× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার

প্রত্যাশা পূরণে কতটুকু এগোল দেশ

মো. ইলিয়াস হোসেন

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৫৩ এএম

প্রত্যাশা পূরণে কতটুকু এগোল দেশ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে জন্ম নেওয়া বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিলÑ রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন এবং প্রশাসনে নিরপেক্ষতা ও পেশাদারত্ব ফিরিয়ে আনা। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময়ে সরকার এই প্রতিশ্রুতির কতটুকু পূরণ করতে পেরেছে সেটাই এখন  আলোচনায় উঠে আসছে। শুরুতেই সরকার কী করলেন? বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পটভূমি থেকে আসা কয়েকজন ছাত্রনেতাকে সরাসরি সরকার ও মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদে বসালেন। প্রাথমিকভাবে এটি সংস্কারপন্থী সাহসী পদক্ষেপ মনে হলেও, দ্রুত তা প্রশাসনিক পেশাদারত্বের হস্তক্ষেপে রূপ নিল। ছাত্রছাত্রীদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত পাঠানোর বদলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে অবাধে প্রবেশাধিকার দেওয়া হলো। সরকারি ফাইল প্রক্রিয়া, প্রকল্প অনুমোদন এবং কর্মকর্তাদের কাজে সরাসরি চাপ প্রয়োগ ইত্যাদি ঘটনায় সরকারি কাঠামোর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হলো। আবার এই সময়কালের মধ্যেই  ছাত্রদের উদ্যোগে এনসিপি (ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হলো। সরকারের কাছাকাছি অবস্থান ও প্রশাসনিক অ্যাক্সেসকে কাজে লাগিয়ে দলটির সাংগঠনিক সম্প্রসারণ ঘটানোর চেষ্টা চলতে থাকল। অভিযোগ উঠেছে তাদেরকে রাজনৈতিক কার্যক্রমে বাড়তি স্বাধীনতা দেওয়া, মাঠে ও গণমাধ্যমে রাজনৈতিক প্রচারণাসহ জেলা-উপজেলায় সভা-সমাবেশ আয়োজনের অনুমতি প্রদান, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা, দলীয় কার্যালয় স্থাপন ও সম্প্রসারণে কোনো প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি না করা, রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি গণমাধ্যমে দলীয় বক্তব্য প্রচারে বেশি সময় বা কাভারেজ প্রদান করা, সরকারপন্থী নীতি আলোচনায় এনসিপির প্রতিনিধিদের অগ্রাধিকার দেওয়া, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও উদ্বোধনী মঞ্চে নেতাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক সমাবেশে নিরাপত্তা ও প্রটোকল সহায়তা দেওয়ার মতো পক্ষপাতের। সমালোচকদের মতে, এটি একটি ‘অরাজনৈতিক সরকার’-এর নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতির সরাসরি লঙ্ঘন, যা ভবিষ্যতের নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। 

প্রফেসর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের আশার সঞ্চার হয়েছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা ও আস্থাহীনতার প্রেক্ষাপটে এই সরকারের প্রতি প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। ধারণা করা হয়েছিল, তারা সৎ উদ্দেশ্যে এগিয়ে এসে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করবে। কিন্তু এক বছরের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, এ সরকার অনেক ক্ষেত্রেই কৌশলগত ভুল করেছে, অগ্রাধিকার ঠিক করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারেনি। ফলে জনগণ তাদের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। সরকারের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো সংস্কার কার্যক্রমে সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে না পারা। একসঙ্গে অনেক কিছু করার চেষ্টা করা যেমনÑ নির্বাচনী আইন সংস্কার, রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন, দুর্নীতি দমন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এই সবকিছু একসঙ্গে ধরতে গিয়ে কোনো ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জনে ব্যর্থ হওয়া। জনগণ শুরুতে আশায় বুক বাঁধলেও ক্রমে বুঝতে পেরেছে যে- সরকারের কার্যক্রমগুলো অর্ধসমাপ্ত রয়ে যাচ্ছে। 

অথচ জনগণের মূল দাবি ছিল ‘রাষ্ট্র সংস্কার’, যার ব্যাপকতা অনেক বেশি। তবে সরকারের জন্য প্রধান এবং প্রাথমিক সংস্কারের জায়গা হওয়া উচিত ছিল নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার করা। নির্বাচন কমিশনকে আরও ক্ষমতাশালী ও স্বচ্ছ করা, রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে কঠোর করা এবং প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের নিয়ম জোরদার করা, সরকার চাইলেই গত ১ বছর সময়ের মধ্যে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেত, কিন্তু এ বিষয়গুলো কেবল আলোচনার বৃত্তে ঘুরপাক খেয়েছে, বাস্তবায়নের দিক থেকে দৃশ্যমান কিছুই হয়নি। ফলে জনগণের চোখে সরকারের প্রতিশ্রুতি ধীরে ধীরে কার্যত আস্থাহীনতায় রূপ নিয়েছে। 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবাধ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর পরও নির্বাচনকালীন পরিবেশ কতটা নিরপেক্ষ হবে, তা এখনও অস্পষ্ট। সরকার বারবার বিভিন্ন সংস্কারের কথা বলেছে, কিন্তু সেই সংস্কারের দৃশ্যমান প্রভাব কোথাও দেখা যায়নি। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ করার ঘোষণা এসেছে বারবার, কিন্তু মাঠপর্যায়ে জনগণ কোনো পরিবর্তন অনুভব করেনি। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করছে সরকার আসলে সময়ক্ষেপণ করছে। এই বিলম্ব শুধু জনগণের আস্থা নষ্ট করেনি, বরং আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যেও হতাশা সৃষ্টি করেছে। বিদেশি কূটনীতিকরা শুরুতে সরকারের প্রতি সমর্থন দেখালেও ধীরে ধীরে তারা সমালোচনায় মুখর হচ্ছে। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দীর্ঘসূত্রতা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও অগ্রহণযোগ্য।

সরকার যখন জনগণকে দুর্নীতি দমনের অঙ্গীকার শোনাচ্ছিল, তখনই কিছু উপদেষ্টা ও তাদের ঘনিষ্ঠ মহলের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও উঠে আসে। পদমর্যাদা ব্যবহার করে ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা, প্রশাসনের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ, এমনকি অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণের ঘটনাগুলো সরকারের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জনগণ আশা করেছিলÑ এই সরকার হবে একটি নৈতিক শক্তি, কিন্তু দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ সরকারের নৈতিক অবস্থানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রমও সমালোচিত হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এটি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। যে কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেটিই পরিণত হয়েছে নির্বাচিতভাবে অভিযানে, যা সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও দুর্বল করেছে।

এ ছাড়াও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় প্রভাবশালী কর্মকর্তারা বহাল আছেন, যারা পূর্ববর্তী রাজনৈতিক শাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। মাঠ প্রশাসনকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে পরিবর্তন করতে না পারায় সরকারের নিরপেক্ষতার দাবিও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। নির্বাচনের আগে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ না করলে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ অসম্ভব হয়ে পড়বে। অথচ এই মৌলিক প্রশ্নের সমাধানে সরকার দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটাতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বিনিয়োগের পরিবেশ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণি চাপে পড়েছে। এর ফলে সরকারের প্রতি জনগণের ক্ষোভ আরও বেড়েছে। সব মিলিয়ে এক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। প্রধান কারণগুলো হলো :

সংস্কার কার্যক্রমে অগ্রাধিকার নির্ধারণে ব্যর্থতা।

অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ ও দৃশ্যমান ফলাফলের অভাব।

উপদেষ্টাদের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার।

প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে অক্ষমতা।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা।

এসব কারণেই জনগণ আজ আশাহত। আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশ্ন উঠেছে এই সরকারের সক্ষমতা নিয়ে। তারা উদ্বিগ্ন, এই সরকার আদৌ একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে কি না?

গত এক বছরেরও বেশি সময়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি জনগণের শুরুতে যে আস্থা ছিল, তা এখন অনেকটা আস্থাহীনতায় রূপ নিয়েছে। সরকারের গত বিগত কর্মকাণ্ড এক ধরনের রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে রূপ নিয়েছে, যেখানে সংস্কারের প্রতিশ্রুতির চেয়ে ছাত্র-রাজনীতির প্রভাব ও নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান বেশি দৃশ্যমান। শুরুতে সরকারের উদ্দেশ্য সৎ থাকলেও কৌশলগত দুর্বলতা, সময়ক্ষেপণ এবং উপদেষ্টাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড মিলেই আজ এ সরকারকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ধীরগতি, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অবনতি, সব মিলিয়ে সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্যপূরণ এখনও অনিশ্চিত। গত ১৭ বছরের অপূর্ণতা পূরণে দেশের মানুষ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। যদি এই সরকার সেই নির্বাচন আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তারা ইতিহাসে একটি ব্যর্থ পরীক্ষামূলক অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। অতএব, সরকারের জন্য শেষ সুযোগ এখনও রয়ে গেছে তা হলো, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা আনা, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা এবং জনগণকে দৃশ্যমান সংস্কার দেখানো। অন্যথায় নির্বাচনের আগে তারা জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারবে না, আর এদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাও আবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবে।

  • অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও কলাম লেখক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা