× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

বাল্যবিবাহ বন্ধ হোক

মোছা. শাকিলা খাতুন

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৫৭ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ পরিস্থিতি এক নির্মম পরিসংখ্যানের গল্প। ইউনিসেফের তথ্য বলছে, দেশে ১৮ বছরের আগে অর্ধেকেরও বেশি মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি জাতির লজ্জার ইতিহাস। আইন আছে, প্রচারণা আছে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও আছে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন নেই। প্রশ্ন উঠছে, কেন নেই? উত্তর সোজাÑ জাতি শিক্ষিত না হলে বাল্যবিবাহ বন্ধ হবে না। শিক্ষাহীনতার কারণে মানুষ আইনের গুরুত্ব বোঝে না। গ্রামীণ সমাজে এখনও প্রচলিত ধারণাÑ ‘মেয়েকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেওয়া মানে দায়মুক্তি।’ দারিদ্র্য, যৌন হয়রানির ভয়, সামাজিক চাপÑ সব মিলিয়ে পরিবার ভাবে মেয়েকে ঘরে বসিয়ে রাখার থেকে বিয়ে দেওয়া ভালো। অথচ শিক্ষিত পরিবার জানে মেয়ের শিক্ষা তাকে ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে স্বাধীন করবে, পরিবারকে সহায়তা করবে, মর্যাদা এনে দেবে।

অশিক্ষিত মানসিকতা শুধু কুসংস্কার টিকিয়ে রাখে না, আইন ভাঙাকে বৈধতা দেয়। ২০১৭ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন পরিষ্কারভাবে বলছে, মেয়েদের জন্য ন্যূনতম বয়স ১৮। কিন্তু জন্মসনদ জাল করা এখনও খুব সহজ। স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা দুর্বল, রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা অনেক সময় নিজেরাই বাল্যবিবাহকে প্রশ্রয় দেন। ফলে আইন কাগজে থেকে যায়, বাস্তবে অকার্যকর হয়ে পড়ে।

শিক্ষা এই অবস্থাকে বদলাতে পারে। শিক্ষিত বাবা-মা জানবেন, অল্প বয়সে বিয়ে মানে কন্যার শারীরিক ঝুঁকি। শিক্ষিত মেয়ে জানবে, বিয়ের আগে তার পড়াশোনা শেষ করার অধিকার আছে। শিক্ষিত সমাজ জানবে, মেয়ের শিক্ষাই ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। শিক্ষা যত বিস্তার লাভ করবে, বাল্যবিবাহের ভিত্তি তত দুর্বল হবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি হার প্রায় শতভাগ হলেও মাধ্যমিক স্তরে এসে মেয়েদের বড় অংশ ঝরে পড়ে। সেখান থেকেই শুরু হয় বাল্যবিবাহ। গ্রামের মেয়ে মাধ্যমিকের পর স্কুলে টিকে থাকতে পারে না। দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপÑ সব মিলিয়ে অভিভাবকরা বিয়ে দিয়ে দেন। যদি শিক্ষা অব্যাহত রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া যেত, তবে বাল্যবিবাহ কমে আসত।

শিক্ষা শুধু জ্ঞানের জগৎ উন্মুক্ত করে না, এটি নারীর ক্ষমতায়নের চাবিকাঠি। একজন শিক্ষিত মেয়ে নিজের অধিকার জানে, নিজের স্বপ্ন জানে। সে সাহসের সঙ্গে বলতে পারেÑ ‘আমি এখনও বিয়ের জন্য প্রস্তুত নই।’ অশিক্ষিত মেয়ে জানেই না তার কী অধিকার আছে। তাই সে প্রতিরোধ করতে পারে না। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, যেখানে মেয়েদের শিক্ষা বিস্তার ঘটেছে, সেখানে বাল্যবিবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। নেপালে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় বিনিয়োগের ফলে গত এক দশকে বাল্যবিবাহ অর্ধেকে নেমেছে। আফ্রিকার ইথিওপিয়া বা ঘানার অভিজ্ঞতাও একই রকম। বাংলাদেশ কেন সেই পথে হাঁটতে পারবে না? বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার হার শতভাগ হলেও মানসম্মত শিক্ষা এখনও দুর্লভ। মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নেই, শৌচাগারের অভাব, হয়রানির ভয়Ñ সব মিলিয়ে ঝরে পড়ার হার বেড়ে যায়। এ সমস্যা সমাধান না করলে বাল্যবিবাহ থামানো সম্ভব নয়।

বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে মিডিয়া ও সংস্কৃতির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। নাটক, সিনেমা, সাহিত্য যদি বারবার বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে, তবে মানুষের মানসিকতা বদলাতে শুরু করবে। একদিকে শিক্ষা, অন্যদিকে সংস্কৃতির সচেতনতাÑ এই যুগলবন্দিই পারে সমাজকে বাল্যবিবাহমুক্ত করতে। ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্বও কম নয়। সমাজে তাদের প্রভাব বিশাল। যদি তারা মসজিদে খুতবা থেকে বলেনÑ অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে ইসলাম সমর্থন করে না, তাহলে মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তন আসতে পারে। শিক্ষকরাও একইভাবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের বোঝাতে পারেন।

সমাধানের পথ বহুস্তরীয়। প্রথমত. মেয়েদের মাধ্যমিক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা এবং বিদ্যালয়ে ধরে রাখার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত. দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক প্রণোদনা বাড়াতে হবে, যাতে মেয়ে পড়াশোনা চালালে পরিবার সুবিধা পায়। তৃতীয়ত. জন্মসনদ জালিয়াতি বন্ধ করতে হবে এবং প্রশাসনকে কঠোরভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। চতুর্থত. মেয়েদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষা চালু করতে হবে। পঞ্চমত. সামাজিক প্রচারণা চালাতে হবে, যাতে মানুষ বাল্যবিবাহকে অপরাধ হিসেবে দেখে।

জাতি শিক্ষিত না হলে বাল্যবিবাহ বন্ধ হবে নাÑ এটি কোনো স্লোগান নয়, এটি এক নির্মম বাস্তবতা। আইন দিয়ে হয়তো সাময়িক আটকানো যাবে, কিন্তু প্রকৃত সমাধান আসবে কেবল শিক্ষার মাধ্যমে। শিক্ষা একদিকে অজ্ঞতার দরজা ভাঙে, অন্যদিকে ক্ষমতায়নের জানালা খোলে। 

  • সোনাতলা, বগুড়া
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা