× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

খাদ্য নিরাপত্তা

ক্ষুধামুক্ত বিশ্বের জন্য চাই সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা

শেলী সেনগুপ্তা

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:১০ পিএম

ক্ষুধামুক্ত বিশ্বের জন্য চাই সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা

সবার জন্য খাদ্যের ‘সুষম বণ্টন’ কথাটি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। খাদ্য ব্যবস্থাপনা বলতে আমরা বুঝি, খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বণ্টন এবং গ্রহণ পর্যন্ত জড়িত সমস্ত প্রক্রিয়া ও কার্যক্রমকে। এটি খাদ্য নিরাপত্তা, গুণমান এবং টেকসই ব্যবহার করার জন্য একটি সমন্বিত পদ্ধতি। 

প্রতিটি মানুষের বাঁচার জন্য খাদ্য অপরিহার্য, শুধু মানুষ নয়, প্রতিটি প্রাণীর জন্য খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে এই সময় আমরা মানুষের কথাই বলছি। প্রতিটি মানুষের মৌলিক চাহিদাই হলো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা। এর মধ্যে খাদ্যের স্থান প্রথম ও প্রধান। তারপরও বলতে হয়, দুঃখজনকভাবে বিশ্বের প্রতি ১০০ জনে ১০ জন ভুগছে খাদ্য সংকটে। এর মূলে যতটা রয়েছে খাদ্য সংকট তার চেয়ে বেশি রয়েছে খাদ্য অব্যবস্থাপনা।

খাদ্য ব্যবস্থাপনা একটি ব্যাপক ধারণা, যা খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ, বিতরণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ খাদ্যবিষয়ক সকল কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করে। খাদ্য ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হলো খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, খাদ্য নিরাপদ রাখা, খাদ্যের গুণগতমান বজায় রাখা এবং খাদ্য অপচয় রোধ করা। 

আমাদের দেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই খাদ্য জোগান দেওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম কৃষি। কিন্তু গত কয়েক দশক থেকে পৃথিবীর আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। জলবায়ু এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চাষযোগ্য জমিও কমে যাচ্ছে। তা ছাড়া মানুষের বাসস্থান বৃদ্ধির কারণে কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়ছে, এজন্যও চাষের জমি কমে যাচ্ছে। তাই বলতে পারি, এখন সময় হয়েছে বিষয়টি নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করা এবং এই সমস্যা সমাধানে বিশ্বের সঙ্গে একাত্ম ঘোষণা করে বিশাল কর্মযজ্ঞে অংশ নেওয়া। 

কৃষিকে কেন্দ্র করে বিশ্বের মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান দেওয়া, দরিদ্র ও পুষ্টিহীনতা দূর করে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর জন্ম নেয় জাতিসংঘের ‘খাদ্য ও কৃষি সংস্থা’। যেটিকে লাতিন ভাষায় বলা হয় ‘ফিয়াত পানিস’ অর্থাৎ ‘সবার জন্য রুটি’।

‘সবার জন্য রুটি’ বা ‘সবার জন্য খাদ্য’ কর্মসূচি সফল করার জন্য সবার আগে দরকার সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা। খাদ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক রয়েছে, এর মধ্যে প্রথমেই চলে আসে খাদ্য উৎপাদন করার দিকটি। এজন্য করতে হয় কৃষিকাজ, মৎস্য চাষ, পশুপালন ইত্যাদি। 

এর পর আসছে খাদ্যকে প্রক্রিয়াকরণ করা অর্থাৎ শস্য মাড়াই, গম থেকে আটা প্রস্তুত এবং বিভিন্ন ধরনের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ। তা হতে পারে দুধ থেকে দই, ছানা, ঘি কিংবা পনির। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর খাদ্য টিনজাত করা। 

প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্যগুলোকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের বিষয়টিও এর মধ্যে যুক্ত হয়। এজন্য যেমন দরকার আধুনিক হিমাগার, বাসস্থানে ফ্রিজ এবং বায়ুরোধী পাত্র। এইসব পদ্ধতির মাধ্যমে খাদ্যসামগ্রী এমনভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে হবে, যেন সেই খাদ্য ভোক্তা দীর্ঘদিন পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারে।

এর পর আসছে উৎপাদিত এবং প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্যসামগ্রী ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া। এটি হতে পারে, বাজার থেকে পাইকারি বা খুচরা উপায়ে। হতে পারে গৃহে রান্না করা কিংবা হোটেল রেস্তোরাঁয় প্রস্তুত করা খাবার ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া। ভোক্তা নিজে সংগ্রহ করতে পারে কিংবা পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। 

হোটেল কিংবা বাসাবাড়িতে প্রস্তুতকৃত খাদ্য গ্রহণ করে মানুষ বা প্রাণী। খাদ্য শুধু গ্রহণ করার পর যা আসছে তা হলো খাদ্য অপচয় রোধ করা। যার যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকু গ্রহণ করা উচিত। অবশ্যই অপচয় রোধ করতে হবে।

তারপর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকটি। সঠিক উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হয়। কারণ, এই পরিবেশের মধ্যেই আমরা বসবাস করি। পরিবেশ বিশুদ্ধ থাকলে আমরা ভালো থাকতে পারি।

এই সময়ে এসে পৃথিবীজুড়ে কাজ করা হচ্ছে ‘ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব’ নিশ্চিত করার জন্য। তাই খাদ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দরকার সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খাদ্যবাহিত রোগ ও দূষণ থেকে মুক্ত থাকা। 

তা ছাড়া খাদ্য অপচয় হ্রাস করার জন্য খাদ্য ব্যবস্থাপনা জরুরি। খাদ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই খাদ্য উৎপাদন ও বিতরণের মাধ্যমে খাদ্য অপচয় কমানো যায়। তা ছাড়া কার্যকরী খাদ্য ব্যবস্থাপনা খাদ্য সরবরাহকে আরও সুসংহত ও নির্ভরযোগ্য করে তোলে। 

সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হলেই সকল মানুষের মধ্যে পুষ্টির সুষম বিতরণ হয়। পুষ্টির চাহিদা পূরণের জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অর্থাৎ গ্রামীণ অর্থনীতি সুদৃঢ় করা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার জন্য খাদ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্য ব্যবস্থাপনার সকল ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য ১৯৮১ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিটি দেশের সরকার ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষুধা, অপুষ্টি ও দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করার সংগ্রামে জড়িত করার প্রতিপাদ্য নিয়ে ‘বিশ্ব খাদ্য দিবস’ উদযাপন করা হয়। এই দিবসের মূল লক্ষ্যই হলো ক্ষুধা, অপুষ্টি ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা গ্রহণে উৎসাহিত করা। 

এত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমাদের দেশে কি এর সফল প্রয়োগ হয়েছে? বিষয়টি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। এই সময়ে এসেও আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া ঝড়ের গতিতে ছুটছে। প্রতিদিনের নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামের জন্য সাধারণ মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। নানা কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ছোট ছোট অনেক কলকারখানা। বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। অনেকের অর্থনৈতিক অবস্থা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এর মধ্যে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, ভোজ্যতেল, ছোলা , আদা, রসুন ও ডিমের দাম এখন আগুন ছোঁয়া। পুষ্টির জন্য মানুষের প্রয়োজন পর্যাপ্ত আমিষ জাতীয় খাদ্য অথচ এর মধ্যে বেড়েছে ডিম, মুরগি এবং মাছের দাম। প্রয়োজন এবং প্রাপ্তির মধ্যে বেশ ব্যবধান রয়েছে। সীমিত আয়ের মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে অনেক প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য। এখানেই ব্যর্থ হয়েছে খাদ্য ব্যবস্থাপনা। এই ব্যর্থতা অবশ্যই মেনে নেওয়া যায় না। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করতে হবে। 

আমাদের দেশের অর্থনীতি এখনও অনেকটাই কৃষিনির্ভর। তাই কৃষির উন্নতির দিকে মনোযোগী হতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে নারীর শক্তিকে। কৃষিকাজে নারীর গুরুত্ব তুলে ধরে পুরুষের সঙ্গে সমানভাবে অংশ নিতে হবে। তাতে ফলন হবে পর্যাপ্ত এবং সবার জন্য খাদ্য সংস্থান সহজ হবে, আমাদের দেশ হবে ক্ষুধামুক্ত ও একটি সফল দেশ। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা অনেকটাই কমে আসবে। এইভাবে সারা পৃথিবীকে ক্ষুধামুক্ত করতে বিশ্বের সব দেশকে একে অন্যকে সাহায্য করতে হবে, একসঙ্গে কাজও করতে হবে।

খাদ্য ব্যবস্থাপনার একটি বিশেষ দিক হলো ভূমিষ্ঠ শিশু থেকে শুরু করে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকা সবার ক্ষুধা দূর করা, অপুষ্টির শিকার পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু, অপ্রাপ্ত বয়সি মেয়ে, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারী এবং বয়স্ক ব্যক্তিসহ সব মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা। কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আয় বৃদ্ধি করা, টেকসই কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করাও খাদ্য ব্যবস্থাপনার আরেকটি দিক। 

তবে আশার কথা হলোÑ আমাদের দেশে খাদ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এজন্য খাদ্যশস্য সংগ্রহ, বিলিবণ্টন, অপচয় কমিয়ে আনা, সঠিক পুষ্টি ব্যবস্থার মাধ্যমে সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা করা যায়। এটি সচেতনভাবে করতে হবে এবং সমাজের সবাইকে মিলেমিশেই করতে হবে। তবেই আমরা পাব ক্ষুধামুক্ত ও সুষ্ঠু খাদ্য ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন একটি সুন্দর ও সুখী দেশ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা