ইমেইল থেকে
আবু তালহা আকাশ
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৫৩ পিএম
‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটির ব্যাস বাক্য হলো ‘বিশ্ব বিদ্যার আলয়’। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করতে পারে। অর্থাৎ যেখানে বিশ্বের সব ধরনের জ্ঞানের কেন্দ্র বা আশ্রয় বলা যায়। ১৯২১ সালে দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে আমরা মোটামুটি সবাই জানি। তবে আজকের আলোচনার বিষয় এটি নয়!
দীর্ঘ ১২ বছর প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় সম্পন্ন করে, একজন শিক্ষার্থী হাজারো রাত জাগা পরিশ্রম আর প্রবল আকাঙ্ক্ষিত মহাকাশ-সম স্বপ্ন হৃদয়ে ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় পা রাখে। নিজের ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হলো- শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট বিষয়ে পেশাদারি ও সৃজনশীল জ্ঞান দেওয়া। নতুন জ্ঞান উদ্ভাবন ও বিদ্যমান জ্ঞান উন্নত করা এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বৃদ্ধি করা। যেখানে শিক্ষার্থীকে দেশের মেধাবী এবং প্রথম শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়। তাহলে এত এত পরিশ্রম করে একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় আসার পরে, কেন তুচ্ছ সব ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের সঙ্গে নানা প্রকারের সংঘাতে লিখতে হয়? এর জন্য মূলত দায়ী কে? আসলেই কি শিক্ষার্থী? স্থানীয় জনগণ? দেশের শিক্ষাব্যবস্থা? দেশের প্রশাসনিক কাঠামো? নাকি আমাদের মানসিকতা?
আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখি স্থানীয় জনগণ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বাঁকা চোখে দেখে থাকেন। স্থানীয়দের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের অনেক কারণ যদি খতিয়ে দেখা হয়Ñ তাহলে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণ পাওয়া যায়। যেমনÑ সংঘর্ষগুলোর পেছনে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত থাকে। সামাজিক কারণের ভেতর জড়িত আছে একে অপরকে অবমূল্যায়ন করা। স্থানীয়রা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আধিপত্যবাদী মনে করেন। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় হোটেল-রেস্তোরাঁ, কাঁচা-বাজার ও বিপণিবিতানকে কেন্দ্র করে বেশ বড় একটি অর্থনৈতিক চাকা চলমান থাকে। বিভিন্ন সময়ে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের বিবাদে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। বহু স্থানীয় মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মালিক তারা, আর শিক্ষার্থীরা এখানে শরণার্থী। এই যে অবিশ্বাস, ভাড়া, ব্যবসায়িক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব। অনেক ক্ষেত্রে তাদের জমি অধিগ্রহণে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ না পাওয়াসহ নানা কারণে একটি অজানা দূরত্ব থেকে যায়। তাই তাদের প্রচেষ্টা থাকে তাদের হাতে যতটুকু সুযোগ আছে, তার পুরোটা দিয়ে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে রাখতে। তখন শিক্ষার্থীদের মাঝেও একধরনের চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অপরদিকে, শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রথম শ্রেণির নাগরিক মনে করে কোনো আইন কেয়ার না করার মানসিকতা তৈরি হয়। কিছু ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের স্থানীয় আইন ও সামাজিক নীতির প্রতি অবহেলা ও অমান্য সংঘর্ষ তৈরিতে জ্বালানি জোগায়, যা অত্যান্ত দুঃখজনক হলেও প্রকৃত সত্য।
বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নানা ধরনের সংঘাতের ঘটনা দেখি। ২০২২ সালে নিউমার্কেট-ঢাকা কলেজ ছাত্রদের সঙ্গে দোকানিদের সংঘর্ষ ঘটে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ১৩ জুন, ২০২৩ সালে মোবাইল দোকানদারদের হামলায় ৫ জন জাবি শিক্ষার্থী আহত হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও (জবি) এ বছরের ৩-৪ মার্চ, কথা কাটাকাটির জেরে স্থানীয়দের হামলায় কমপক্ষে ৭-৮ জন জবি শিক্ষার্থী আহত ও ৮-৯ আগস্ট, সদরঘাটে লঞ্চের স্টাফদের সঙ্গে সংঘর্ষে জবি শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে ৯ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। কুয়েটে ২০২৫ সালে বড় সহিংসতা ঘটে, ছাত্ররাজনীতি বিষয়ক সংঘর্ষে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়দের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। এদিকে ২০২২ সালে গোবিপ্রবি তে শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের হামলা ও ব্যাপক সংঘর্ষ। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ২৪ মার্চ, ২০২২ রাতে স্থানীয়দের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা থেকে ২০ শিক্ষার্থী আহত হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ১১-১২ মার্চ, ২০২৩ সালে বাস-বিবাদে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের সংঘর্ষে ৩ শতাধিক আহত হয়। সর্বশেষ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা সবার জানা। ফলে আমরা দেখছি এক্ষেত্রে শিক্ষার্থী+স্থানীয় সবাই মুখোমুখি অবস্থানে থাকে।
একে সমস্যা বা সংকট যাই বলি না কেন, এ বিষয়ের সমাধানকল্পে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ সময় স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে না, এমনকি প্রতিটি ঘটনার সময় দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেরিতে হস্তক্ষেপ করে, ফলে সংঘর্ষ বড় আকার নেয়। এতে দূরত্ব বাড়ে।
আসলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল শিক্ষার জায়গা নয়, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের কেন্দ্র। স্থানীয় জনগণ সঠিকভাবে সম্পৃক্ত হলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষার মান বৃদ্ধি পায়। শিক্ষার্থীরাও স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সমাজ থেকে শেখার সুযোগ পায়, যা তাদের মানবিক ও বাস্তবমুখী করে তোলে। এই দ্বন্দ্বগুলো আসলে ‘অপব্যবস্থাপনা’র ফল, মৌলিক বৈরিতা নয়। যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগত ক্ষতিপূরণ, নিয়মিত আলোচনার প্লাটফর্ম এবং যৌথ সামাজিক উদ্যোগ নেয়, তাহলে সংঘর্ষ প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। আমরা মনে করি, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় উভয়ের মাঝে প্রয়োজন সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক। যে সম্পর্ক শিক্ষার্থী-শিক্ষক-প্রশাসন-স্থানীয় সবাইকে সহনশীল করে তুলবে। আমরা সেদিনেরই স্বপ্ন দেখি!