ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের রিপোর্ট
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৩৭ পিএম
গত দেড় দশকে সরকারের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী দেশের অর্থনীতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস প্রভৃতি ক্ষেত্রে সাফল্য দৃশ্যমান হলেও বড় বিতর্কিত বিষয় ছিল বেপরোয়া দুর্নীতি এবং সেই দুর্নীতির পথে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার, যা অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সংকট। বিষয়টি নানা মহল বা সংস্থা থেকে বারবার উচ্চারিত হয়ে আসছিল। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থ পাচার নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি প্রকাশ করে যুক্তরাজ্যের ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে শত শত বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ তুলেছে প্রভাবশালী এই সংবাদমাধ্যমটি। সংস্থাটির নতুন ডকুমেন্টারি বাংলাদেশ’স মিসিং বিলিয়নস- এ, স্টোলেন ইন প্লেইন সাইটে দাবি করা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। এত বিপুল অর্থ পাচার প্রমাণ করে দেশের আর্থিক খাতে দুর্বলতা আজ কোন পর্যায়ে। অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা বলছেন, পাচার হওয়া অর্থ যতটা সহজে দেশের বাইরে গেছে, ফিরিয়ে আনা ততটাই জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এই অর্থ ফেরত আনা কার্যত সরকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ বৈকি। আমরা মনে করি, এই পাচার দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন ধারার জন্য বড় ‘প্রশ্নবোধক’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১২ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘হাসিনার শাসনকালে পাচার হয়েছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠ মহলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই বিপুল অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ ছিল। তার ঘনিষ্ঠরা গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় দেশের বিভিন্ন ব্যাংক দখল করে। সে সময় বহু ব্যাংক পরিচালককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। তারপর ওইসব ব্যাংক থেকে নিজেদের স্বার্থে হাজার কোটি টাকার ভুয়া ঋণ দেওয়া হয়। যার বড় অংশ পাচার করা হতো হুন্ডি বা অন্যান্য মাধ্যমে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় লুটতরাজ। দুদকের মামলায়ও অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরা বড় অবকাঠামো প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। যার বড় অংশই যুক্তরাজ্যে গেছে। আন্তর্জাতিক দুর্নীতি নজরদারি সংস্থাগুলো বলছে, যুক্তরাজ্যের শক্তিশালী আর্থিক খাত ও রিয়েল এস্টেট বাজার বাংলাদেশী দুর্নীতিবাজদের পাচার করা বিপুল সম্পদের নিরাপদ গন্তব্য। সহজ করে বললে যুক্তরাজ্যই যেন হয়ে ওঠে অর্থ পাচারের প্রধান কেন্দ্র। অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাংলাদেশের সাবেক এক ভূমিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে কয়েকশ’ সম্পত্তি রয়েছে। ব্রিটিশ অপরাধ দমন সংস্থা (এসসিএ) ইতোমধ্যে প্রায় ৩৫০টি সম্পত্তি জব্দ করেছে।
আসলে এই পাচারের তথ্য কেবল অর্থনৈতিক একটি সমস্যা তা নয়। এটি উন্নয়ন প্রক্রিয়ার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার মানে দেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা। অথচ এই অর্থ দিয়ে নতুন শিল্পায়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের জন্য বিশাল পরিবর্তন আনা যেত। পাচার হওয়া এই অর্থ দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই অর্থ পাচার ভয়ানক কালো অধ্যায়। শাসক দল তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে এনে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এই সুযোগ নিয়ে অনেক মন্ত্রী, এমপি, আমলা বা ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী মহল বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়েছে। দেশে গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার অভাবে সাধারণ মানুষ এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করতে বা আইনি প্রতিকার চাইতে পারেনি। আমরা মনে করি, এই বিপুল অর্থ পাচারের দায় শুধু দেশীয় ব্যবস্থাই নয়, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও সমানভাবে দায়ী। কারণ উন্নত দেশগুলোয় অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন ও উন্নত মনিটরিং পদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও এই পাচার হওয়া অর্থ বিনিয়োগ বা সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। কানাডার বেগমপাড়া, মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার নানা ব্যাংক ও রিয়েল এস্টেটে বাংলাদেশের টাকা এখনও জমা হচ্ছে। সঠিক সময়ে অর্থ পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে হয়তো পাচারের ইতিহাস ভিন্ন রূপ পেত।
অপ্রিয় হলেও সত্য যে, দীর্ঘ ১৫ বছরে শেখ হাসিনার শাসনকালে বারবার অর্থ পাচারের অভিযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং সরকারের ছত্রছায়ায় পাচারকারীরা আরও বেপরোয়া হয়েছে। সে সময় একদিকে উন্নয়ন প্রচারণা, অন্যদিকে বিদেশে সম্পদ গড়ার প্রবণতাÑ এক চরম বৈপরীত্য। সচেতন মানুষ মনে করে, এই অবস্থা চলতে পারে না, চলা উচিত নয়। এখন প্রশ্ন হলোÑ এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী? প্রথমত, দেশের আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। আমরা মনে করি, সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গণতান্ত্রিক না হলে প্রকৃত জবাবদিহিতা আসবে না।
পাচারের ঘটনা কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক দেউলিয়াত্বেরও প্রমাণ। তাই পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য লড়াই যেমন প্রয়োজন, তার চেয়েও জরুরি ভবিষ্যতে আর যাতে একটি ডলারও পাচার না হয়, তা নিশ্চিত করা। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে নাগরিক আস্থা ভেঙে পড়বে, রাষ্ট্র তথা শাসকের প্রতি জন-আস্থা হারাবে। বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজেকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। সেই ক্ষেত্রে অর্থ পাচার রোধ, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং নীতি বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আমরা মনে করি, পাচার রোধ করা গেলে দেশের অর্থ খাতে স্থায়িত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা আরও সুদৃঢ় হবে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় অর্থ পাচার কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না।