নীলকণ্ঠ আইচ মজুমদার
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৪৯ এএম
কৃষি শব্দটি আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কৃষিনির্ভর দেশ হলেও কৃষকরা যথোপযুক্ত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্মান থেকে বঞ্চিত। এদেশের অর্থনৈতিক যে অর্জন তার বেশিরভাগেই জড়িত কৃষির সঙ্গে। এখন পর্যন্ত এদেশের বেশিরভাগ মানুষ কৃষির ওপর ভিত্তি করে তাদের জীবনজীবিকা নির্বাহ করে আসছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বেশিরভাগই মানুষই কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে সে তুলনায় বদলায়নি কৃষকের ভাগ্যের চাকা যার প্রধান কারণ হলোÑ কৃষি বিপণন ব্যবস্থা। কোনো সরকারই এদিকে ভালো করে নজর দেয় নাই। আমরা আজ যে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছি, তার প্রধান হাতিয়ার কিন্তু কৃষি। প্রাচীন পেশা হওয়ার পরও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন কারণে এ পেশায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে সাধারণ মানুষ। এর কারণ খুঁজতে হলে খুব গভীরভাবে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। সত্যিকার অর্থে কৃষিকে এখনও আমরা সঠিকভাবে পেশা হিসেবে মূল্য দিতে পারিনি।
আমরা এখনও কৃষিতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারিনি। কৃষক তার জমিতে যে পরিমাণ ব্যয় করে উৎপাদন করছে সে পরিমাণ দাম তারা পাচ্ছেন না। আবার সাধারণ জনগণকে চড়া মূল্য দিয়েই কিনতে হচ্ছে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির যে স্বপ্নÑ তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যার কারণে বাজারে কৃষিপণ্যের মূল্য একেবারেই অস্থিতিশীল। বাজারে কী কারণে কৃষিপণ্যের দাম উঠানামা করছে তা আদৌ যুক্তিপূর্ণ কি নাÑ তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে না। কৃষক যখন পণ্য উৎপাদন করে তার সঙ্গে সঙ্গেই পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হয় দুটি কারণে। একটি হলো উৎপাদিত অনেক দ্রব্য পঁচনশীল হওয়া, অন্যটি উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত শ্রমিকের ব্যয় মিটানো এবং ঋণ শোধ করা। কৃষকের অনেক পণ্য বিশেষ করে উৎপাদিত সবজি সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি করতে হচ্ছে। এ ছাড়া কিছু পণ্য সংরক্ষণ করতে না পারার কারণে কৃষক পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এক্ষেত্রেও কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আমাদের বাজার ব্যবস্থায় সরকারের যথোপযুক্ত নজরদারির অভাব সুস্পষ্ট। কৃষিতে উৎপাদিত পণ্যকে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজারজাতকরণের ব্যবস্থাকে একটি কাঠামোতে আনা জরুরি। কৃষি উৎপাদিত পণ্য সঠিকভাবে বাজারে প্রেরণের ক্ষেত্রে কৃষকদের পরিবহনের ও যোগাযোগ ব্যবস্থাতে সার্বিক সহায়তা প্রদান করতে হবে সরকারকে। কৃষিপণ্যগুলো গ্রামেই উৎপাদন হয়ে থাকে, যার কারণে পণ্য ভোক্তার কাছে সহজভাবে পৌঁছানো অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছে না। সবচেয়ে বড় কথা এদেশের কৃষক সমাজ এখনও প্রান্তিক পর্যায়ে থাকায় তাদের জীবনমানের সেভাবে উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের নিত্যসঙ্গী। যার ফলে প্রায় সময়ই আমাদের কৃষকদের বিভিন্ন বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। সেক্ষেত্রে কৃষকদের আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে স্বাবলম্বী করতে হবে।
কৃষককে বাঁচাতে হলে কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি আরও বৃদ্ধি করতে হবে। যখন বাজারে কৃষকরা একটি পণ্যের ভালো মূল্য পেয়ে থাকে তার পরবর্তিতে কৃষকরা অতিমাত্রায় এ ফসল উৎপাদন করে থাকে। তারপর এই ফসলের জোগান বেড়ে যায় এবং জমি সীমিত থাকার কারণে অন্য ফসলের জোগান কমে যায়। যে ফসলের জোগান বেড়ে যায় তার দামও কমে যায়। তাই ফসল ব্যবস্থাপনায়ও একটি নীতিমালা জরুরি। কারণ আমাদের ভাবতে হবে যে আমাদের জমির পরিমাণ চাহিদার তুলনায় খুবই কম। এই অপ্রতুল জমিকে সঠিকভাবে ফসল উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করতে দেশের মানুষের চাহিদাভিত্তিক। এ ছাড়া দেশে চলমান শিল্পায়নের ফলে দ্রুত কৃষিজমি কমে আসছে এবং বাড়ছে কৃষির নিবিড়তা। ধীরে ধীরে কৃষিজমি কমে আসছে, কৃষকরা তাদের জমির মালিকানা ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। এখন কৃষিজমির মালিকানা কৃষকদের কাছ থেকে চলে যাচ্ছে সমাজের বিত্তবানদের হাতে। কৃষিকে এখন অতিমাত্রায় বাণিজ্যিকীকরণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
তবে আশার বিষয় হলো সম্প্রতি শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা অনেক আশা নিয়ে চাকরিকে বেছে না নিয়ে কৃষিকে প্রধান পেশা হিসেবে নিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের কাছে এ পেশাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হচ্ছে। তাদের এ উৎসাহ যেন হারিয়ে না যায় সেজন্য সরকারকে কৃষি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো কৃষক সমাজকে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে। তারা যেন সামাজিকভাবে সম্মানের সহিত বসবাস করতে পারে সেক্ষেত্রে সরকারকে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।