× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিনিয়োগ সংকট

বন্ধ হচ্ছে কারখানা, কর্মহীন হচ্ছে মানুষ

মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:১১ এএম

বন্ধ হচ্ছে কারখানা, কর্মহীন হচ্ছে মানুষ

দেশে বহু ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানা টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে। এই লড়াইয়ে কেউ হারছেন, কেউবা হারতে হারতে টিকে আছেন। এ অবস্থা যদি চলতে থাকে, তবে জাতীয় অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়বে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। ক্ষুদ্রশিল্পকে বাঁচানো মানে বহু কর্মসংস্থানের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা এবং শিল্পায়নের স্বপ্নপূরণের পথ প্রশস্ত করা। এ ক্ষেত্রে সরকার, ব্যাংক ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগই পারে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিতে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না দেশের উন্নয়নশীল অর্থনীতি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিনিয়োগের স্রোত না ফিরলে শিল্প ও কর্মসংস্থান দুই-ই হুমকির মুখে পড়বে। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। অথচ দেশের অর্থনীতি গত কয়েক দশকে এক উজ্জ্বল পথচলা দেখিয়েছে। তৈরি পোশাক, কৃষি ও ক্ষুদ্রশিল্পের বিকাশ আমাদের প্রবৃদ্ধিকে গতিশীল করে চলছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা এক ভিন্ন চিত্র সামনে এনেছেÑ নতুন বিনিয়োগ কার্যত থেমে গেছে, ছোট-বড় বহু কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আর এর অভিঘাত পড়ছে সরাসরি শ্রমজীবী মানুষের ওপর।

অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করার অন্যতম ভিত্তি হলো দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানা। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে নগরাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট শিল্প-উদ্যোগ। এ শিল্পগুলোতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের বিপুল সুযোগ তৈরি হয়, অন্যদিকে জাতীয় উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ নানা প্রতিকূল অবস্থার কারণে এ ধরনের শিল্প একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে শুধু উদ্যোক্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ছোট ব্যবসায়ী ও বড় ব্যবসায়ী উভয়েরই অবদান রয়েছে। তবে ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে সুদের হারে যে বৈষম্য বিদ্যমান, তা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত একটি সমস্যা। বড় ব্যবসায়ীরা সহজেই স্বল্পসুদে বিপুল অঙ্কের ঋণসুবিধা পান, অন্যদিকে ছোট ব্যবসায়ীরা সীমিত অঙ্কের ঋণ নিতে গেলেও উচ্চসুদ এবং নানা শর্তের মুখোমুখি হন। এর ফলে অর্থনীতির ভেতরে অসম ভারসাম্য তৈরি হয়। এই ক্ষেত্রে বড় ব্যবসায়ীরা তাদের আর্থিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং জামানতের শক্তির কারণে সহজেই ব্যাংকের আস্থা অর্জন করতে পারেন। তাদের জন্য ঋণের সুদের হার তুলনামূলকভাবে কম রাখা হয়, অনেক সময় আবার বিশেষ ছাড়ও দেওয়া হয়। এমনকি খেলাপি ঋণ হলেও পুনঃতফসিল বা ঋণমুক্তির সুবিধা পেয়ে থাকেন। ফলে বড় ব্যবসায়ী মহল ব্যাংকঋণ ব্যবস্থায় একটি শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে।

অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা, যাদের বেশিরভাগ এসএমই বা খুচরা ব্যবসায়ীÑ ঋণ পেতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। ব্যাংকগুলো তাদের কাছ থেকে বেশি সুদ নেয়, কঠিন জামানত চায় এবং কাগজপত্রে জটিলতা তৈরি করে। বাস্তবে দেখা যায়, বড় ব্যবসায়ীরা ৭-৯ শতাংশ সুদে ঋণ পেলেও ছোট ব্যবসায়ীদের অনেক সময় ১২-১৪ শতাংশ সুদ দিতে হয়। এতে তাদের ব্যবসার খরচ বেড়ে যায় এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। এই বৈষম্যের প্রভাব অর্থনীতিতে স্পষ্ট। ছোট ব্যবসায়ীরা স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান তৈরি করে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। কিন্তু উচ্চসুদের কারণে তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে না। অনেক সময় ঋণের চাপ সামলাতে না পেরে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হয়। দেখা যায়, বড় ব্যবসায়ীরা সুবিধাজনক ঋণ নিয়ে আরও বড় হয়। ফলে বাজারে এক ধরনের একচেটিয়া ক্ষমতা তৈরি হয়।

সহজ করে বললে, বড় বড় শিল্পমালিকরা সহজেই ব্যাংকঋণ পান, এমনকি তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়। কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যাংকের কঠিন শর্ত পূরণ করতে পারেন না। অনেকে আবার উচ্চসুদের চক্রে পড়ে মূলধন হারিয়ে ফেলেন। সরকার যদিও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, কিন্তু বাস্তবে সেই সহায়তা খুব সীমিতসংখ্যক উদ্যোক্তার কাছেই পৌঁছেছে। ফলে অধিকাংশ ছোট শিল্পকারখানা আর্থিক সংকটে পড়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। 

দৃশ্যমান এসব বৈষম্যের কারণে আর্থিক খাতে আস্থার সংকট দেখা দেয়। আমাদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মনে এই ধারণা জন্ম নিয়েছে যে, ব্যাংকব্যবস্থা কেবল ধনীদের জন্য কাজ করে, গরিব বা মধ্যবিত্ত উদ্যোক্তাদের জন্য নয়। এর ফলে অনেকেই বিকল্প পথ যেমন এনজিও ঋণ বা অনানুষ্ঠানিক ধারদেনার দিকে ঝোঁকেন, যেখানে সুদের হার আরও বেশি। এ সমস্যার সমাধানে কিছু উদ্যোগ জরুরি। 

আরেকটা বিষয় অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো বিনিয়োগ। নতুন শিল্প, নতুন উদ্যোগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি নির্ভর করে বিনিয়োগ প্রবাহের ওপর। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ তেমন আসছে নাÑ এটি নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। দীর্ঘমেয়াদে এই স্থবিরতা দেশের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না, দেশের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তিও বিনিয়োগ। বিনিয়োগ না হলে নতুন শিল্প গড়ে উঠবে না, কর্মসংস্থান তৈরি হবে না এবং অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে না। বিনিয়োগ স্থবিরতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। 

এসব সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো কর্মসংস্থানের সংকোচন। ছোট শিল্পগুলোতে কাজ করা শ্রমিকদের সংখ্যা বিশাল। বিশেষ করে, আধা-শিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষরা এসব কারখানার ওপর নির্ভর করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন। যখন একটি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, তখন ওই শ্রমিকদের অনেকেই নতুন কাজ পান না। পরিবার চালাতে গিয়ে তারা ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েন, কেউ কেউ আবার বাধ্য হয়ে গ্রামে ফিরে যান। এর ফলে শহরের ওপর চাপ কমলেও গ্রামে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য আরও বেড়ে যায়। এ ছাড়া সামাজিক অস্থিরতাও তৈরি হয়। চাকরি হারানো তরুণেরা হতাশায় ভোগেন, কেউ কেউ অপরাধপ্রবণতার দিকেও ঝোঁকেন। অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা সংকটও প্রকট হয়ে ওঠে। অর্থাৎ ছোট শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক সংকটও বটে।

ঋণের সুদের হার কমিয়ে উদ্যোক্তাদের স্বস্তি দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহকে স্থিতিশীল করতে হবে। ছোট শিল্পাঞ্চলগুলোতে আলাদা ব্যবস্থা করে হলেও তাদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট ছাড় দিয়ে ক্ষুদ্রশিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকিয়ে রাখতে হবে। চতুর্থত, বিপণন সুবিধা বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ক্ষুদ্র শিল্প মেলা ও ই-কমার্স সুবিধা বাড়ানো উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নীতিনির্ধারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া। বড় শিল্পপতিদের স্বার্থে নীতি প্রণয়ন করলে ক্ষুদ্রশিল্প বাঁচবে না। অথচ ক্ষুদ্রশিল্পই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মনে রাখা দরকার, শিল্প স্থবির হলে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে কর্মসংস্থানের ওপর। প্রতিদিন শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। শহরের বস্তি থেকে গ্রামীণ পরিবারÑ সবখানেই এর প্রভাব পড়ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্যÑ সব ক্ষেত্রেই দারিদ্র্যের চক্র আরও বিস্তৃত হচ্ছে। একটি কলকারখানা বন্ধ মানে শুধু একটি ব্যবসার ক্ষতি নয়, বরং শত শত পরিবারের জীবনে অন্ধকার নেমে আসা।

আমরা বলতে চাই, এসএমই খাতে সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করতে হবে। জামানতবিহীন ঋণ, নারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা এবং ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় দ্রুত অনুমোদন ছোট উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে পারে। সুদের হার নির্ধারণে ন্যায়সংগত কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে বড় ও ছোট ব্যবসায়ীর মধ্যে এত বৈষম্য না থাকে। রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় ছোট ব্যবসায়ীদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া দরকার, কারণ তারা কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আসলে ব্যাংকঋণের সুদের হারে বৈষম্য শুধু ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষতিই করছে না, বরং সামগ্রিক অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ ঋণনীতি তৈরি হলে ছোট ব্যবসায়ীরা বিকশিত হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনীতি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। তাই সময় এসেছেÑ সুদের হারের বৈষম্য দূর করে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্যও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার।

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে ঋণ খাতের বৈষম্য দূর ও বিনিয়োগের গতি ফেরানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এখন যদি যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে কর্মসংস্থান সংকট, শিল্পখাতের দুর্বলতা এবং অর্থনীতির স্থবিরতা ক্রমেই তীব্র হবে। তাই সরকার ও নীতিনির্ধারকদের দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা আবার আস্থা ফিরে পান এবং নতুন বিনিয়োগ প্রবাহ শুরু হয়।

  • কলাম লেখক ও ক্ষুদ্র শিল্পদ্যোক্তা
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা