নেপালে জেন-জি বিদ্রোহ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩৩ এএম
আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল। হিমালয়ের বুকে ক্ষুদ্র এই দেশটি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির নীতিনির্ধারণ বিষয়ক সকল ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্ম তথা জেন-জির উত্থান আলোড়িত ঘটনা। দেশটির কল্যাণমুখী সকল প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে তরুণ সমাজ সদা-জাগ্রত। সেই প্রেক্ষিতেই গত সোমবার রাজধানী কাঠমান্ডুসহ দেশটির অন্তত সাতটি শহরে দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে তরুণ প্রজন্ম। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কাঠমান্ডুতে কারফিউ জারি করে সরকার। মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে অন্তত ১৯ জন নিহত হন। বিক্ষোভকারীরা একপর্যায়ে পুলিশের প্রতিবন্ধকতা ভেঙে পার্লামেন্ট ভবন দখল করে নেয়। শেষ পর্যন্ত ছাত্র-জনতার তীব্র বিক্ষোভের মুখে দেশটির প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি পদত্যাগ করে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। এই দৃশ্য যেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টপূর্ব বাংলাদেশের প্রতিচিত্র। যার পরিণতিতে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এ কারণে নেপালের জেন-জিদের বিক্ষোভের ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশের গত বছরের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
এ কথা সত্য যে, লাতিন আমেরিকা থেকে শুরু করে এশিয়া, আফ্রিকা কিংবা ইউরোপÑ প্রায় সকল স্থানেই জেন-জি তরুণরা দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার। হংকংয়ের গণআন্দোলন, চিলির শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার আন্দোলন বা মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্তে তরুণদের অংশগ্রহণে আমরা দেখেছি এই প্রজন্ম অন্যায়ের কাছে নত হয় না। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল কিংবা পাকিস্তানের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও একই ছবি। বৈষম্য আর দুর্নীতি দেখে ক্লান্ত তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যঙ্গচিত্র, ভিডিও বা প্রচারণা চালিয়ে শাসকদের দায়ী করছে। কোথাও তারা ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন চাইছে, আবার কোথাও-বা রাস্তায় নেমে স্বৈরাচারী কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি এড়াতে হলে তরুণ সমাজসহ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে- সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকে।
১০ সেপ্টেম্বর আমাদের প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘তারুণ্যের দখলে নেপাল’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, সম্প্রতি আদালতের একটি আদেশের পর নেপালের যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সোশ্যাল মিডিয়াগুলোকে নিবন্ধনের জন্য সাত দিনের সময় বেঁধে দেয়। ওই সময়সীমার মধ্যে নিবন্ধন না করায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও এক্সসহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ম্যাসেজিং অ্যাপের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। ফলে চরম সংকটে পড়ে তরুণ সমাজ। কারণ চাকরিসহ নানা অর্থনৈতিক সংকটে ভোগা দেশটির বহু তরুণ আয়ের মাধ্যম হিসেবে এসব প্লাটফর্ম বেছে নিয়েছিল। স্বভাবতই এসব প্লাটফর্মের ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞা ছাত্র-জনতার মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভের জন্ম দেয়। বিক্ষোভের পেছনে সরকারের দুর্নীতিসহ দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষও কাজ করেছিল। আসলে প্রতিটি প্রজন্মই তার সময়ের সংকটের মুখোমুখি হয়। প্রযুক্তির সঙ্গে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার পুরনো ধাঁচ মেনে নিতে চায় না। তাদের কাছে ক্ষমতা, সুযোগ কিংবা সুবিধা নয়Ñ ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতাই আসল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘তারুণ্যের দখলে নেপাল’Ñ এই বাস্তবতা কেবল স্লোগানই নয়, একটি চলমান সামাজিক বিপ্লবও। বলা চলে, তরুণ প্রজন্মই আজ নেপালের পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। তারা পুরনো সংকট অতিক্রম করে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করছে।
পরিসংখ্যান বলছে, নেপালের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি তরুণ। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে সচেতন হয়ে উঠছে। কেবল ভোটার হিসেবেই নয়, নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবেও নিজেদের শক্ত অবস্থান রেখে আসছে। নেপালের বিগত নির্বাচনে যে নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর উত্থান হয়েছে, তার মূল চালিকাশক্তি ছিল তরুণরাই। উল্লেখ্য, এক সময়ের রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ কিন্তু দেশটির জন্য মসৃণ ছিল না। সেই কণ্টকাকীর্ণ পথ কাটিয়ে তরুণদের দিকনির্দেশনা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা এনেছে। তারা দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠায় সংকল্পবদ্ধ হয়। পুরনো প্রজন্মের মতো কেবল ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং নীতি, উন্নয়ন আর কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিতেই তাদের মনোযোগ। সে কারণে ‘তারুণ্যের দখলে নেপাল’ কথাটি শুধু কাব্যিক নয়; বরং বাস্তবতার রূপ।
আমরা মনে করি, নেপালের এ ঘটনায় একটি বড় বার্তা রয়েছে, যা হলোÑ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নীতি-নৈতিকতায় স্বচ্ছতার দ্বার উন্মুক্ত রাখতে হবে। বস্তুত বিশ্বজুড়ে তরুণদের ক্ষোভের কারণ হয়ে উঠেছে তাদের সমস্যা বা স্বার্থের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের উদাসীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের চেষ্টা। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে নেপালের এই তারুণ্যনির্ভর পরিবর্তন অন্য দেশগুলোর জন্যও অনুকরণীয় হতে পারে। কারণ, তরুণদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো জাতি টেকসই উন্নয়ন বা সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। নেপালের তরুণরা যে সাহস, নেতৃত্ব ও স্বপ্ন দেখাচ্ছে তা প্রমাণ করছে, আগামীর বিশ্ব হবে তরুণদের নেতৃত্বে। আমরা আশা করিÑ জবাবদিহিতা ও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশটিতে তরুণদের হাত ধরে আরও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। তাদের দেশ গঠনের এই অগ্রযাত্রায় আমাদের শুভ কামনা।