বিএসটিআই : চট্টগ্রাম
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩২ এএম
প্রতিদিনই আমাদের বাজারে নিত্য নতুন দেশীয় ও আমদানিকৃত পণ্য প্রবেশ করছে। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে শিল্প-কাঁচামাল, প্রসাধনী কিংবা নির্মাণসামগ্রী সবকিছুই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে ভোক্তার স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসবের গুণগতমান ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রধান ভূমিকা রাখে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। বিএসটিআইয়ের ‘মান সনদ’ ব্যতীত এসব পণ্য বাজারে প্রবেশ আইনত নিষিদ্ধ। বাধ্যতামূলক মান সনদের আওতায় থাকলেও এতদিন বহু পণ্যই পরীক্ষার সক্ষমতা ছিল না চট্টগ্রামে। বহু পণ্য পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হতো। সেখান থেকে রিপোর্ট আসার অপেক্ষায় থাকত আমদানিকারকরা। এতে একদিকে তৈরি হতো দীর্ঘসূত্রতা, অন্যদিকে সময়ক্ষেপণের কারণে বাড়ত আমদানি খরচও। তবে আশার কথা সম্প্রতি চট্টগ্রামে বিএসটিআই-এর একটি পূর্ণাঙ্গ ল্যাবরেটরি ভবন চালু হওয়ায় সেখানে পণ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যা আমদানিকারক তথা ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমাবে এবং শিল্প, বাণিজ্য ও ভোক্তা সুরক্ষায় নতুন গতি আসবে।
১১ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘চট্টগ্রামে বাড়ছে পণ্য পরীক্ষার সক্ষমতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, বিএসটিআই চট্টগ্রাম কার্যালয় নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হওয়ায় কার্যক্রমে গতি এসেছে। ফলে এখানকার ল্যাবের কার্যক্রম অনেক প্রসারিত হয়েছে। ৩১৫টি বাধ্যতামূলক পণ্যের মধ্যে আগে যেখানে চট্টগ্রাম কার্যালয়ে ১০৭টির মতো পণ্য পরীক্ষা করা সম্ভব হতো। সেখানে এখন নতুন ভবনে ১৭৪টি পণ্যের পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। এতে আমদানিকারকদের ভোগান্তি অনেকটাই ঘুচতে ধারণা করা যায়। বলে রাখা ভালো, প্রতিবছরই বিপুল পরিমাণ ভোগ্যপণ্য আমাদের দেশে আমদানি হয়। এই পণ্যসমূহ বন্দরে খালাস হওয়ার আগে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন অপরিহার্য। এতদিন কাগজে-কলমে ল্যাবরেটরি ও পরীক্ষণ ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে ছিল এন্তার অভিযোগ। কারণ দেশের আমদানি প্রবাহ দিন দিন বাড়লেও বিএসটিআইয়ের জনবল, প্রযুক্তি ও ল্যাবের সংখ্যা সে হারে বাড়েনি। ফলে অনেক সময় আমদানিকারকদের পণ্য বন্দরে আটকে থাকে, আবার অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল পরীক্ষণসহ নানা অনিয়মের হাত ধরে মানহীন পণ্য বাজারে প্রবেশ করার সুযোগ পেত।
এ কথা সত্য যে, পণ্য খালাস প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা বাণিজ্য-ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমদানিকারকদের অভিযোগ, বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিতে গিয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ লেগে যায়। অথচ আধুনিক প্রযুক্তি থাকলে এ সময়সীমা কয়েকদিনেই সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব। অন্যদিকে ব্যবসায়ী স্বার্থে বা প্রভাব বিস্তারের কারণে কখনও কখনও মান যাচাই না করেই পণ্য ছাড়পত্র দেওয়ার অভিযোগও শোনা যায়। এ ধরনের অনিয়ম ও অদক্ষতা কেবল অর্থনীতির জন্যই ক্ষতিকর নয়, বরং ভোক্তার স্বাস্থ্যের জন্যও হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে স্বীকার করতে হবে, সংকটের পরও গত কয়েক বছরে বিএসটিআই-এর বেশ কিছু ইতিবাচক দিক পরিলক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ল্যাব স্থাপনে অগ্রগতি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়ায় আমদানিকারকরা অনলাইনে আবেদন করাসহ পরীক্ষার ফলাফল দ্রুত জানতে পারছে। পাশাপাশি বাজার তদারকি জোরদার করতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও ভ্রাম্যমাণ দল কার্যক্রমও শক্তিশালী হয়েছে। তারপরও বলবো, সক্ষমতার অবস্থানগত পরিবর্তনের পরও চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা এখনও সীমিত। লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে দক্ষ জনবল, আঞ্চলিক পর্যায়ে আরও ল্যাব স্থাপন, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
আমরা মনে করি, বিএসটিআই আমাদের জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। এটি কেবল একটি দপ্তরই নয়, ভোক্তার অধিকার ও নিরাপত্তা সুরক্ষারও অন্যতম অবলম্বন। তাই এই দপ্তরটি ব্যবসায়ী ও ভোক্তাবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যাতে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বচ্ছতা ফেরে, মানহীন পণ্যের দৌরাত্ম্য কমে এবং ভোক্তারা নিরাপদ থাকে। আমাদের বিশ্বাস, সরকারের সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমেই সংস্থাটির পণ্য খালাসের সক্ষমতা আরও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে। মানতেই হবে, বন্দরনগরীর বিএসটিআইয়ের আধুনিক ল্যাবরেটরি সমৃদ্ধ ভবন সময়ের প্রয়োজনে যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটা চট্টগ্রামের শিল্প ও বাণিজ্যকে বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে সক্ষম হতে। পাশাপাশি ভোক্তার অধিকার সুরক্ষায় সক্ষম হবে। ব্যবসায়ীরা আর যেন ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়- তারা যেন চট্টগ্রাম থেকেই সেবাটি পেতে পারেন তা নিশ্চিত করা হোক।
বিএসটিআইকে জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে দক্ষ জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ল্যাবগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। আঞ্চলিক পর্যায়ে আরও আধুনিক ল্যাব স্থাপন করে পরীক্ষণ প্রক্রিয়াকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। আমদানিকারকদের জন্য খালাস প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করার পাশাপাশি ভোক্তা নিরাপত্তার বিষয়টি যেন সব সময় অগ্রাধিকার পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে বিএসটিআইকে একটি গুণগতমান নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।