রক্তের ঋণ
ফজলে মিনহাজ, রাজনীতি পর্যবেক্ষক
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩৫ এএম
আমরা কি সত্যিই সবকিছু ভুলে যাচ্ছিÑ নাকি আমাদের ইচ্ছাকৃতভাবে ভোলানো হচ্ছে? মনে হচ্ছে, বিগত ১৭ বছরের জুলুম-নির্যাতনের দিনগুলো মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে বসেছে। নইলে কেন এই এক বছরে আমরা অতীতের দমন-পীড়নের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করছি না? কেন আমরা আগামী দিনের নতুন ধারার বাংলাদেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধ হতে পারছি না?
আমরা ভুলতে বসেছি আওয়ামী লীগের পতনের পরে ৫-৮ আগস্টের দিনগুলো, যখন কোনো সরকার ছিল না, জনগণই অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় ছিল। আমরা ভুলতে বসেছিÑ কীভাবে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র আমাদেরকে তাদের সেবাদাসে পরিণত করেছিল। আর সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, আমরা কোনো গভীর পর্যালোচনা করছি না ফ্যাসিবাদের দিনগুলির ওপর এবং পতিত সরকারের সেই নতজানু পররাষ্ট্রনীতির ওপর।
রাজনৈতিক দলগুলোতে আজ ঐক্য নেই। নেই জুলাই ঘোষণাপত্রের প্রত্যাশিত বাস্তবায়ন। নেই জুলাই সনদের অগ্রগতি। স্বৈরাচারের পতন হয়েছে কিন্তু প্রশাসনে এখনও তাদের শেকড় উৎখাত করা যায়নি। এখনও তাদের ঝটিকা মিছিলসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দমন করা যায়নি। বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় ও পাঁচ তারকা হোটেলে তারা দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির কূটকৌশল করছে। কিছুদিন আগে একটা সংবাদ মাধ্যমে দেখলাম দিল্লি বসে স্বৈরাচারের মহারানীকে এস আলমের পক্ষ থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা দিয়েছে শুধু নির্বাচন বানচাল ও আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের জন্য। তারপরই শুরু হলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা, বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা ও নুরুল হক নুরের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাণ্ডবলীলা। সবই কার্যত মনে হচ্ছে সেই আড়াই হাজার কোটি টাকার লেনদেনের ফসল।
ডাকসু নির্বাচন শেষ হয়েছে। যারা ডাকসুর নির্বাচনে বিজয়ী ও বিজিত সকলেই ২৪-এর বিপ্লবের অংশীদার, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু নাগরিক হিসেবে হতাশ হয়েছি যখন দেখলাম, প্রার্থীরা কেউ তাদের পূর্বসূরি সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদস্বরূপ ঐক্যবদ্ধ কোনো কর্মসূচি নেয়নি। ডাকসু হচ্ছে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে নতুন নেতৃত্ব তৈরির অন্যতম প্লাটফর্ম। কিন্তু এই প্রজন্মের মাঝে যদি জাতীয় রাজনীতির মতো কাদা ছোড়াছুড়ি ও হিংসাত্মক রাজনীতির প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব কোথায় গড়ে উঠবে? আগামীর বাংলাদেশ কার কাছে নিরাপদ থাকবে? ছাত্রসমাজের মাঝে যে অনৈক্যের ও অপরাজনীতির চর্চা দেখা যাচ্ছে তা আগামী রাজনীতির জন্যও অশনিসংকেত।
ডাকসু নির্বাচনের ফোকাসটা জাতীয় রাজনীতির মতো করেই করা হচ্ছে। কিন্তু এ নির্বাচন ছাত্রদের রাজনীতির বয়ান হওয়া উচিত ছিল ইউনিক ও গতানুগতিক রাজনীতি থেকে মুক্ত। অথচ প্রার্থীদের কথা শুনলে মনে হয়েছে এটা একটা মূলধারার রাজনীতিকে ফাংশন করছেÑ যার ফলে জনগণের ফোকাসটাও বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনের দিকেই ছিল। ফলে পতিত স্বৈরাচার ও তার দোসররা আড়ালে নিজেদের পুনর্বাসন ও কর্মতৎপরতা নিয়ে হাজির হওয়ার সাহস দেখাচ্ছে।
ফ্যাসিবাদের প্রধান দোসর হিসেবে জাতীয় পার্টির ভূমিকাকে শুধু আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে সীমিত করে দেখা যাবে না। বরং বলা যায় জাতীয় পার্টিই আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে মজবুত করার অন্যতম হাতিয়ার ও ভিত্তি ছিল। বিশ্বের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে খুব কম উদাহরণ আছে যেখানে একটি দল সংসদের বিরোধী দলে থেকেও সরকারের মন্ত্রিত্ব ভোগ করে, আবার একই সঙ্গে ‘বিরোধী দল’ হিসেবে সংসদে অবস্থান করে।
এই অস্বাভাবিক ও নির্লজ্জ রাজনৈতিক কাঠামোই মূলত আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে বৈধতা দিয়েছে। বিরোধী দলের আসনে বসে সরকার পরিচালনায় অংশগ্রহণ করা নিছক সাংবিধানিক বিদ্রূপ নয়, বরং এটি এক ধরনের রাজনৈতিক তত্ত্বÑ যাকে সহজভাবে ‘আওয়ামী ফ্যাসিজম’ বলা যায়। এই তত্ত্বের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ কেবল ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িতই করেনি, বরং এক নতুন ধরনের ‘জাতীয় স্বৈরতন্ত্র’ কায়েম করেছে।
জাতীয় পার্টি এখানে মুখ্য ও প্রধান ভূমিকা পালন করেছেÑ একদিকে তারা বিরোধী দলের নামের ভান ধরে রেখেছে, অপরদিকে সরকারের চাকা ঘোরাতে সহযোগিতা করেছে। এভাবেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তারা এক ন্যক্কারজনক নজির সৃষ্টি করেছে, যা গণতন্ত্রকে দুর্বল এবং ফ্যাসিবাদকে শক্তিশালী করার জন্য কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
১৪ দল বা মহাজোটের কিছু মন্ত্রী-এমপি যদি জেলখানায় থাকতে পারে, ছাত্রলীগের রাজনীতি যদি নিষিদ্ধ হতে পারে, আর আওয়ামী লীগ গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত হয়ে রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত হতে পারেÑ তাহলে প্রশ্ন উঠবে, জাতীয় পার্টি কোন আইনে এখনও বৈধভাবে রাজনীতি করার সুযোগ পাচ্ছে? কার ইশারায় তারা আজও মামলার বাইরে থেকে যাচ্ছে?
জাতীয় পার্টি সরাসরি আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। ঢাল-তলোয়ারের ভূমিকা নিয়ে তারা আবারও কারও এজেন্ডা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে। এরই ধারাবাহিকতায় শোনা যাচ্ছে, তাদের কিছু শীর্ষ নেতা নাকি আওয়ামী লীগের কথিত ‘ক্লিন ইমেজ’র লোকদের মনোনয়ন দেওয়ার পরিকল্পনায় ব্যস্ত।
এ থেকে স্পষ্ট আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে জাতীয় পার্টিই এখন ভূমিকা পালন করছে। অথচ প্রশ্ন হলো, যারা জনগণের বিরুদ্ধে বারবার ষড়যন্ত্র করেছে, যারা স্বৈরতন্ত্রের রক্ষক ছিল, তারা কীভাবে জনতার বিপ্লব-পরবর্তী সময়েও রাজনীতি চালিয়ে যেতে পারে?
যদি জাতীয় পার্টিকে রাজনীতি করার বা নির্বাচনমুখী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা হবে সরাসরি গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে প্রতারণা। এটি হবে শহীদের রক্তের প্রতি এক চরম বেঈমানি।
বর্তমান সময়টা আগামীর রাজনীতি ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য একটা টার্নিং পয়েন্ট। তাই এ সময়ে যেমন অন্তর্বর্তী সরকারকে আরও দূরদর্শী হতে হবে, তেমনই দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে যেন দেশবিরোধী কোনো চক্রের চক্রান্ত ও পতিত স্বৈরাচারের কোনো দোসর ফায়দা লুটতে না পারে।
অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের হাতেই ছেড়ে দেওয়া হবে। সরকারের এ অবস্থান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ মনে হলেও এর মধ্য দিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা এবং আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। জনগণের মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে, যদি সবকিছুই পরবর্তী সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গতি ও দিকনির্দেশনা কতটা দৃশ্যমান হবে?
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দায়িত্ব এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গড়িমসি বা কালক্ষেপণ না করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই যে অংশগুলো বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো দ্রুত কার্যকর করা জরুরি। জনগণ দৃশ্যমান পরিবর্তন না দেখলে আস্থা হারাবে, আর সেই শূন্যতায় পুরনো অরাজক শক্তি আবারও মাথাচাড়া দিতে পারে। তাই কমিশনের প্রতি প্রত্যাশাÑ তারা যেন জুলাই সনদকে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে, বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য অংশগুলো জনগণের সামনে নিয়ে আসে। এতে যেমন অনিশ্চয়তার মেঘ কেটে যাবে, তেমনি আসন্ন নির্বাচনের প্রতি জনগণের আস্থা সুদৃঢ় হবে।
নির্বাচন কমিশন ফেব্রুয়ারিকে টার্গেটে রেখে আগামী নির্বাচনের রোডম্যাপ দিয়েছে, এটা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। নির্বাচনপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলোকেও ফুরফুরে মেজাজে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু শুধু নির্বাচন নয়, জনগণের রক্তের ঋণের প্রতিদান দিতে হবে চব্বিশের গণহত্যার বিচার দৃশ্যমান, মৌলিক সংস্কার এবং জুলাই সনদের রোডম্যাপ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই।
যদি আপৎকালীন এই সরকার নির্বাচনের আগে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয় এবং জনমনে যে আস্থা সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণে অক্ষম হয়, তবে এ সরকার নিঃসন্দেহে একটি ব্যর্থ সরকার হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হবে। একই সঙ্গে এ ব্যর্থতার দায় শুধু সরকারের ওপরই বর্তাবে না বরং রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতালিপ্সা, দায়িত্বহীনতা ও সমঝোতার অভাবকেও সমানভাবে দায়ী করা হবে।
মনে রাখতে হবে, জনগণ অসংখ্য তাজা প্রাণ উৎসর্গ করেছে, বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে। সেই আত্মত্যাগের উত্তরাধিকার নিয়েই আজকের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এক কথায় এই সরকার দাঁড়িয়ে আছে রক্তের ভিত্তির ওপর, শপথ নিয়েছে শহীদদের ঋণ শোধ করার। তাই সেই রক্তের ঋণকে অবমূল্যায়ন করে কিংবা শোধ না করেই শুধু যেনতেন নির্বাচন আয়োজন করে ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো কৌশল, কোনো ছলচাতুরীÑ জনগণ কখনোই গ্রহণ করবে না।