মোছা. শাকিলা খাতুন
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:০৬ এএম
শিশু মানবজীবনের সবচেয়ে পবিত্র ও সম্ভাবনাময় অধ্যায়। সমাজের প্রতিটি অগ্রগতির সূচনা হয় একেকটি শিশুর চোখে দেখা স্বপ্নের ভিত থেকে। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম রূপ বহু শিশুর জীবন থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে সেই স্বপ্ন দেখার অধিকারটুকুও। দারিদ্র্য, বৈষম্য, অজ্ঞতা, সামাজিক অবহেলা এবং রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার ফলে আমাদের সমাজে অসংখ্য শিশু বেড়ে উঠছে এক গভীর ঝুঁকির পরিখায় বন্দি হয়ে। তারা বই-খাতার বদলে হাতে তুলছে হাতুড়ি, মালপত্র; নিরাপদ আশ্রয়ের বদলে রাত্রি কাটাচ্ছে খোলা আকাশের নিচে; স্নেহময় পরশের বদলে পাচ্ছে লাঞ্ছনা ও সহিংসতা।
বাংলাদেশে শিশুশ্রম একটি বহুল প্রচলিত ও জটিল সামাজিক সমস্যা। সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা অনুসারে, দেশে প্রায় ৩৫–৪০ লাখ শিশু বিভিন্ন প্রকার শ্রমে নিযুক্ত। তারা কাজ করে চায়ের দোকান, গাড়ির গ্যারেজ, কন্সট্রাকশন সাইট, পোশাক কারখানা কিংবা গৃহকর্মে। শিশুশ্রমের মূল কারণ হলো দারিদ্র্য। দরিদ্র পরিবারে শিশুদের উপার্জন না থাকলে সংসার চলে না। শিক্ষার সুযোগ ও প্রাসঙ্গিক দক্ষতা উন্নয়নের অভাবও তাদের শ্রমের দিকে ঠেলে দেয়।
প্রতিবন্ধী শিশুরা সমাজের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী। দেশে আনুমানিক ১০–১৫% শিশু শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বা মানসিক প্রতিবন্ধিতার শিকার। তারা শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে নয়, সামাজিক কুসংস্কার, বৈষম্য ও অবহেলার কারণে মূলধারার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বাংলাদেশের এক নিঃশব্দ মহামারির মতো। শারীরিক শাস্তি, যৌন নিপীড়ন, মানসিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, পাচারÑ সবই শিশুদের জীবন দুর্বিষহ করে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ শিশু বাড়িতে শারীরিক শাস্তির শিকার হয়। বিদ্যালয়েও শাস্তিমূলক সহিংসতা প্রচলিত। যৌন নিপীড়নের ঘটনাগুলো গোপন থাকে, অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। বাল্যবিবাহ মেয়েদের অল্প বয়সে শিক্ষার অধিকার ও নিরাপত্তা হারিয়ে দেয়, মাতৃ-মৃত্যুহার বাড়ায় এবং দরিদ্র প্রজন্ম তৈরি করে। এতে শুধু ব্যক্তিগত নয়, দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শিশুরা সমাজের ভবিষ্যৎ। প্রতিটি শিশুর জীবন সমান মূল্যবানÑ ধনী বা দরিদ্র, সক্ষম বা প্রতিবন্ধী। ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও মৌলিক শর্ত। যে সমাজ তার শিশুদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, সেই সমাজ ভবিষ্যতের প্রতিকূলতার মুখে পড়বে। শিশুদের জীবন থেকে নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্নেহ কেড়ে নেওয়া মানে পুরো সমাজের সম্ভাবনা হারানো।
রাষ্ট্র ও সমাজকে দায়িত্ব নিতে হবে। শিশুরা ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং সম্মান চায়। তাদের স্বপ্ন রক্ষা করলে আমরা ভবিষ্যতের একটি শক্তিশালী, জ্ঞানী ও ন্যায়পরায়ণ সমাজ নিশ্চিত করছি। শৈশব হারালে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ হারাই। তাই আজই পদক্ষেপ নিতে হবেÑ শিশুদের জীবন নিরাপদ করতে, তাদের স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করতে এবং সমাজকে এমন করে গড়ে তুলতেÑ যেখানে কোনো শিশু আর সহিংসতা, শোষণ বা অবহেলার শিকার হবে না।