× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ই-মেইল থেকে

মেয়েদের উচ্চশিক্ষার পথে অদৃশ্য বাধা

জেসমিন চৌধুরী

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৫০ পিএম

মেয়েদের উচ্চশিক্ষার পথে অদৃশ্য বাধা

বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে উন্নয়ন ও পিছিয়ে পড়ার দ্বৈত স্রোত একই সঙ্গে প্রবাহিত হচ্ছে। একদিকে আমরা পোশাক শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা প্রবাসী আয় দিয়ে বিশ্বে প্রশংসা কুড়াচ্ছি। অন্যদিকে এখনও গ্রামীণ জনপদে অগণিত কিশোরী স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে, শহরের অভিজাত এলাকায়ও মেয়েদের উচ্চশিক্ষার পথে অদৃশ্য বাধা রয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন নারী শিক্ষাকে ঘিরে এখনও এত আলোচনার প্রয়োজন? কারণ সহজ : নারী শিক্ষা শুধু নারীর জীবনের প্রশ্ন নয়, এটি একটি জাতির অগ্রগতি, নৈতিক শক্তি ও টেকসই উন্নয়নের প্রশ্ন।

আজকের পৃথিবীতে কোনো রাষ্ট্র নারী শিক্ষাকে উপেক্ষা করে সামগ্রিক উন্নয়ন অর্জন করতে পারেনি। প্রমাণিত সত্য হলোÑ যত বেশি একজন নারী শিক্ষিত হবেন, তত বেশি তিনি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে অবদান রাখবেন। বাংলাদেশেও নারীর শিক্ষা বিস্তারে অনেক অগ্রগতি হয়েছে কিন্তু এই অগ্রগতি এখনও অসম্পূর্ণ, এখনও খণ্ডিত, এখনও সামাজিক বাস্তবতায় নানা প্রতিবন্ধকতায় আটকে আছে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দিকে তাকালেই বোঝা যায় শিক্ষিত নারী কর্মীর সংখ্যা যত বেশি, তত বেশি উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা। শুধু পোশাক শিল্প নয়, ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাÑ সবখানেই নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু যারা সামান্য প্রাথমিক শিক্ষাও পাননি, তারা এই প্রতিযোগিতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। নারী শিক্ষার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে দারিদ্র্য চক্র ভাঙে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে দারিদ্র্যের উত্তরাধিকার ঠেকানো যায়। 

নারী শিক্ষার প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়, সামাজিক ও নৈতিক পরিমণ্ডলেও এর গভীর প্রভাব রয়েছে। একটি শিক্ষিত নারী জানেন কোনটা অধিকার, কোনটা বৈষম্য। তিনি জানেন যৌতুক শুধু আর্থিক বোঝা নয়, এটি সামাজিক ব্যাধি। তিনি জানেন বাল্যবিবাহ মেয়েদের জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু। ফলে শিক্ষিত নারীরা শুধু নিজেদের জন্য নয়, চারপাশের সমাজকেও সচেতন করেন। গ্রামের কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যখন একজন মেয়ে শিক্ষক পড়ান, তখন তিনি কেবল পাঠ্যবই পড়ান নাÑ তিনি স্থানীয় কিশোরীদের সামনে এক প্রতীক হয়ে দাঁড়ান। এই প্রতীকী শক্তিই সমাজ পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দেখলে বোঝা যায়, যেসব দেশ নারী শিক্ষায় জোর দিয়েছে, তারা অল্প সময়েই বিস্ময়কর উন্নয়ন অর্জন করেছে। কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার উদাহরণ সামনে আছে। আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায় গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নারী শিক্ষায় বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল। আজ দেশটি আফ্রিকার অন্যতম দ্রুত উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। অন্যদিকে, আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের কিছু অঞ্চলে যেখানে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া এখনও সীমিত, সেখানে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি থমকে আছে। বাংলাদেশ যদি তার উন্নয়নযাত্রাকে স্থায়ী করতে চায়, তবে নারী শিক্ষাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার না দিয়ে কোনো উপায় নেই।

এখন প্রশ্ন আসেÑ নারী শিক্ষায় বিনিয়োগের পরিমাণ যথেষ্ট কি? সরকারের নানা প্রকল্প যেমন উপবৃত্তি কর্মসূচি, বিনামূল্যে বই বিতরণ, মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রণোদনা ইত্যাদি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু এগুলো প্রাথমিক সহায়তা। আসল কাজ হলো মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। শুধু স্কুলে ভর্তি করলেই হবে না, সেই স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক, অবকাঠামো, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং সামাজিক সহায়তা থাকতে হবে। বিশেষত গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোতে নারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। শহরের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন মেয়েরা আধুনিক শিক্ষা পাচ্ছে, তখন গ্রামে অনেক মেয়ে এখনও মাসিক চক্রের সমস্যায় ভুগে ক্লাস করতে পারে নাÑ এটাই বৈষম্যের বাস্তব ছবি।

আমাদের দেশে প্রায়ই নারী শিক্ষা নিয়ে বক্তৃতা শোনা যায়, স্লোগান শোনা যায়, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি রয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও, তারা গবেষণা কিংবা প্রযুক্তি খাতে পর্যাপ্ত সুযোগ পান না। আবার যেসব মেয়ে বিদেশে পড়াশোনা করতে চান, তারা সামাজিক ভীতি কিংবা অর্থনৈতিক কারণে পিছিয়ে যান। এ ক্ষেত্রে পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজÑ তিন পক্ষকেই একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবারকে মেয়ে সন্তানের শিক্ষাকে সমান মূল্য দিতে হবে, রাষ্ট্রকে নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, আর সমাজকে নারী শিক্ষাকে স্বাভাবিক ও অপরিহার্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

নারী শিক্ষা কোনো দয়া নয়, কোনো অনুদান নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার। এই অধিকারকে নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, সমাজের কর্তব্য এবং পরিবারের নৈতিক বাধ্যবাধকতা। যদি আমরা সত্যিই একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে নারী শিক্ষার গুরুত্বকে কথার স্তরে নয়, বাস্তব প্রয়োগে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

  • জিন্দাবাজার, সিলেট
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা