সেবা খাত
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:১৯ এএম
দেশের অর্থনীতির নির্ভরতার একটা বড় অংশ হচ্ছে সেবা খাত। ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস কিংবা সরকারি-বেসরকারি অফিস প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেবা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ‘সেবা’ নিতে গিয়ে মানুষকে প্রায়শই নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। ঘুষ, দালালি, অহেতুক বিলম্ব, ভোগান্তি, অমানবিক আচরণ কিংবা জটিলতা সৃষ্টিÑ এসব যেন সেবাগ্রহীতার চিরচেনা অভিজ্ঞতা। নামে ‘সেবা’ হলেও আমাদের দেশে সার্ভিস সেক্টর মূলত: হয়রানি ও দুর্নীতির খাত হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছেÑ সেবা নিতে গিয়ে যদি হয়রানি বা ভোগান্তিই পোহাতে হয়, তাহলে কি সেটা আর ‘সেবা’ হিসেবে গণ্য করা যায়? সবচেয়ে বেশি অভিযোগ আসে সরকারি অফিসগুলো থেকে। বিশেষ করে একটি সনদপত্র বা লাইসেন্স সংগ্রহ করতে গিয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ঘুরতে হয়। অনেকে বাধ্য হয়ে দালালের দ্বারস্থ হন। সেখানেও রয়েছে আর্থিক ভোগান্তির বিষয়।
সেবা খাতে যে মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হয়, এই চরম সত্যটি স্বীকার করেছেন খোদ অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদও। ১৪ সেপ্টেম্বর, রবিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাল্টিপারপাস হলে ট্যাক্স রিপ্রেজেন্টেটিভ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (টিআরএমএস) সফটওয়্যারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেছেন, ‘সেবা খাতে গ্রহীতাদের অনেক হয়রানি করা হয়। অযথা তাদের ঘোরানো হয়। এসব থেকে জনগণ যাতে নিস্তার পায়, সেজন্য আমরা কিছু করে যেতে চাই। পরে যে সরকার আসবে, সব বুঝতে তাদের সময় লাগবে। রয়েছে সদিচ্ছারও ব্যাপার। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে যদি কিছুটা আশার আলো দেখাতে পারি, তা দেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
১৫ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘সেবা খাতে প্রচুর হয়রানি হতে হচ্ছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে টিআরএমএস মাধ্যমে অনলাইন ক্ষমতা অর্পণ এবং প্রত্যেক রিটার্নের স্বচ্ছতা সংরক্ষণের মাধ্যমে করদাতা এবং কর প্রতিনিধি উভয়ের জন্য সহজ ইন্টারফেস নিশ্চিতকরণের প্রসঙ্গ উঠে আসে। এ কথা সত্য যে, সেবা খাতে যে হয়রানি হচ্ছে, তা কমাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষ সঠিক সময়ে সেবা পাবে এবং দেশের কর ব্যবস্থাপনায় আস্থা বাড়বে। আসলে সেবার ক্ষেত্রে হয়রানি ও দুর্নীতির প্রভাব বহুমাত্রিক। প্রথমত, নাগরিকরা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, ঘুষ ও দালালি ব্যবস্থা চালু থাকায় সেবার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, সময়ের অপচয় উৎপাদনশীলতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা লাইসেন্স বা অনুমোদনের ঝামেলায় আটকে গিয়ে অনেক সময় ব্যবসায় নিরুৎসাহিত হন। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ অবস্থার পেছনে প্রধান কারণ হলো জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব।
রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো নাগরিকের মৌলিক সেবা দেওয়া। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, ভূমি, আইনশৃঙ্খলা কিংবা প্রশাসনিক কাজÑ এসবই সরকারি সেবা খাতের আওতায় পড়ে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন; সরকারি সেবা নিতে গিয়ে প্রায়ই মানুষ হয়রানির শিকার হন। এতে নাগরিকদের মনে এক ধরনের বিরক্তি, হতাশা ও অবিশ্বাস জন্ম নিচ্ছে। ভূমি অফিসে কোনো খাজনা দিতে গেলে কিংবা নামজারি করাতে হলে সাধারণ মানুষকে কত ধাপ পার হতে হয়, তা সবার জানা। দালালের হাতে পড়লে কাজ দ্রুত হয়, না হলে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। একই চিত্র দেখা যায় পাসপোর্ট অফিস, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ বিভাগ কিংবা ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স শাখায়। সমহারে বেসরকারি ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোরও। সেবার নামে এই হয়রানি কেবল নাগরিক দুর্ভোগই নয়, এটি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি; যা দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অধিকাংশ দপ্তরে সেবাগ্রহীতার অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেই। দায়িত্বপ্রাপ্তদের কেউ কেউ মনে করেন, তাদের কাজের জন্য কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। এর ফলে হয়রানি ও দুর্নীতি দিন দিন আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে। যদিও সরকার অনলাইনে নানা সেবা চালু করেছে, তবে সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ ও যথাযথ মনিটরিং এখনও যে হয়নি, তা বলা বাহুল্য। এই পরিস্থিতিতে বারবার মানুষকে অফিসে ঘুরতে হয় এবং হয়রানির শিকার হতে হয়। আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রতিটি দপ্তরে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করতে হবে, যাতে মানুষকে একই সেবার জন্য একাধিক অফিসে দৌড়াতে না হয়। সকল সেবা কার্যক্রমকে ডিজিটাল প্লাটফর্মে নিয়ে আসতে হবে, যাতে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমে যায়। অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধানের জন্য আলাদা মনিটরিং সেল তৈরি করতে হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ সহজে অভিযোগ জানাতে পারবেন। হয়রানি বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি সেবামূলক আচরণে কর্মচারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়াও প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।
সেবা পাওয়া নাগরিকের মৌলিক অধিকার- এটা কোনো দয়া নয়। মনে রাখা দরকার সেবা প্রদানকারীরা জনগণের ট্যাক্সের অর্থে বেতন পান। তাই তাদের দায়িত্ব জনগণকে সম্মান ও সহানুভূতির সঙ্গে সেবা দেওয়া। নাগরিক যদি সেবা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হন, তাহলে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি তার আস্থা নষ্ট হয়। আমরা মনে করি, সেবা খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলেই খাতটি দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত করা সম্ভব হবে।