ইমেইল থেকে
মো. শামীম মিয়া
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:০২ পিএম
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত
কিশোর বয়স জীবনের এক রূপান্তরকালে। এ সময় শরীরে ঘটে নানা পরিবর্তন, মনে জাগে অজানা কৌতূহল, আবেগ হয়ে উঠে তীব্র আর সামাজিক সম্পর্ক জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ওঠে। এই বয়সে পরিবার, শিক্ষা, বন্ধুত্ব, সামাজিক মাধ্যম, অর্থনৈতিক বাস্তবতাÑ সবকিছু মিলে গড়ে ওঠে একটি অস্থির পরিবেশ। এর মধ্যে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি, অযাচিত চাপ বা নির্যাতন একজন কিশোরকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে পারে। একজন কিশোরের প্রথম পাঠশালা তার পরিবার। বাবা-মা যদি হন সহানুভূতিশীল, সংবেদনশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ; তবে সন্তান সহজেই মানসিকভাবে স্থিতিশীল হয়ে উঠবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, বাবা-মায়ের অনেকেই সন্তানের আবেগকে গুরুত্ব দেন না। তাদের চোখে সন্তান শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা ভবিষ্যতের ‘নিরাপত্তা প্রকল্প’। ভালো রেজাল্ট না করলে সন্তানকে অপমান করা হয়, অন্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়। অনেক সময় বাবা-মা নিজেদের ব্যর্থতা বা স্বপ্ন সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দেন। ফলে সন্তানরা হারায় আত্মবিশ্বাস, জন্ম নেয় ক্ষোভ, অবসাদ ও একাকিত্ব।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও মূলত পরীক্ষামুখী। পড়াশোনার উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে শুধু ভালো নম্বর পাওয়া, ভালো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। কিশোরদের দিন কাটছে কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট পড়া ও নানান প্রতিযোগিতার ভেতর। তাদের কাছে পড়াশোনা এক আনন্দের বিষয় নয়, বরং চাপ ও আতঙ্কের নাম। বিদ্যালয়ে এখনও নেই কোনো সুসংগঠিত কাউন্সেলিং সেবা। শিক্ষকরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না কোন ছাত্র মানসিক চাপে ভুগছে। বরং শাসন, তিরস্কার বা শাস্তির মাধ্যমে সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলা হয়। অথচ বিদ্যালয় হতে পারত সেই জায়গা, যেখানে কিশোররা শিখবে কীভাবে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কীভাবে বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়, কীভাবে সংকট মোকাবিলা করতে হয়।
ডিজিটাল যুগে কিশোরদের জীবন এখন প্রায় পুরোপুরি মোবাইল, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ানির্ভর। একদিকে এটি তাদের দিয়েছে নতুন দিগন্ত, শেখার অসংখ্য সুযোগ। কিন্তু অন্যদিকে এটি তৈরি করছে ভয়ংকর আসক্তি। দিনের পর দিন গেমসে আসক্ত হয়ে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে অনেকেই। অনলাইন আসক্তি তাদের ঘুম, পড়াশোনা, মনোযোগ ও সামাজিক দক্ষতাকে ধ্বংস করছে। এর ফলে জন্ম নিচ্ছে একাকিত্ব, উদ্বেগ ও অস্থিরতা।
মাদক এখন শহর থেকে গ্রামÑ সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। কিশোররা কৌতূহল, প্রলোভন বা হতাশা থেকে মাদক গ্রহণ শুরু করে। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি হয়ে ওঠে এক ভয়াবহ ফাঁদ। মাদক শুধু তাদের শরীর নয়, মনকেও ধ্বংস করে দেয়। মাদকাসক্ত কিশোর হয়ে ওঠে অস্থির, সহিংস, দায়িত্বজ্ঞানহীন। সে পরিবার, বন্ধু, পড়াশোনাÑ সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অনেক সময় অপরাধপ্রবণতা ও আত্মহত্যার পথেও চলে যায়।
বাংলাদেশে কিশোর আত্মহত্যার খবর এখন প্রায় নিয়মিতভাবে চোখে পড়ে। হতাশা, একাকিত্ব, পারিবারিক কলহ, প্রেমে ব্যর্থতা, পড়াশোনার চাপ, বুলিংÑ এসব কারণে কিশোররা কখনও কখনও জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেÑ একটি কিশোর কেন জীবনের শুরুতেই মৃত্যুকে বেছে নেয়? এর উত্তর একটাইÑ আমরা তাকে সময়মতো সাহায্য করতে পারিনি।
আমাদের সমাজ এখনও মানসিক স্বাস্থ্যকে ‘ট্যাবু’ হিসেবে দেখে। কেউ যদি বলে যে, সে হতাশায় ভুগছে বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে চায়, তবে তাকে উপহাস করা হয়। মনে করা হয়, মানসিক অসুস্থতা মানে ‘পাগল’ হয়ে যাওয়া। ফলে কিশোররা তাদের সমস্যাকে গোপন রাখে। একসময় সেই সমস্যা হয়ে ওঠে ভয়াবহ। এখন প্রশ্ন হচ্ছেÑ কীভাবে এই সংকট থেকে বের হওয়া যায়? সমাধানের পথ আসলে বহুমুখী।
প্রথমত. পরিবারকে হতে হবে সহানুভূতিশীল। বাবা-মাকে সন্তানের কথা শুনতে হবে, সময় দিতে হবে, ভালোবাসা ও বোঝাপড়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত. শিক্ষাব্যবস্থাকে পরীক্ষামুখী ধারা থেকে সরিয়ে এনে জীবনমুখী করতে হবে। বিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং সেবা চালু করতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা বুঝতে পারেন কোন ছাত্র মানসিকভাবে সংকটে আছে। তৃতীয়ত. প্রযুক্তির ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। কিশোরদের ডিজিটাল জগৎকে নিরাপদ করার জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। চতুর্থত. মাদক নির্মূলে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোরদের বিকল্প বিনোদন ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত করতে হবে। পঞ্চমত. জাতীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। স্বাস্থ্য বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে আলাদা বরাদ্দ দিতে হবে। প্রতিটি জেলায় কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের মানসিক স্বাস্থ্য যদি সুরক্ষিত হয়, তবে তারা দেশকে নিয়ে যাবে উন্নতির শিখরে। আর যদি আমরা এখনই উদ্যোগ না নেই, তবে হারাব অমূল্য মানবসম্পদ, বাড়বে সামাজিক অস্থিরতা, অপরাধ ও সহিংসতা। তাই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আর চুপ থাকা চলবে না। পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ ও রাষ্ট্রÑ সবার দায়িত্ব একসঙ্গে কাজ করা। আমাদের কিশোর-তরুণরা যেন ভেতর থেকে সুস্থ, শক্তিশালী ও আলোকিত হয়ে উঠতে পারেÑ এটাই হোক আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার।