খাদ্য মূল্যস্ফীতি
ড. মিহির কুমার রায়, গবেষক ও অধ্যাপক
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩২ এএম
গত তিন বছর ধরে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। এনবিআরও চাল, তেল, আলু, পেঁয়াজ, ডিমসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যে শুল্ক-কর কমিয়ে দেয়। অতি সম্প্রতি বিনাশুল্কে মাত্র ২ শতাংশ আয়কর দিয়ে চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বাজারে নিত্যপণ্যের আমদানি প্রবাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করা হয়।
চালের দাম খাদ্য ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর এখনও উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করছে। ক্রমেই বাড়ছে দাম। সেই চাপ কিছুটা হলেও প্রশমন করছে আলু। গত অর্থবছরে সবজির মূল্যস্ফীতি কমাতে বলিষ্ঠ প্রভাব রেখেছে। তবে খাদ্য-বহির্ভূত খাতে গত অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল ছিল বলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে। খাদ্যপণ্যের মধ্যে শাকসবজি ও কন্দজাত ফসলের অবদান যথাক্রমে ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। দাম কমেছে ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়তা করেছে। এর মধ্যে আলু ও পেঁয়াজের অবদান যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এ ছাড়া সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইলিশ, বেগুন, টমেটো, সয়াবিন তেল ও পাঙাশ মাছও মূল্যস্ফীতি কমাতে কিছুটা ভূমিকা রেখেছে। ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কৃষি উপকরণের সময়মতো সরবরাহ এবং বাজার পরিস্থিতির নিবিড় পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে জিইডি।
টিসিবির বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ জুলাই কেজিপ্রতি আলুর দাম ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। বছর ঘুরে পণ্যটি বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৫২ দশমিক ১৭ শতাংশ কম। চলতি সপ্তাহে বাজারে আলুর দাম আরও কম, ১৬ থেকে ২০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি বিপণন সংস্থার টিসিবির বাজারদরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের ৩১ জুলাই সরু জাতের চালের দাম ছিল কেজিতে ৬০ থেকে ৭৮ টাকার মধ্যে; এক বছরে তা বেড়ে হয়েছে ৮৫ টাকা। মাঝারি মানের চাল, যা বেশি মানুষের খাদ্য, তার দাম ৫৮ টাকা থেকে লাফিয়ে ওঠে ৭৫ টাকায়। আর মোটা চালের দাম ৫৪ থেকে ৬০ টাকায় পৌঁছেছে। এই তিন ধরনের চালের দামই বেড়েছে যথাক্রমেÑ ১৫ দশমিক ৯৪, ২০ দশমিক ৫৪ ও ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
চালের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি শুধু ভোক্তার পকেটই কাটেনি মূল্যস্ফীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে জিইডি প্রকাশিত সর্বশেষ অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, চালের দাম খাদ্য ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর এখনও বড় চাপ। মে মাসে যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান ছিল ৪০ শতাংশ, জুলাই মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশে। এর মধ্যে মাঝারি ও মোটা চালের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। মাঝারি চাল ২৪ শতাংশ এবং মোটা চাল ১৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ প্রভাব রেখেছে। চিকন, মাঝারি ও মোটাÑ এই তিন ধরনের চালেই জুলাই মাসে প্রায় ১৫ শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতি হয়েছে। তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। আগের চার মাস মূল্যস্ফীতি কমলেও গত জুলাই মাসে কিছুটা বেড়েছে। গত জুলাই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। গত জুনে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। তখন টানা চার মাস সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছিল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, গত জুনে দেশের যে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল, তা বিগত ৩৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। কিন্তু সে অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। এর পরের মাসেই মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। বিবিএসের হিসাব অনুসারে, গত জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। আর খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। দুই খাতেই আগের মাসের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এক বছর আগে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নেয়। এর কিছুটা সুফলও মিলেছে।
এদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি বলেন, মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হলেও আলুচাষিরা মূলধন হারিয়ে এখন দিশাহারা। তারা খরচের টাকা ওঠাতে পারেননি। এ কারণে তারা আগামী মৌসুমে আলু চাষে নিরুৎসাহিত হবেন। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) পরিচালক ও হাসেন কোল্ড স্টোরেজের স্বত্বাধিকারী বলেন, আলুর দাম মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হলেও ন্যায্য দাম না পেয়ে কৃষকরা দিশাহারা। গত বছরের তুলনায় এবার ১০ লাখ টন বেশি আলু এখনও হিমাগারে পড়ে আছে। তিনি বলেন, এই দাম আলু উৎপাদনে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে পারে। চাষিরা সত্যি যদি আলু চাষ কমিয়ে দেন, সে ক্ষেত্রে সংকটে পড়বে দেশ। তাই ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে সরকারের উদ্যোগ জরুরি। হিমাগার মালিকদের সংগঠন বিসিএসএর তথ্য বলছে, এবার এক কোটি ৩০ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। দেশে বছরে আলুর চাহিদা ৮৫ থেকে ৯০ লাখ টন। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ৪০ লাখ টন বেশি। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতার কারণে হিমাগার ফটকে এলাকাভেদে কেজি এখন ১৩ থেকে ১৫ টাকা। অথচ সব মিলিয়ে কৃষকের প্রতি কেজিতে উৎপাদন খরচ হয়েছে ২৫ টাকা।
এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বা পরাজয়ের গল্পটি মনে হয় বাংলাদেশের কৃষক ও বাজারব্যবস্থা নিয়েই রচিত হয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম যেমন বেড়েছে লাগামহীনভাবে, তেমনি কৃষকদের হতাশা বেড়েছে ন্যায্যমূল্যে ফসল বিক্রি করতে না পারায়। প্রতিটি জায়গায় সিন্ডিকেট বেড়ে যাওয়ায় নানামুখী সমস্যার মধ্যে পড়তে হয় নিম্ন-আয়ের মানুষের। বাংলার মানুষ দুবেলা দুমুঠো ভাত খেতে চায়। বাংলাদেশে আনুমানিক এক কোটি ৬৫ লাখ থেকে দুই কোটি কৃষক পরিবার তাদের সামাজিক মর্যাদা চায়। চায় রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণ করতে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। কিন্তু বাঙালি কৃষকের অসহায় ও দরিদ্রতার তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেনি। বাংলার কৃষক আজও শিক্ষাহীন, বস্ত্রহীন, চিকিৎসাহীন জীবন-যাপন করছে। দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে। কমেছে কৃষিজমির পরিমাণ। এ ছাড়াও অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগÑ কোনোকিছুরই মোকাবিলা করার কৌশল ও সামর্থ্য কৃষকের প্রায় নেই। তাই কৃষকের শোচনীয় অবস্থার পরিবর্তন হয় না। তবু কৃষকরা বহুকাল ধরে অবহেলিত। বিশেষ করে তাদের সামাজিক মর্যাদা এখনও নিম্নমানের।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় কৃষকের জীবনযাপন অনিশ্চিত ও স্থবির হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলের দাম না পেয়ে কৃষকদের এখন পথে বসার উপক্রম। কৃষকের মধ্যে অনেকেই জড়িয়ে পড়েছেন ঋণের জালে। কেউবা জমি বর্গা নিয়ে চাষ করছেন। ফসল বিক্রি করে ঋণের কিস্তি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন ঋণ শোধ তো দূরের কথা, সংসার চালানো দুরূহ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান হওয়ায় কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে এদেশ ভরে ওঠে ফসলের সমারোহে। কৃষকের উৎপাদিত ফসল বিদেশে রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়। বলতে গেলে, কৃষকই আমাদের জাতীয় উন্নয়নের চাবিকাঠি। আমাদের জাতির প্রাণ। কবির ভাষায়, ‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা, দেশমাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা’।
সাম্প্রতিক কৃষিশুমারিতে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে ৬০ শতাংশের বেশি কৃষক প্রান্তিক কৃষক বা ভূমিহীন। গ্রামীণ কৃষক পরিবারের আয় তুলনামূলকভাবে কম। তারা প্রায়ই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। দারিদ্র্যের হার কৃষকের মাঝে বেশি। বিশেষ করে, ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে। বেশিরভাগ কৃষক-পরিবার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। মৌসুমের ওপর নির্ভরশীলতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তারা প্রায়ই খাদ্যের ঘাটতির সম্মুখীন হন।
এসব কথার সারাংশ হলো, কৃষকদের আর্থ-সামাজিক মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যেন কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের নায্যমূল্য পায়। একই সঙ্গে বাজারব্যবস্থায় বিদ্যমান সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং নিত্যপণ্য করতে হবে সহজলভ্য। এই দায়িত্ব সরকার সংশ্লিষ্ট সকলকেই নিতে হবে। নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে সকল প্রকার বৈষম্য দূর করতে হবে। সর্বস্তরের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।