× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ডিজিটাল গুজব

তরুণদের আস্থা আর গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

এস এম সৈকত

প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৪৪ পিএম

তরুণদের আস্থা আর গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশে ভুয়া খবর ও গুজব এখন কেবল অনলাইনে সময় নষ্টের বিষয় নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা, গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপরও সরাসরি আক্রমণ। অনলাইনে বেড়ে ওঠা বর্তমান প্রজন্ম প্রতিদিন নতুন নতুন তথ্য ঢেউয়ের মুখোমুখি হয়, যার কোনোটি সত্য, কোনোটি অর্ধসত্য কিংবা উদ্দেশ্যমূলক বিকৃতিতে ভরা। তথ্যবিভ্রান্তি এখন মৌসুমি দুর্যোগের মতোই পূর্বাভাস যোগ্য; পার্থক্য শুধু এতটুকু, বর্ষার জলোচ্ছ্বাস দেখতে পাওয়া যায়, গুজবের ঢেউ অনেক সময় চোখে পড়ার আগেই আমাদের মগজ ভিজিয়ে দেয়। প্রশ্ন তাই একটাই, আমরা কি প্রস্তুত?

গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রস্তুতির জায়গায় আমাদের রয়েছে ঘাটতি বড়। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ ২৯৬টি ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত করেছে, যার অধিকাংশই রাজনৈতিক। একই সময়ে ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রতি তিনজন শিশু ও তরুণের দুজন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া খবরকে সবচেয়ে বড় মানসিক চাপ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রায় এক-চতুর্থাংশ তরুণ জানায়, তারা অনলাইনে নিরাপদ বোধ করে না। এই দুটি তথ্য-সংকেত চারটি বাস্তবতা বোঝায়। প্রথমত, ভুয়া কনটেন্টের সরবরাহ স্থায়ী ও ধারাবাহিক। দ্বিতীয়ত, তরুণদের মানসিক সুস্থতায় এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে। তৃতীয়ত, আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল। চতুর্থত, আস্থা-ঘাটতি যত বাড়ে, প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ার ওপর সন্দেহ তত ঘনীভূত হয়।

দেশের নির্বাচনী ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে গুজব-সংবেদনশীলতার কারণ স্পষ্ট হয়। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীন তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পর সেই কাঠামো বাতিল, পরবর্তী সময়ে বর্জন, দমন ও বিতর্কিত প্রক্রিয়াÑ এ সবকিছু মিলিয়ে আস্থার পাটাতন পাতলা হয়েছে। ২০১৮ সালের ভোটের আগে ইন্টারনেট বন্ধ ছিল ‘গুজব ঠেকানোর’ নামে; ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ভোট ঘিরেও বর্জন দেখা গেছে। বারবার দেখা গেছে, যখন স্বচ্ছতার জায়গায় নীরবতা, তখন গুজবই হয়ে ওঠে সবকিছুর ডিফল্ট ব্যাখ্যাÑ ভোট গণনা, পুলিশি পদক্ষেপ, প্রশাসনিক ঘোষণা পর্যন্ত। সংকটের সময়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট যেন ঝড়ের দিনে আবহাওয়ার বুলেটিন বন্ধ করার মতো। এতে না ঝড় থামে, না মানুষ আশ্রয় পায় বরং যাচাইকৃত তথ্য থেকে সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, আর গুজব অফলাইনে ছড়িয়ে পড়ে আরও দ্রুতগতিতে।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, সুষ্ঠু নির্বাচন মানে শুধু ভোট নয়, আস্থা। কে ভোট দেবে, কোথায় ও কীভাবে দেবে, গণনা কীভাবে হবে, আপত্তি কীভাবে মিটবেÑ এগুলোর প্রতিটি ধাপে যদি অস্পষ্টতা থাকে, তাহলে একটি ভুয়া ‘নোটিস’, একটি কেটে-ছেঁটে বানানো ভিডিও কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রক্রিয়াজাত একটি অডিওই বিশৃঙ্খলা তৈরিতে যথেষ্ট। ফল ঘোষণার আগেই বৈধতা ক্ষয়ে যেতে শুরু করে, কর্মকর্তারা আতঙ্কিত হন, ভোটাররা বিভ্রান্ত হন। ডাকসু, জাকসুর মতন সাম্প্রতিক শিক্ষাঙ্গনভিত্তিক নির্বাচনগুলো ঘিরে বিতর্কের কারণগুলোও এই সমস্যাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই আগাম স্পষ্টতার মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধের ওপর আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

তরুণরাই সবচেয়ে বড় সংখ্যায় অনলাইন ব্যবহারকারী আর তথ্য বিভ্রান্তির ধাক্কা সবার আগে আঘাত হানে তাদের ওপরেই। রিল, স্টোরি, ক্লোজড গ্রুপÑ  মিনিটে মিনিটে বার্তা বদলায়; একটি ‘ফরওয়ার্ডেড’ টেক্সটের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করার সময় বা সক্ষমতা খুব কম লোকেরই থাকে। ইউনিসেফের জরিপ তাই কেবল ‘ডেটা’ নয়, এটি গভর্ন্যান্সের সতর্ক ঘণ্টা : যদি তরুণরা সবকিছুকেই অবিশ্বাস করতে শেখে, নাগরিকতার জায়গায় হতাশা এসে বসে; যুক্তিযুক্ত আলোচনার জায়গা দখল করে ক্ষণস্থায়ী উচ্ছ্বাস বা ক্ষোভ। অথচ একই নেটওয়ার্ক দিয়ে নির্ভুল তথ্যও ছড়ানো যায়, যদি তরুণদের ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ হিসেবে প্রস্তুত করা যায়।

এখানেই প্রযুক্তি যেমন সুযোগ, তেমনি সতর্কতাও। উদাহরণ হিসেবে, বাংলা ভাষার এআই-ভিত্তিক বিভিন্ন মডেল পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ শনাক্তকরণে উচ্চ নির্ভুলতার সক্ষমতা দেখাচ্ছে। এর অর্থ, প্রযুক্তিগত হাতিয়ার তৈরি হচ্ছে। কিন্তু তা মাঠে কাজে লাগাতে হলে দরকার সুসংহত নীতি, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং বাংলা কনটেন্টে প্লাটফর্মগুলোর বাস্তব বিনিয়োগ। কেবল ‘অ্যালগরিদম’ থাকা আর জনগণের হাতে তা পৌঁছে দেওয়াÑ  এ দুয়ের মধ্যে বড় ফাঁক থাকে। এই ফাঁক যতদিন থাকবে, ততদিন প্রযুক্তির শক্তি নীতির দুর্বলতায় আটকে থাকবে।

এখন প্রশ্নÑ কী করা যায় এবং কীভাবে? প্রথমত, গুজবের শূন্যস্থানে সত্যের আগাম উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের একত্রে বাংলায় সহজবোধ্য বার্তা, কারা ভোটার, কোথায় ভোট, ব্যালট কেমন, গণনা প্রক্রিয়া কী, অভিযোগ কোথায় ও কীভাবেÑ এগুলো আগেভাগে, আঞ্চলিক উপভাষাসহ ধারাবাহিকভাবে প্রচার করতে হবে। এই ‘প্রি-বাঙ্কিং’ কম খরচে সবচেয়ে বেশি আস্থা তৈরি করে। 

দ্বিতীয়ত, জেলায়-উপজেলায় দ্রুত যাচাই-ডেস্ক গড়ে তোলা দরকারÑ যেখানে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, জনসংযোগ, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং প্রশিক্ষিত তরুণ স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত থেকে মিনিটের মধ্যে গুজব নিশ্চিত/খণ্ডন করবে এবং যে প্লাটফর্মে গুজব ছড়িয়েছে, সেই প্লাটফর্মেই সংশোধিত তথ্য ফিরিয়ে দেবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যেমন ‘রেসপন্স টাইম’ গুরুত্বপূর্ণ, গুজব-ব্যবস্থাপনাতেও ‘টাইম-টু-ক্ল্যারিফিকেশন’ ততটাই নির্ণায়ক।

তৃতীয়ত, প্লাটফর্ম-স্বচ্ছতা বাংলা ভাষায় কার্যকর করতে হবে। রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের সহজে অনুসন্ধান যোগ্য আর্কাইভ, স্পষ্ট ডিসক্লেমার এবং বাংলায় দ্রুত আপিল-রেসপন্স মেকানিজম ছাড়া নির্বাচনকালে বিজ্ঞাপন ও প্রোপাগান্ডা নজরদারি বাস্তবে সম্ভব হয় না। বাংলায় পর্যাপ্ত মডারেশন রিসোর্স না থাকলে প্রয়োগ হয় কখনও ঢিলেঢালা, কখনও মাত্রাতিরিক্ত; এই অসামঞ্জস্যই নতুন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের খাদ্য জোগায়। প্লাটফর্মগুলো যদি দায় এড়ায়, তাহলে অন্তত নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ওয়াচডগের নিয়মিত কমপ্লায়েন্স স্কোরকার্ড জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিতÑ কে নিয়ম মানছে, কে মানছে না, তা জানানোই আস্থার প্রথম সোপান।

চতুর্থত, সত্য টিকিয়ে রাখতে নাগরিক অবকাঠামোতে স্থায়ী বিনিয়োগ লাগবে। ফ্যাক্ট-চেকিং, পাবলিক-ইন্টারেস্ট মিডিয়া, কমিউনিটি রেডিও, ক্যাম্পাস ক্লাব ও তরুণ ক্রিয়েটরদের ‘ভাইরাল হলে টাকা’ নয়Ñ দীর্ঘমেয়াদি তহবিল, অযথা মামলার বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা, আর আর্কাইভ-ডেটায় দ্রুত প্রবেশাধিকার দরকার। আর ছোট, সহজ, স্থানীয় ভাষার কনটেন্টে না দিতে পারলে সত্য মানুষের নিউজফিডে পৌঁছে না।

পঞ্চমত, সুরক্ষা যেন অধিকার খর্বের অজুহাত না হয়। গুজব যদি সংখ্যালঘু, নারী, সাংবাদিক বা স্থানীয় কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে, রাষ্ট্রের কাজ দ্রুত সুরক্ষা ও ন্যায্য জবাবদিহি, ব্ল্যাকআউট নয়। অভিজ্ঞতা বলে, ব্ল্যাকআউট অর্থনীতি ও জীবিকার ক্ষতি করে, আস্থা কমায়, আর গুজবকে অফলাইনে আরও ছড়ায়। অনুপাত-সম্মত আইনগত ব্যবস্থা, সঙ্গে দ্রুত ও দৃশ্যমান তথ্যÑ এই সমন্বয়ই জীবনও বাঁচায়, বৈধতাও রক্ষা করে।

অবশেষে, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ছাড়া এই লড়াই জেতা যাবে না। যেভাবে সাইক্লোন শেল্টার, আগাম সতর্কতা ও মহড়ার মাধ্যমে প্রাণহানি কমানো যায়, তথ্য-বিভ্রান্তিকেও তেমনি ‘পুনরাবৃত্ত ঝুঁকি’ হিসেবে ধরে নিয়মে বাঁধতে হবে। মাসওয়ারি ঝুঁকি-মানচিত্র, তরুণদের অভিমত ও চাপের পরিবর্তন নিয়ে ধারাবাহিক জরিপ, বাংলায় আরও উপযোগী প্লাটফর্ম-স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করতে হবে এবং ব্ল্যাকআউট যে ফল দেয় নাÑ  এই প্রমাণসমূহকে নীতিতে পরিণত করতে হবে। রাজনীতির উত্তাপে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া সহজ, কিন্তু আস্থা পুনর্গঠন কঠিনÑ তবে টেকসই সমাধান সেখানেই। প্রস্তুতি যদি রুটিন হয়Ñ ক্যাম্পেইনের আগে প্রি-বাঙ্কিং, ফ্ল্যাশপয়েন্টে যাচাই-ডেস্ক, টেকসই ফ্যাক্ট-চেকিং ইকোসিস্টেম, অনুপাত-সম্মত সুরক্ষা, তাহলে পরের অপ-তথ্যের ঢেউ বড় হলেও আস্থা ভাঙনের ক্ষতি কমানো সম্ভব।

বৃষ্টি থামাবার ক্ষমতা কারোর নেই; কিন্তু বন্যা ঠেকাবার সক্ষমতা আমাদের গড়ে তুলতে হবে। তথ্যের অবাধ আদান-প্রদানের এই যুগে সত্যকে রক্ষা করাÑ এ শুধু রাষ্ট্রের বা কোনো প্লাটফর্মের দায়িত্ব নয়, নাগরিক সমাজের, শিক্ষাঙ্গনের এবং সবচেয়ে বড় করে বললে তরুণদের। তাদের হাতেই রয়েছে দ্রুত যাচাই, স্পষ্ট ব্যাখ্যা আর সহনশীল সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলার শক্তি। এই শক্তিকে আমরা নীতিতে, বাজেটে ও প্রশিক্ষণে স্থান দিলেÑ গুজবের বর্ষা নামবে, কিন্তু আস্থার বাঁধ ভাঙবে না।

  • লেখক: নির্বাহী পরিচালক, সিরাক-বাংলাদেশ ও ফেলো, ইনক্লুসিভ ডেমোক্রেসি এক্সিলারেটর
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা