× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নৌকাবাইচ

আনন্দ-উৎসবগুলো রক্ষা করতে হবে

হোসেন আবদুল মান্নান

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:০৫ পিএম

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৭:০৬ পিএম

আনন্দ-উৎসবগুলো রক্ষা করতে হবে

গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের জীবনের আনন্দ-উৎসবের বৈচিত্র্য দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। আবহমান কাল থেকে বাংলার গ্রামে-গঞ্জে নানাবিধ মৌসুমি খেলাধুলা, যাত্রাপালা, নাটক, ঘাটুগান, নৌকাবাইচ, ঘোড়দৌড় ইত্যাদি অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। সমাজের পরিবর্তিত অবস্থায় এসব ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পথে। আর এ আয়োজনের স্থলে আজকের বাস্তবতায় জায়গা দখল করে নিয়েছে চায়ের দোকানের আড্ডা, মাদকের নেশা, স্মার্টফোনের দৌরাত্ম্য, টিকটক, কনটেন্ট তৈরির নানা অপপ্রয়াস ইত্যাদি। তা ছাড়া সুস্থ, সুন্দর, ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক বিনোদন ধরে রাখার মতন তেমন কোনো মহৎ উদ্যোগও দেশে নেই বললেই চলে। 

১. মনে পড়ে, ভাটিবাংলার মানুষ হিসেবে শৈশব-কৈশোরকাল অবধি নিজের বাড়িতেই দেখেছি নৌকাবাইচের নানা সরঞ্জাম। ঘরের ভেতরেই দেখেছি, ছোট বড় রঙিন বৈঠা, বাইচের নৌকায় গাওয়া গানের সঙ্গে ঢাক, কর্তালের জোড়া ইত্যাদি। সেকালে চলন্ত নৌকার সারি গানের কদর ছিল অন্য সবকিছুর ওপরে। তখনকার দিনে হয়তো শাহ আবদুল করিমের বিখ্যাতÑ‘কোন মিস্তরি নাউ বানাইছে কেমন দেখা যায়,/ ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খি নায়’Ñএইসব জনপ্রিয় গান ছিল না। কিন্তু যা ছিল তার বাণী, সুর, তাল-লয়ে তথা ছন্দের বিচারে ছিল অতি আকর্ষণীয় ও হৃদয়কাড়া। সেসব গানের মেলোডি গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফিরত। 

বলাবাহুল্য, দেশবরেণ্য বাউল কবি শাহ আবদুল করিমের গানের বাণীতেও নৌকার এক নস্টালজিক রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়। যা তিনি সুনামগঞ্জের হাওরে দেখেছেন তার দুরন্ত শৈশব-কৈশোরে। 

২. নিজে শুনেছি, দাদার পরে বাবা পর্যন্ত বাইচের নৌকার শৌখিন সমঝদার ছিলেন। তখন বর্ষার ভাসা জলের আগমনে গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায় মানুষের মনেও জোয়ার নেমে আসত। তখন সাজ সাজ রব তুলে নৌকাবাইচের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। কে কার নৌকায় উঠবে, কার সঙ্গে কার নৌকার দৌড় হবেÑ এসব নিয়েও চলত এলাকাভিত্তিক দীর্ঘ বৈঠক আর শান্তিপূর্ণ আলোচনা। আবার পাড়ার ঐক্য বা জোটের মধ্যকার ইগোর কারণে বা জেদাজেদি করেও রাতারাতি নৌকা বানিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে যেত। জমি-ঘর বিক্রি করে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নৌকা বানানো হতো। সে-ও ছিল একপ্রকার মুখরোচক আনন্দেরই বিষয়। এখন এগুলোর অস্তিত্ব নেই। হাওর-বাঁওড়ে বর্ষা নেই, বন্যার মতো থইথই করা পানি নেই, ঘাটে বাঁধা নৌকা নেই। মানুষের মনোজগতে আসা আমূল পরিবর্তনের হাওয়ায় সব মিলিয়ে হাওর-বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য নৌকাবাইচ হারিয়ে যাচ্ছে। 

৩. আজকের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে দেশের মাত্র কয়েকটি স্থানে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আনন্দঘন উৎসব দেখে দুরন্ত কৈশোরের ছোঁয়া পাই। আবেগ আপ্লূত হয়ে যাই। আহা! আলো ঝলমলে সাতরঙা দৌড়ের নৌকা আর বিচিত্র বাহারি গেঞ্জি, টি-শার্ট পরিহিত সমবয়সি যুবকের হাতের বৈঠার ছন্দমিল যেকোনো বয়সের বাঙালির চিত্তকে দোলা দিয়ে যায়। হৃদয়ের শাখা ধরে নাড়া দিয়ে যায়। এখন এসব উৎসব টিকে আছে কেবল নদীকেন্দ্রিক কতিপয় এলাকাসমূহে। বিশেষ করে পাবনা, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর ইত্যাদি জেলায় দেখা যায়। কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে এর আয়োজন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। নৌকাগুলোরও আকার, আকৃতি, গঠনের ধরন পাল্টে গেছে। অথচ চিরায়ত বর্ষার রূপমাধুর্যের সেরা অনুষঙ্গ নৌকা ময়মনসিংহ গীতিকার নানা শ্লোক, উপাখ্যানেও গীত হয়ে আছে। এগুলো বিলীয়মান হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, দেশে দীর্ঘস্থায়ী বর্ষা না পাওয়া, রাস্তাঘাটের বাধা, নদনদী, বড় বড় জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়াÑ এমনকি স্থানীয় প্রভাবশালীদের পক্ষ থেকে উদ্যোগের অভাব। অথচ পূর্ব বাংলায় নৌকাবাইচের সূত্রপাত হয় বড় রাস্তা, ব্রিজ বা কালভার্টবিহীন বিস্তীর্ণ হাওরের নয়া পানিতে। 

৪. কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় নৌকাবাইচের প্রচলনের কথা কয়েক শতাব্দীর পুরনো। এমনকি স্বাধীনতা-উত্তরকালেও এর ব্যাপকতা চোখে পড়েছে। শৈশবের গ্রামীণ স্মৃতিতে পাড়া-মহল্লার নৌকার দৌড় আর কাবাডি খেলার চেয়ে বড় কোনো আনন্দ আয়োজনের কথা মনে পড়ে না। বিশেষ করে, নিকলী উপজেলার সংলগ্ন হাওর ও নদীর ত্রিমোহনার আয়োজন ছিল সর্ববৃহৎÑ বাঁধভাঙা এবং উৎসবমুখর। প্রতিবছর ভাদ্র মাসের একটা নির্দিষ্ট দিনে এ নৌকাবাইচের উৎসব হতো। এতে পার্শ্ববর্তী কটিয়াদি, বাজিতপুর, করিমগঞ্জ ও তাড়াইল উপজেলার শতাধিক রঙিন নৌকা এসে হাজির হতো। দৌড়ের নৌকাগুলোর আগায় বাঁধা থাকত ছোট্ট কাপের মতো তেলের জ্বলন্ত শিখা। সঙ্গে বসানো হতো কমবয়সি একটা ছেলেকে। তার হাতেও একটা বৈঠা থাকত। সেদিন সকাল থেকেÑ এমনকি আগের দিনেই সুবিধাজনক স্থানের দখল নিয়ে সাজানো নৌকাসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বসে যেত। হাজার হাজার নৌকা ও তীরবর্তী মানুষের উপচে পড়া আনন্দ-উল্লাসের যেন শেষ নেই। সবারই আশা সবচেয়ে নিকট থেকে নৌকা দৌড়ের শেষ প্রান্তের নিশান-বাঁধা দড়িটা স্পর্শ করার মাহেন্দ্রক্ষণের দৃশ্যটি দেখতে পাওয়া। শেষটা দেখাই ছিল সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। যা আজকের প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগে এসবও গুরুত্বহীন হয়ে গেছে। ভিডিও ফুটেজে সব দেখা যাচ্ছে। এখন কাউকে কোথাও আগে যেতে হয় না, সবাই সমানে সমান সুযোগ পাচ্ছে।

৫. নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা একটা নিরেট আনন্দদায়ক খেলা। এর সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক ছিল না, সম্পর্ক ছিল আনন্দ প্রতিযোগিতার। তুলনামূলক হিসেবে বিবেচনা করলে এই আয়োজন খুব বিপুলভাবে ব্যয়বহুলও নয়। এর মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদের মানুষের চিত্তবিনোদনের যেমন অনিঃশেষ খোরাক পাওয়া যায় তা অন্য কোনো আয়োজনে সেভাবে হয় না। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বন্ধন আছে। কাজেই নৌকাবাইচের জন্য সরকারি উদ্যোগ ও আর্থিক সহযোগিতা জরুরি। এটা সময়ের দাবি। যার মাধ্যমে বাঙালির শত শত বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব এবং একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে অকৃত্রিম আনন্দদায়ী উদযোগ-উদযাপনের ব্যবস্থা করাও সম্ভব। গ্রামসর্বস্ব এই দেশ। এর রয়েছে সহস্রাব্দের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। আসলে গ্রামই এই জনপদের হৃদপিণ্ড। আজও প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামেই বসবাস করে চলেছে। তাদের জন্য বাৎসরিক ও মৌসুমি আনন্দ-উৎসবগুলোকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। দলমত, জাতিভেদ বা রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে তা সংরক্ষণ এবং অনুশীলন করার কোনো বিকল্প নেই। গ্রামের বিনোদনকে আইনশৃঙ্খলার অজুহাত দিয়ে আর প্রতিহত নয় বরং মানুষকে আনন্দ দিয়েই আইনশৃঙ্খলাকে সমুন্নত রাখা দরকার এবং তা-ই করতে হবে। 

গল্পকার ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা