খেলাপি ঋণ
ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৫৩ এএম
বাংলাদেশ এখন এশিয়ার সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের দেশ। ২০২৪ সালে দেশের মোট বিতরণ করা ঋণের ২০ দশমিক ২ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত মাসে প্রকাশিত এডিবির ‘ননপারফর্মিং লোনস ওয়াচ ইন এশিয়া ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার। এটা আগের বছরের চেয়ে ২৮ শতাংশ বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এশিয়ার ‘সবচেয়ে দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থার’ দেশ। এই অঞ্চলে এক বছরে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে ১১ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট, যা অস্বাভাবিক। অন্যদিকে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা গত বছর বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে খেলাপি অনুপাত কমাতে পেরেছে। নেপালে সামান্য বেড়েছে, ০.৯ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার বড় অর্থনীতির দেশ ভারত তাদের খেলাপি ঋণ ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে নামিয়ে ২ দশমকি ৫ শতাংশে আনতে পেরেছে, কারণ তারা বড় ধরনের ব্যাংক সংস্কার করেছে। এডিবি বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচ দেশ মিলিয়ে ২০২৩ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার, যা এশিয়ার মোট খেলাপি ঋণের ১২ দশমিক ৪ শতাংশ। এই অঙ্ক আগের বছরের তুলনায় কমেছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিতরণ করা ব্যাংকঋণ খেলাপি হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত দলটির শীর্ষ নেতাদের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ব্যবসায়ীরা অনেকেরই ঋণ খেলাপির তালিকায় রয়েছেন। আবার দেশের অর্থনীতিতে বর্তমান মন্দাবস্থার কারণেও বহু ব্যবসায়ীর ঋণ খারাপ হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া নতুন নীতিমালার কারণেও খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ভালো-খারাপ প্রায় সব ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে সর্বশেষ জুন মাসের শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ২৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় চার ভাগের এক ভাগের বেশিই ইতোমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে। গত মার্চের শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। তখন খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলো এরকম তথ্যই উল্লেখ করেছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, যা এ বছরের জুনে বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা গত মার্চে ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। ভালো ও খারাপ সব ব্যাংকের খেলাপি ঋণই গত জুনে বেড়েছে। নতুন নীতিমালার কারণেও খেলাপি ঋণ বাড়ছে বলে অভিযোগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে যে অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে, তা এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করেছে। আবার ঋণ খেলাপি হওয়ার নিয়ম আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কারণেও দেশে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। যেসব ঋণ নবায়ন করা হয় তার অনেকগুলো আদায় হচ্ছে না। অনিয়মের কারণে অনেক ঋণ খেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে, যা সামনে আরও বাড়তে পারে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে, তখন মোট খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এর পর থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অর্থনীতিবিদরা অনেকদিন ধরেই অভিযোগ করছিলেন যে তৎকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালীরা নানা অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নিয়ে যাচ্ছেন, যার একটা বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র বের হতে শুরু করে। সেই সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে প্রভাবশালীদের বড় অঙ্কের ঋণ দিতে নানা সুবিধা দেওয়া হয়। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কাগজে-কলমে কম দেখাতে নেওয়া হয় একের পর এক নীতি। সরকার পরিবর্তনের পর সেই নীতি থেকে সরে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। খেলাপি ঋণে জর্জরিত পাঁচ ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ব্যাংকের গড় খেলাপি ঋণ ৭০ শতাংশ। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ও বহুল সমালোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হওয়া ব্যাংকগুলোর ঋণের প্রকৃত চিত্র বের হতে শুরু করেছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেশি বেড়েছে। একইভাবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি বেড়েছে। এই পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি সরকারি খাতের অগ্রণী ও জনতা এবং বেসরকারি খাতের আইএফআইসি, ইউসিবি, এনআরবি ও এনআরবি কমার্শিয়ালসহ বেশিরভাগ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়ছে।
এদিকে খেলাপি হয়ে পড়া ১ হাজার ২০০ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিশেষ বিবেচনায় নবায়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে শতাধিক ব্যবসায়ীকে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নীতি সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশে ঋণখেলাপির পরিমাণ বাড়ছে এবং সামগ্রিক বিবেচনায় প্রায় নব্বই দশকের আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। এই বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কেউ বাণিজ্যিক ব্যাংকের দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন, কেউ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ নজরদারির অভাবকে, আবার কেউ বৃহৎ ঋণগ্রহীতা বা ঋণখেলাপিদের প্রতি রাজনৈতিক সরকারের আনুকূল্যকে। খেলাপি ঋণের দৈন্যদশায় ইতোমধ্যে সম্পাদিত আর্থিক খাতের সংস্কারগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তবে আশার কথা, ব্যাংকগুলোকে বিশেষ বিবেচনায় খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিল ও পুনর্গঠন করার সুযোগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মাত্র দুই শতাংশ ডাউন-পেমেন্টের খেলাপি ঋণ ১০ বছরের জন্য পুনঃতপশিলের সুযোগ বিপরীতে ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ নিয়মিত করা যাবে। দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড এবং সংশ্লিষ্ট খাতের সর্বনিম্ন সুদহারের চেয়েও এক শতাংশ কম সুদ নির্ধারণ করা যাবে। ব্যাংকগুলোই এসব সুবিধিা দিতে পারবে। কোনো কারণে প্রয়োজন হলে ৩০০ কোটি টাকার বেশি ঋণে নীতি সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাছাই কমিটিতে আবেদন করা যাবে। মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত নির্দেশনা সব ব্যাংকে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংবাদটি স্বস্তির বলা যায়। এই সংক্রান্ত এক সার্কুলারে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ৩০ জুন বিরূপ মানে শ্রেণীকৃত ঋণে পরিমাণ বিবেচনায় ব্যাংকার–গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে পুনঃতপশিল করা যাবে। এ জন্য আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আবেদন করতে হবে। আবেদনের ৬ মাসের মধ্যে ব্যাংক থেকে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। নীতি সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট চেক বা অন্য কোনো ইনস্ট্রুমেন্টের মাধ্যমে দিলে তা নগদায়নের পর হতে ৬ মাস গণনা করতে হবে। ডাউন পেমেন্টের অর্থ ব্যাংকের অনুকূলে নগদায়নের আগে নীতি সহায়তার আবেদন কার্যকর করা যাবে না। ইতোপূর্বে তিন বা তার বেশি পুনঃতপশিল করা ঋণে অতিরিক্ত ১ শতাংশ ডাউন-পেমেন্ট আদায় করতে হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নীতি সহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি নিতে হবে না। তবে এ বিষয়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ হতে অনুমোদন নিতে হবে। একাধিক ব্যাংক হতে ঋণের বিপরীতে নীতি সহায়তার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঋণ প্রদানকারী ব্যাংক বা সকলের সম্মতিতে নীতি সহায়তার উদ্যোগ ও সভার আয়োজন করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। ৩০০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ স্থিতির ঋণগ্রহীতাকে নীতি সহায়তার বিষয়ে ব্যাংক থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না হলে আন্তঃব্যাংক সভার কার্যবিবরণী বা পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনসহ ‘ব্যবসা ও আর্থিক ব্যবস্থাদি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে গঠিত নীতি সহায়তা সংক্রান্ত বাছাই কমিটি’ বরাবর আবেদন পাঠাতে হবে। তবে জাল-জালিয়াতি বা অন্য কোন ধরনের প্রতারণা বা অনিয়মের মাধ্যমে সৃষ্ট ঋণের ক্ষেত্রে এ সার্কুলারে বর্ণিত সুবিধা দেওয়া যাবে না। ব্যাংক থেকে চূড়ান্তভাবে ঘোষিত ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা এ সার্কুলারে বর্ণিত সুবিধাদি পাবে না।
উল্লেখ্য, বিগত সরকারের সময়ে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতপশিল, পুনর্গঠনসহ নানা সুবিধা দিয়ে খেলাপি ঋণ কম দেখানো হতো। সরকার পতনের পর তা হুহু করে বাড়ছে। এরই মধ্যে খেলাপি ঋণ দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এরকম অবস্থায় গত জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি কমিটি গঠন করে বিশেষ বিবেচনায় খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দিচ্ছিল। এখন তা ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া হলো।
আসলে আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ। এই খেলাপি ঋণ দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত একটি সমস্যা। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে ঋণগ্রহীতার কারণে যেমন কোনো ঋণ খেলাপি হয়, তেমনি ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে কোনো কোনো ঋণ খেলাপি হতে পারে। খেলাপি ঋণের এই বৃদ্ধিকে ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা একটি অশনিসংকেত হিসেবেই দেখছেন।