রাজনীতি
ড. মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৫৩ পিএম
রাজনীতি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া বা পথচলা, যেখানে ধৈর্য ও বিনয়ের অনুশীলনের মাধ্যমে অগ্রসর হতে হয়। এখানে কোনো শর্টকাট পথ নেই। কেউ যদি ভাবে এক লাফে রাজনীতির চূড়ায় উঠা সম্ভব, তবে তিনি ভুল করছেন। বিনয়ের সঙ্গে বলছি, তিনি ভুল পথে হাঁটছেন। রাজনীতির পথ বন্ধুর। এখানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধৈর্য, আত্মত্যাগ, আত্মনিরীক্ষা এবং বিনয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। কেউ কেউ হয়তো এক লাফে সাময়িকভাবে আলোচনায় চলে আসতে পারেন, গুরুত্বপূর্ণ পদ বা পরিচয়ে অধিষ্ঠিত হতে পারেন, কিন্তু সেখানে টিকে থাকাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শর্টকাট পথে হাঁটার মানেই হলো প্রস্তুতি ছাড়াই উচ্চতায় পৌঁছানো, যেখানে পায়ের নিচে শক্ত মাটি থাকে না। এর ফলে হঠাৎ করে ধসে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। এই ধরনের পথচলা রাজনীতির প্রকৃত শিক্ষা থেকে বিচ্যুত করে। এমনকি শর্টকাটপন্থীরা অনেক সময় সুবিধাবাদী গোষ্ঠী, ষড়যন্ত্রকারী মহল কিংবা রাজনৈতিক খেলোয়াড়দের ফাঁদেও পড়ে যেতে পারেন। তারা তখন নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন না; বরং অন্যের ছায়া বা দাবার ঘুঁটিটি হয়ে বেঁচে থাকতে হয়। এতে ব্যক্তি যেমন নিজেকে হারান, তেমনি রাজনীতিও হারায় নৈতিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা।
তাই সদাসতর্ক থাকতে হবে। রাজনীতির পথ হচ্ছে ত্যাগ, শিক্ষা, সেবা ও নৈতিকতার এক মহান পথ। এখানে ধৈর্যের কোনো বিকল্প নেই। তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান থাকবে, রাজনীতিকে ক্যারিয়ার নয়, বরং জনগণের সেবার পথ হিসেবে দেখুন। আদর্শ, ত্যাগ, বিনয় এবং ধারাবাহিকতাÑ এই চারটি গুণই একজন রাজনীতিককে দীর্ঘপথে সাফল্যের দিকে নিয়ে যায়।
ভুল মানুষ করতেই পারে এবং ভুল করা মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। রাজনীতির মতো জটিল অঙ্গনে ভুল হবে না বা কেউ ভুল করবে না, এটা হলফ করে বলা প্রায় অসম্ভব। বরং যারা রাজনীতি করেন, তারা জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এসে ভুল করবেনই আবার সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে শুদ্ধ করে তোলাই একজন প্রকৃত রাজনীতিকের পরিচয়। রাজনীতি মানেই শেখা, সংশোধন, ধৈর্য, ত্যাগ, বিনয় ও আত্মোন্নয়নের এক চলমান প্রক্রিয়া। তবে, অনেক সময় বাস্তবতা, সময়, কৌশল ও রাজনীতির নানা সমীকরণে একজন নেতাকে এক কদম পিছিয়ে যেতে হয়। কিন্তু সেই পিছিয়ে যাওয়া মানে রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাওয়া নয়। এ ক্ষেত্রে, আত্মসমালোচনা, দূরদর্শী পরিকল্পনা, লিডারশিপ অব ইনোভেশন যেন ভবিষ্যতের জন্য এগিয়ে যাওয়ার সোপান হয়ে ওঠে। অতীত থেকে শিক্ষা নিতে পারলেই সামনের পথে দু’কদম এগোনো যায় প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে। এটি এক প্রকার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, যা কেবল অভিজ্ঞ, দায়িত্বশীল ও জনভিত্তিক নেতৃত্বের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।
আমরা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন থেকেও এই মূল্যবান শিক্ষা পাই। তিনি ছিলেন ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা, যার নৈতিকতা, দূরদর্শিতা ও নেতৃত্ব সর্বজনস্বীকৃত। তারপরও তিনি সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ বা মাসোহারা করে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতেন। বিশেষ করে, হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় অনেক সাহাবি মনে করেছিলেন মুসলমানরা এই বুঝি পিছিয়ে পড়ল। কিন্তু বাস্তবে সেটিই ছিল কৌশলগত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, যার ফলে ভবিষ্যতে ইসলামের বিজয়ের দুয়ার খুলে যায়। এই ঘটনা আমাদের শেখায়, কৌশলগতভাবে পিছিয়ে আসাও কখনও কখনও অগ্রগতির প্রথম ধাপ হতে পারে, যদি তা হয় সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে।
রাজনীতি মানে শুধু মাঠে-ময়দানে ভাষণ দেওয়া নয়; প্রকৃতপক্ষে, রাজনীতি হচ্ছে মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও প্রত্যাশাকে হৃদয়ে ধারণ করা এবং সেই অনুযায়ী অবিরত কাজ করে যাওয়া। এখানে শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতিতে বিনয়ের কোনো বিকল্প নেই। বিনয় একজন নেতাকে জনমানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দেয়, কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং নেতৃত্বকে টেকসই করে। সহি হাদিসে এসেছে, আল্লাহ যাকে বিনয় দান করেন, তিনি তাকে মর্যাদায় উন্নীত করেন (সহি মুসলিম: ২৫৮৮)। অপরদিকে, আত্মঅহংকার একজন নেতাকে ধীরে ধীরে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। অহংকার তাকে কর্মী ও গণমানুষ থেকে আলাদা করে দেয়, পরামর্শ ও সমালোচনা গ্রহণে অক্ষম করে তোলে। ইসলামে অহংকারকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একজন অহংকারী নেতা নিজেই নিজের পতনের কারণ হয়ে ওঠেন। তাই রাজনীতি করতে হলে শিখতে হবে বিনয়, সহনশীলতা এবং নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার মানসিকতা। নেতার পরিচয় তার জ্ঞানে নয়, তার নৈতিকতায়; তার অবস্থানে নয়, বরং তার আচরণে। নেতৃত্ব কেবল শাসনের নয়Ñ নেতৃত্ব সেবার, শ্রদ্ধার এবং সহমর্মিতারও নাম।
ইসলামে মুখের ভাষা বা জিহ্বার ব্যবহার নিয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। একে ইসলাম অ্যাকাউন্টেবল আমল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান আনে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে। অন্য এক হাদিসে এরশাদ হয়েছে, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) কে প্রশ্ন করা হলো, মানুষকে সবচেয়ে বেশি কী জিনিস জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করবে? তিনি বললেন তার জিহ্বা বা মুখের কথা। অতএব, শুধু রাজনীতি নয়, আমরা যেন সর্ব-অবস্থায় মুখের মন্দ কথা ও জিহ্বার অপব্যবহার থেকে বেঁচে থাকি ।
বিশেষ করে, যারা ইসলামী রাজনীতির কথা বলেন বা ইসলামের আদর্শকে সামনে রেখে রাজনীতি করেন, তাদের দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ তারা শুধু জনগণের প্রতিনিধি নন, বরং ইসলামের আদর্শের প্রতিনিধিও বটে। এখানে কোনো ধরনের দ্বিমুখী আচরণের জায়গা নেই।
প্রকৃতপক্ষে, রাজনীতির নামে যদি কেউ অপশব্দ, মিথ্যাচার, অপবাদ ও গিবত ব্যবহার করে, তবে তিনি রাজনীতি করছেন না, বরং নিজের জন্য গুনাহের খাতা ভারী করছেন। ইসলামী শিক্ষার আলোকে নেতার দায়িত্ব হলো সত্য বলা, সদাচার করা এবং অন্যদের জন্য দোয়া ও কল্যাণ কামনা করা। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন- ‘মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার হাত ও জিহ্বা থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে’ (সহি বুখারি ও মুসলিম)।
রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে দিকটি আমরা প্রায়শই উপেক্ষা করি, তা হলো স্পেস যাকে আমরা পলিটিক্যাল স্পেস বলে থাকি। এটিই হলো ভিন্নমতের অস্তিত্ব স্বীকার করার জায়গা। রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবেই, কিন্তু কোনো দল বা ব্যক্তি যদি মনে করে শুধু তারাই থাকবে, আর অন্যদের কোনো জায়গা থাকবে না, তবে সেটা গণতন্ত্র নয়, সেটাই প্রকৃতপক্ষে কর্তৃত্ববাদ বা ফ্যাসিবাদ। রাজনীতিকে যদি সত্যিই গণমুখী ও টেকসই করতে হয়, তবে প্রতিপক্ষের জন্য অবশ্যই একটি সম্মানজনক স্পেস রেখে দিতে হবেÑ সংবিধানে, সংসদে, রাজপথে এবং মিডিয়ায়। গণতন্ত্র মানেই অংশগ্রহণ, আর অংশগ্রহণের প্রথম শর্তই হলো অন্যের জন্য স্পেস তৈরি করে দেওয়া। রাজনীতিকে প্রাণবন্ত রাখতে, সহনশীল ও সমন্বিত সংস্কৃতি গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই এবং প্রতিপক্ষের জন্য সব সময় একটি জায়গা রেখে দিতে হবে। রাজনীতিতে স্পেস না রাখলে কী পরিণতি বরণ করতে হয়, তা আমার নিকট অতীত থেকেও শিক্ষা নিতে পারি।
সর্বোপরি, রাজনীতি হলো মানুষের সেবা করার একটি মহৎ প্লাটফর্ম। এখানে নিজেকে প্রমাণের জন্য নয়, বরং জনতার কল্যাণের জন্য কাজ করতে হয়। একজন প্রকৃত রাজনীতিক কখনোই ছোট মন নিয়ে বড় রাজনীতিবিদ হয়ে উঠতে পারেন না। তাকে হতে হয় বড় হৃদয়ের, উদার মানসিকতার এবং বিনয়ের প্রতিমূর্তি। বিশেষ করে, এ সময়ের তরুণ রাজনীতিকদের প্রতি বিনীত আহ্বান থাকবেÑ ক্ষমতা নয়, আদর্শ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা হোক রাজনীতির চালিকাশক্তি। অস্থিরতা নয়, ধারাবাহিকতা ও মূল্যবোধ হোক পথচলার একমাত্র পাথেয়। তাহলেই আমরা পেতে পারি সকলের প্রত্যাশিত একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক, কল্যাণমুখী সমাজ ও দেশ। কারণ, আজকের বিশ্বায়নের যুগে রাজনীতি কেবল দেশীয় সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা ডিজিটাল গভর্ন্যান্সÑ সবকিছুই এখন রাজনীতির মূল আলোচনার অংশ। সুতরাং, রাজনীতিকে সময়োপযোগী করতে হলে নতুনত্বের প্রয়োগ, অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অপরিহার্য। এক কথায় বলা যায়, রাজনীতি হলো এক ধৈর্যের পরীক্ষা, বিনয়ের অনুশীলন, নতুনত্বের প্রয়োগ, অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও দূরদর্শী কৌশলের সমন্বিত শিল্প।