিহাস বিকৃতি ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে উস্কানি

সম্প্রতি ভারতের ত্রিপুরা রাজপরিবারের সদস্য প্রদ্যোত বিক্রম মানিক্য দেব বর্মা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘গ্রেটার ত্রিপুরা ল্যান্ড’-এর অংশ দাবি করে একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘চাকমা জনজাতি কখনোই বাংলাদেশের অংশ হতে চায়নি’ এবং ভারত সরকারের কাছে এই ভূখণ্ড দখলের জন্য ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের আহ্বান জানান। তার এই বক্তব্য শুধু ইতিহাস বিকৃতি নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি উস্কানি। তার এই মন্তব্য পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রচেষ্টাকে নতুন করে উস্কে দিয়েছে। এটি একটি বহুমুখী, আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত ষড়যন্ত্রের অংশ, যার উদ্দেশ্য বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায় এবং রাষ্ট্রভঙ্গের পথ সুগম করা। পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশ নিয়ে ষড়যন্ত্রের এই বহুমুখী প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের উচিত দ্রুত প্রতিবাদ জানানো এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। 

ইতিহাস বলে বাংলাদেশের কুমিল্লা, ফেনী ও তৎসংলগ্ন কিছু অঞ্চল এক সময় ত্রিপুরা রাজ্যের প্রভাবাধীন থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম কখনোই ত্রিপুরার অংশ ছিল না। ব্রিটিশ আমলে এটি ‘এক্সক্লুডেড এরিয়া’ হিসেবে স্বীকৃত ছিল এবং সরাসরি ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত হতো। চাকমা, মারমা ও বোমাং সার্কেল চিফরা ব্রিটিশদের সঙ্গে আলাদা চুক্তির মাধ্যমে ভূমি শাসন করতেন- যা ত্রিপুরার সঙ্গে কোনো ঐতিহাসিক সংযুক্তি দেখায় না। ১৭৩০ সালের পর বার্মা, তিব্বত, মিজোরাম, ত্রিপুরা, চীন থেকে বিতাড়িত হয়ে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খিয়াং, লুসাই, পাংখোয়া প্রভৃতি জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করে। ফলে তারা আদিবাসী নয়, বরং অভিবাসিত জনগোষ্ঠী।

বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসতি পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐতিহাসিককাল থেকেই ছিল। ব্রিটিশ কর্মকর্তা ফ্রান্সিস বুকাননের ১৭৯৮ সালের ভ্রমণ বিবরণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বাঙালি বসতির উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্যদিকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আগমন ঘটে ১৭-১৮ শতকে। তাই আদিবাসী নয়, তারা অভিবাসিত।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রচেষ্টা বহুদিনের। এর মধ্যে রয়েছে : (১). জুম্মল্যান্ড দাবি : পার্বত্য চট্টগ্রামে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যের কিছু উপজাতি গোষ্ঠী ‘জুম্মল্যান্ড’ নামে স্বাধীন ভূখণ্ডের দাবি তোলে। এই দাবির পেছনে ছিল জাতিগত স্বাতন্ত্র্য ও ভূমি মালিকানার প্রশ্ন, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। (২). কুকি-চীন রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা : কুকি-চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) বান্দরবানে ‘কুকি-চীন’ নামে একটি রাষ্ট্র গঠনের সশস্ত্র প্রচেষ্টা চালায়। তারা অস্ত্র সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করে। (৩). ভারতীয় চাকমা নেতাদের চিঠি : ভারতে অবস্থানরত কিছু চাকমা নেতা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের অংশ দাবি করেন। এটি আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি রাজনৈতিক কৌশল। (৪). ত্রিপুরা রাজপরিবারের বক্তব্য : ত্রিপুরা রাজপরিবারের সদস্য প্রদ্যোত দেববর্মা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘গ্রেটার ত্রিপুরা ল্যান্ড’-এর অংশ দাবি করে ভারত সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। তার বক্তব্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক। (৫). ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় ও সন্তু লারমার আন্তর্জাতিক অপতৎপরতা : দেবাশীষ রায় নিজেকে ‘চাকমা রাজা’ পরিচয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা চালান। সন্তু লারমাও রাষ্ট্রীয় পদে থেকেও বিচ্ছিন্নতাবাদী অবস্থান গ্রহণ করেন, যা সংবিধানবিরোধী। (৬). সিএইচটি কমিশনের প্রচারণা : সিএইচটি কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘আদিবাসী ভূমি’ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করে। তাদের রিপোর্ট ও সেমিনারে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়। (৭). গণমাধ্যম কমিশনের ‘আদিবাসী’ শব্দচয়ন : গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপন্থী। এটি বিভাজনের রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে সংবিধানবিরোধী বার্তা ছড়ায়। এই প্রচেষ্টাগুলো কখনও মানবাধিকার, কখনও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, আবার কখনও ইতিহাসের মোড়কে পরিচালিত হলেও, মূল উদ্দেশ্য একÑ রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ভাঙা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র (১৮ এপ্রিল ২০২৫) এবং কানাডা (১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫) তাদের নাগরিকদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। তারা এই অঞ্চলকে রাজনৈতিক সহিংসতা, অপহরণ ও জাতিগত সংঘর্ষে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশ্বজুড়ে উন্নত নজরদারি ও তথ্য বিশ্লেষণ পরিচালনা করে। তাই ধরে নেওয়া যায়, তাদের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংক্রান্ত বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। এই সতর্কতা বাংলাদেশের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তাÑ এই অঞ্চল আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত।

‘ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত’ গাওয়ার মতো হলেও এখানে স্পষ্টভাবে বলতে হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে ‘আদিবাসী’ শব্দের কোনো উল্লেখ নেই। সেখানে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, উপজাতি, অনগ্রসর ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

২০১১ সালে সংবিধান সংশোধনের সময় ‘আদিবাসী’ শব্দ অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। ২০১৮ সালে তথ্য অধিদপ্তর সাংবাদিকদের উদ্দেশে নির্দেশনা দেয়Ñ ‘সংবিধান পরিপন্থী ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার বন্ধ করুন।’ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতেও ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতিতে ‘আদিবাসী’ শব্দের কোনো স্থান নেই।

এই মুহূর্তে সরকারের সুসংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত। এই ক্ষেত্রে : (১). কূটনৈতিক প্রতিবাদ : ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে ত্রিপুরা রাজপরিবারের বক্তব্যকে রাষ্ট্রীয় অবস্থান হিসেবে না নেওয়ার নিশ্চয়তা চাওয়া জরুরি। (২). আন্তর্জাতিক ব্যাখ্যা ও লবিং : জাতিসংঘ, সার্ক, ওআইসি ও অন্যান্য সংস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে সিএইচটি কমিশনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক প্রতিবাদ জানাতে হবে। (৩). গণমাধ্যমে তথ্যভিত্তিক প্রতিক্রিয়া : ইতিহাস ও সংবিধানের ভিত্তিতে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা প্রতিহত করতে সাংবাদিকদের জন্য শব্দচয়ন ও নীতিমালা পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। (৪). জনমত সংহতকরণ : পার্বত্য অঞ্চলে সচেতনতা বাড়িয়ে বিভাজনের রাজনীতি রোধ এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে। (৫). শিক্ষা ও পাঠ্যবই পর্যালোচনা : ‘আদিবাসী’ শব্দের অপব্যবহার রোধে পাঠ্যবই ও প্রশিক্ষণ মডিউলে সংশোধনী এনে সংবিধানসম্মত শব্দচয়ন নিশ্চিত করতে হবে। (৬). সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ : কমিশনের আন্তর্জাতিক প্রচারণা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে জাতিসংঘে রাষ্ট্রীয় প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন। (৭). দেবাশীষ রায় ও সন্তু লারমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা : রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা চালানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সন্তু লারমার অবস্থান পর্যালোচনা করে পদক্ষেপ নিতে হবে। (৮). শান্তি ও উন্নয়ন জোরদার : শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলে উন্নয়ন বাড়িয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদ প্রতিহত করতে হবে এবং (৯). রাষ্ট্রীয় নীতির প্রচার : সংবিধান ও শব্দচয়ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ চালু করে বিভ্রান্তিকর শব্দ ব্যবহারে প্রেস কাউন্সিলকে সক্রিয় করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সরকার, গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকদের উচিত এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানো। রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষায় ঐতিহাসিক সত্য, সংবিধানের ভাষা এবং জনগণের ঐক্যÑএই তিন স্তম্ভকে শক্তিশালী করতে হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা