মো. ছালামত প্রধান
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:০৭ পিএম
রাজধানী ঢাকা। এখানকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অচলাবস্থা একটি গভীর সমস্যাÑ যা পরিবেশ দূষণ, জনস্বাস্থ্য সংকট এবং নাগরিক জীবনযাত্রার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, প্রযুক্তির ব্যবহার, আইনের প্রয়োগ এবং নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য বলে আমরা মনে করি। ঢাকা শহরের জনসংখ্যা দুই কোটির বেশি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে চার লাখেরও বেশি মানুষ। এ শহরের নাগরিক সুবিধা ও জনঘনত্বের ভারসাম্য রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ঢাকার আবাসযোগ্যতা ও অস্থায়িত্বশীল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সারা দেশের জন্যই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শহরে কম-বেশি এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বস্তিতে বসবাস করে। তাদের স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন ব্যবস্থা খুবই খারাপ। এ কথা সত্য যে, দ্রুত নগরায়ণের কারণে ঢাকা শহরের আয়তন যে হারে বাড়ছে জনসংখ্যা তার চেয়েও অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে বেড়ে চলছে। পরিসংখ্যান মতে, প্রতিদিন গড়ে এ শহরের জনসংখ্যার সঙ্গে কম-বেশি পনেরো হাজার মানুষ নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। এদের মধ্যে নানা পেশার মানুষ রয়েছে। জলবায়ু উদ্বাস্তু ও ছিন্নমূল মানুষ যেমন আসছে, তেমনি কর্মসংস্থানের জন্য শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষও আসছে।
কোনো শহরের জনসংখ্যা ১০ মিলিয়ন ক্রস করলেই সেটা মেগা সিটিতে পরিণত হয়। সে হিসাবে ঢাকা অনেক আগেই মেগা সিটি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নাগরিকদের প্রায় সব সেবা দিতেই হিমশিম খাচ্ছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আছে নানা রকম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত প্রতিটি বস্তু থেকেই কিছু অপ্রয়োজনীয় উচ্ছিষ্ট অংশের উদ্ভব হয়, যা ব্যবহারের অনুপযোগী, মূল্যহীন ও ত্রুটিপূর্ণ। এগুলোকে আমরা বর্জ্য পদার্থ কিংবা ময়লা নামেই আখ্যায়িত করে থাকি। বর্জ্য বিভিন্ন রকমের হতে পারে, যেমন গৃহস্থালি বর্জ্য, বাণিজ্যিক বর্জ্য এবং শিল্প বর্জ্য। বর্জ্য পদার্থ সাধারণত মানবস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
একটা ঘনবসতিপূর্ণ দেশে মানুষ জীবিকার জন্য শহরমুখী হচ্ছে। জীবিকা যেহেতু প্রধান উদ্দেশ্য তাই তারা রাজধানীমুখী হচ্ছে। তাদের নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার মতো অবকাঠামো এত দ্রুত তৈরি করা সম্ভব না। ফলে কাঙ্ক্ষিত অনেক নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ। রয়েছে নাগরিক সচেতনতার অভাবও। যত্রতত্র ময়লা ফেলা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বর্জ্য উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় এর ব্যবস্থাপনাও দিন দিন কঠিন করে তুলছে। আরেকটি বড়ো সমস্যা হলো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা কোনো ধরনের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই বর্জ্য সংগ্রহ ও বাছাইকরণের কাজ করছে। তারা প্রতিদিন উন্মুক্ত পরিবেশে কাজ করে, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ঢাকা মহানগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রধান সমস্যাগুলো হলো দ্রুত বর্জ্য উৎপাদন বৃদ্ধি,পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব, বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাইকরণ, পরিবহণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব সম্পর্কে নাগরিক সচেতনতার অভাব। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সিটি করপোরেশনের প্রশিক্ষিত জনবলের সংকট সব সময়ই রয়েছে। বর্জ্য থেকে সম্পদ আহরণের জন্য পুনর্ব্যবহার এবং রিসাইক্লিং কার্যক্রম এখনও সীমিত। বর্জ্য ফেলার স্থান এবং ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ ছাড়াও চাঁদাবাজদের কারণেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে সমস্যা হচ্ছে। ঢাকা শহরের বিপুল পরিমাণ মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করাও একটি বড় সমস্যা।
বর্জ্যকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে এর ব্যবস্থাপনা করতে হবে। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আপাতদৃষ্টিতে অনেক ব্যয়বহুল মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের জন্য লাভজনক। সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হলে প্রথমত, মানুষের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। পরিবেশ দূষণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যাবে। এ শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে এবং আরও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। পাশাপাশি জনসাধারণের জীবনমানও উন্নত হবে। এজন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা এবং জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ।