× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নারীর হাতে অর্থনীতির চাবি

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:১০ এএম

নারীর হাতে অর্থনীতির চাবি

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারী উদ্যোক্তাদের অবদান আজ আর বিতর্কের বিষয় নয়। তারা শুধু পরিবারের আয় বাড়াচ্ছেন না বরং সামষ্টিক অর্থনীতির এক অপরিহার্য চালিকাশক্তি হয়ে উঠছেন। বিশ্বব্যাপী নারী উদ্যোক্তার আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে এখন জাতীয় প্রবৃদ্ধির কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশে এই অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়েছে যদিও সামনে এখনও অনেক পথ বাকি। জয়পুরহাটের রূপা আক্তারের গল্প এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মাত্র পাঁচশ টাকা হাতে নিয়ে তিনি ফেসবুকে মুড়কি বিক্রি শুরু করেছিলেন। প্রথমে লেনদেন হতো হাতে হাতে। ফলে ব্যবসা বড় হচ্ছিল না। পরে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সঞ্চয়ী হিসাব খোলেন, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার শুরু করেন। এতে ক্রেতাদের আস্থা বাড়ল, বিক্রি বেড়ে গেল। কয়েক মাস পর নারী উদ্যোক্তা রিফাইন্যান্স স্কিম থেকে জামানতবিহীন ঋণ পেলেন। সেই অর্থ দিয়ে একটি ছোট প্যাকেজিং মেশিন কিনলেন।

এখন তার সঙ্গে আরও পাঁচজন নারী কাজ করছেন। রূপার এই যাত্রা প্রমাণ করে, ব্যাংকের দরজা খোলামাত্রই নারীরা কেবল টাকার গ্রাহক নন বরং নতুন কর্মসংস্থানের উৎসও। তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের ব্যাংকিংয়ে অংশগ্রহণ অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ডিপোজিটে নারীদের অবদান প্রায় অর্ধেকের ঘরে পৌঁছেছে। এ ছাড়া নারীদের ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট ও ঋণ অ্যাকাউন্ট উভয়ই বছরে ১৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ব্যাংকিং খাতের মোট কর্মীসংখ্যার মধ্যে নারীর উপস্থিতি মাত্র ১৬- ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ নারীরা গ্রাহক হিসেবে সামনে এলেও ব্যাংকের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ভূমিকায় তাদের উপস্থিতি এখনও সীমিত। এই বৈষম্যের কারণে নারী উদ্যোক্তাদের চাহিদাভিত্তিক আর্থিক সেবা ডিজাইন করতে অনেক ব্যাংকই পিছিয়ে আছে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গুরুত্ব এখানে বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে ফলে তারা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে স্বাবলম্বী হতে পারেন। দ্বিতীয়ত, ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা পেলে তারা ব্যবসার পরিধি বাড়াতে পারেন, নতুন বাজার ধরতে পারেন এবং আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারেন। তৃতীয়ত, নারী উদ্যোক্তার অন্তর্ভুক্তি একটি টেকসই প্রবৃদ্ধির পথ তৈরি করে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন নারী যখন আয় করেন তখন সেই আয় কেবল পরিবারের খাদ্য বা পোশাকে ব্যয় হয় না বরং সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগেও কাজে লাগে। তাই অর্থনীতিতে প্রতিটি নারীর অংশগ্রহণ বহুগুণ প্রভাব সৃষ্টি করে।

অনেক নারী উদ্যোক্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলেও নিয়মিত লেনদেন হয় না। অনেক সময় তারা ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে জামানতের শর্তে আটকে যান। ডিজিটাল ব্যাংকিং ও মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার নিয়ে ভীতি কাজ করে, প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। আবার অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা নারী উদ্যোক্তার ব্যবসার সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে গুরুত্ব দেন না। সামাজিক মানসিকতার প্রতিবন্ধকতাও বড়। অনেক পরিবার এখনও মনে করে, ব্যবসা বা আর্থিক বিষয়ে নারীর সংশ্লিষ্টতা দরকার নেই। ফলে ব্যাংকের দরজা খোলা থাকলেও বাস্তবে নারীরা ভেতরে ঢুকতে দ্বিধাগ্রস্ত হন। এই বাস্তবতায় করণীয় হলো কয়েকটি নির্দিষ্ট উদ্যোগ। জামানতবিহীন ঋণের সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানো দরকার। 

আফ্রিকার কিছু দেশে মোবাইল মানির প্রসার নারীদের আয়ের ধারাকে মূলধারায় এনেছে। আগে যেখানে নারীরা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ছিলেন এখন মোবাইল মানির মাধ্যমে তারা লেনদেন, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করতে পারছেন। এতে তাদের আর্থিক ক্ষমতায়ন বেড়েছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। ভারতের অভিজ্ঞতাও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সেখানে নারী উদ্যোক্তা গ্রুপগুলোকে সমষ্টিগতভাবে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা চালু আছে। এর ফলে পুনঃপরিশোধের হার আশ্চর্যজনকভাবে বেশি হয়েছে। শুধু তাই নয়, কেনিয়াতে এম-পেসার মতো মোবাইল ফিনটেক প্লাটফর্ম নারীদের ক্ষুদ্র ব্যবসায় দ্রুত মূলধন জোগাড়ের সুযোগ দিয়েছে। ইথিওপিয়াতে নারীকেন্দ্রিক ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষি খাতে নারীদের অংশগ্রহণকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। রুয়ান্ডাতে আবার সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করে নারীদের জন্য বিশেষ উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ এবং মার্কেট অ্যাক্সেস প্রোগ্রাম চালু করেছে। বাংলাদেশের জন্য এসব মডেল কার্যকর হতে পারে বিশেষ করে নারীদের ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়ন, ডিজিটাল আর্থিক সাক্ষরতা এবং মোবাইলভিত্তিক সেবা বাড়ানোর ক্ষেত্রে। আমাদের নারীরা যদি সম্মিলিতভাবে পুঁজির জোগান পান এবং ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন করেন তবে তাদের ব্যবসা টেকসই হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও দৃশ্যমান প্রভাব ফেলবে।

নারী উদ্যোক্তার আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কোনো অনুকম্পা নয়, এটা অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখতে হবে। নারী উদ্যোক্তারা যখন ক্ষমতায়িত হন তখন তাদের ব্যবসা বড় হয়, কর্মসংস্থান তৈরি হয়, পরিবার স্বাবলম্বী হয়, সমাজ সমৃদ্ধ হয়। যদি আমরা সঠিক নীতি, প্রযুক্তি ও সামাজিক সহযোগিতা একসঙ্গে দিতে পারি, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি আর অর্ধেক থাকবে না। পুরোটা হয়ে উঠবে আমাদের প্রবৃদ্ধির নির্ভরযোগ্য ছায়া।

  • ব্যাংকার এবং কলাম লেখক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা