নুরাল পাগলার দরবার
মহিউদ্দিন খান মোহন, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:০০ পিএম
রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দে যে বীভৎস ঘটনা ঘটেছে, কোন ভাষায় তার নিন্দা করা যায়, কয়েক দিন ভেবেও হদিস পাইনি। সেখানে একদল উন্মত্ত মানুষ (!) ‘নুরাল পাগলা’ নামে এক ব্যক্তির কবর থেকে তার লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলেছে। সেই সঙ্গে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার দরবার ও বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে। খবরে বলা হয়েছে, গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের জুড়ান মোল্লাপাড়ায় নিজ বাড়িতে দরবার গড়ে তুলেছিলেন নুরাল পাগলা। তিনি নিজেকে ‘ইমাম মাহাদি’ বলে পরিচয় দিতেন। ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন কেতাবে কেয়ামতের আগে পৃথিবীতে ইসলাম ধর্মের প্রচার-প্রসারের জন্য ইমাম মাহাদি নামে একজন আধ্যাত্মিক পুরুষের আগমনের কথা বর্ণিত রয়েছে। আরও রয়েছে নবী হজরত ঈসা (আ.)-এর পুনরাগমনের কথাও; যাকে আল্লাহ সশরীরে ঊর্ধ্বাকাশে তুলে নিয়েছেন। নবী ঈসা (আ.)-এর কথা কুরআনে বর্ণিত হলেও ইমাম মাহাদির কথা কুরআনে উল্লেখ নেই। তবে হাদিসে তার কথা বলা হয়েছেÑ এমনটি বলা হয়ে থাকে। এ সবই বিশ্বাসের বিষয়। এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি খুঁজতে যাওয়া বৃথা। কবে কেয়ামত হবে, তার কতদিন আগে ঈসা (আ.) দুনিয়ায় পুনরায় তাশরিফ আনবেন কিংবা ইমাম মাহাদির আবির্ভাব ঘটবে, কোনো কিছুই নির্দিষ্ট করে কুরআন বা হাদিসে উল্লেখ করা নেই। এর সবই ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে প্রচারিত। আর এই সুযোগটাই নিয়ে থাকে আমাদের দেশের কতিপয় ধান্দাবাজ ধর্মব্যবসায়ী; যাদেরকে মানুষ ‘পীর-দরবেশ’ হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে অর্ঘ্য দান করে।
গোয়ালন্দের নুরুল হকও সেই সুযোগটি নিয়েছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। আমাদের এ সমাজে কিছু মানুষ আছে, যারা কারও মধ্যে আধ্যাত্মিকতার ছায়া দেখলেই তার পায়ে লুটিয়ে পড়ে, তাকে নিয়ে লাফালাফি শুরু করে দেয়। সরলপ্রাণ মানুষগুলোর এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নুরাল পাগলারা তাদের কার্যসিদ্ধি করতে পারে সহজেই। আমাদের দেশে আরও একজন ‘নুরা পাগলা’র উত্থান ঘটেছিল স্বাধীনতার পরপরই। তার ভক্ত-মুরিদানের সংখ্যাও কম ছিল না। আস্তানা ছিল রাজধানীর বাড্ডা এলাকায়। তবে তার বিচরণ ক্ষেত্র ছিল হাইকোর্ট মাজার এলাকায়। সারা গায়ে শিকল পরিহিত নুরা পাগলার মুরিদানদের মধ্যে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-ছাত্র এমনকি সেই সময়ের উদীয়মান পপ গানের শিল্পীরাও ছিলেন। জনশ্রুতি রয়েছে বাংলাদেশে পপ গানের প্রবর্তক ‘পপগুরু’খ্যাত আযম খান তার অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘হাইকোর্টের মাজারে, কত ফকির ঘোরে, কয়জনা আসল ফকির’ গানটি নুরা পাগলাকে নিয়েই লিখেছিলেন এবং গেয়েছিলেন। ওই সময় হাইকোর্ট সংলগ্ন খাজা শরফুদ্দীন চিশতি (রহ.)-এর মাজার শরিফের পাশেই সন্ধ্যার পর বসত নুরা পাগলার আসর। সেখানে ছিল ‘সিদ্ধিবাবা’র জয়জয়কার। অর্থাৎ গঞ্জিকা সেবন উৎসব। সেই সঙ্গে আধ্যাত্মিক গানের আসরও বসত। উঠতি বয়সের তরুণদের একটি অংশ নুরা পাগলার শিষ্য বনে গিয়েছিল। তবে নুরা পাগলা কখনও নিজেকে কোনো আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ বলে দাবি করেন নি। তিনি গত হয়েছেন বহু বছর হলো। তার কথা এখনও অনেকের স্মরণে আছে।

অনেককাল পরে আবার নুরা পাগলার কথা মেনে পড়ল গোয়ালন্দের ‘নুরাল পাগলা’র কবর ও দরবারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংস ঘটনা ঘটার খবর পাঠ করে। গোয়ালন্দের নুরাল পাগলা মারা গেছেন ২৩ আগস্ট। তার দরবারের মধ্যেই জায়গা উঁচু করে তাকে দাফন করে ভক্তরা। তার সমাধিকে পবিত্র কাবা শরিফের আদলে গড়া হয়েছিল। খবরে বলা হয়েছে, গত ৬ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পরে ‘ঈমানি-আকিদা রক্ষা কমিটি’র ব্যানারে একদল লোক হামলা হামলা চালায় নুরাল পাগলার দরবারে। তারা কবর খুঁড়ে তার লাশ বের করে পুড়িয়ে দেয় এবং দরবারকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। তথাকথিত ইমানি জোশে উন্মত্ত উচ্ছৃঙ্খল জনতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুটি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার একটি গাড়িও ভাঙচুর করে। সংঘর্ষে একজন নিহত ও পুলিশসহ প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছে বলে খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনার পর অন্তর্বর্তী সরকার এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ওইদিন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছেÑ ‘এ জঘন্য অপরাধে যুক্ত অপরাধীদের চিহ্নিত করা হবে এবং আইনের পূর্ণ শক্তি দিয়ে বিচারের আওতায় আনা হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। দায়ীরা যাতে তাদের কৃতকর্মের পরিণতি ভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করতে অতি দ্রুত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বিবৃতিতে নাগরিকদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও মানবতার নীতি সমুন্নত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকার এই বিবৃতির সাধুতা নিয়ে কারও কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়। তবে একটি সহিংস ঘটনার পর এ ধরনের ‘নিরীহ’ বিবৃতি কোনো সরকারের কাছ থেকে কাম্য কি না সে প্রশ্ন উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কেননা কোনো ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে সরকারের দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। এ ধরনের বিবৃতি রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের কাছ থেকেই সাধারণত এসে থাকে। আর সরকার ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে দুর্বৃত্তদের শাস্তির আওতায় আনার কাজে মনোনিবেশ করে। সচেতন ব্যক্তিদের অনেকেই গোয়ালন্দের ঘটনায় সরকারের বিবৃতিকে ব্যর্থতার দায় এড়ানোর কৌশল বলে মনে করছেন। অনেকটা সৃষ্ট ক্ষতে মলম মালিশ করে ব্যথার তাৎক্ষণিক উপশমের চেষ্টার মতো।
এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে যে, তাৎক্ষণিক উত্তেজনাবশত হঠাৎ সেদিন গোয়ালন্দে ওই ঘটনা ঘটেনি। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত পূর্বপরিকল্পনা মতেই সংঘবদ্ধ জনতা এ ধরনের হামলা চালিয়ে থাকে। আমার পূর্বপরিচিত এক ব্যক্তি, যিনি রাজবাড়ীতে থাকেন, তিনি বলেছেন, কয়েক দিন আগে থেকেই ঘটনাটি ঘটবে এমন আশঙ্কা ছিল। কারণ মূল পরিকল্পনাকারীরা কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসায় প্রচার চালিয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছে, কথিত ইমাম মাহাদির কবর উচ্ছেদে অংশ নেওয়ার জন্য। রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন এবং গোয়ালন্দ উপজেলা প্রশাসন তা জানত নাÑ এ কথা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কেননা ঘটনাটি গোপনে সংঘটিত হয়নি। প্রকাশ্য দিবালোকে পূর্বপ্রস্তুতিতে সংঘটিত একটি সহিংস ঘটনা প্রতিহত করতে কেন প্রশাসন ব্যর্থ হলো এর কৈফিয়ত তাদেরকেই দিতে হবে।
ঘটনা ঘটার পর অন্তর্বর্তী সরকারের নিন্দা জানিয়ে বিচারের আশ্বাস ও সান্ত্বনা দেওয়ার নজির আরও রয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর বিজয়নগরে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় অভিমুখে গণঅধিকার পরিষদের মিছিলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ভয়াবহ সংঘর্ষের পরও জারি করা বিবৃতিতে ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। আগে আমরা দেখতাম, গুরুতর কোনো ঘটনা ঘটলে সরকারের তরফ থেকে, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রেস নোটে সংঘটিত ঘটনার বিবরণ ও সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের বর্ণনা দেওয়া হতো। সেসব প্রেসনোটের বিষয়বস্তু কখনোই কারও কাছে শতভাগ বিশ্বাসযোগ্য হতো না। বেশিরভাগ সময় তা আসল ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা বলে জনগণের ধারণা ছিল। আর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রেসনোটের জায়গা দখল করেছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বিবৃতি। কখনও তা লিখিত আকারে গণমাধ্যমে পাঠানো হয়, কখনও আবার প্রেস সচিব, উপ-প্রেস সচিব এমনকি সহকারী প্রেস সচিব মহোদয়গণ টিভি ক্যামেরার সামনে তাদের চাঁদবদন দেখিয়ে বিবৃত করে থাকেন। প্রশ্ন হলো, এ ধরনের বিবৃতি দিয়েই সরকারের দায়িত্ব পালন সম্পন্ন হয়ে যায় কি না।
উদ্বেগজনক একটি বিষয় গত দশ-পনেরো বছর ধরে বাংলাদেশকে ঘিরে ধরেছে। সেটি হলো কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তথাকথিত ‘তৌহিদী জনতা’র সংগঠিত হওয়া ও ন্যক্কারজনক ঘটনা সংঘটন। এই তৌহিদী জনতার কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তারা কারা তা-ও চিহ্নিত করা যায় না। তবে এটাও এক ধরনের ‘মব সন্ত্রাস’ নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশের মানুষের শান্তি হরণকারী ফ্যাসিস্ট লীগ সরকারের বিদায়ের পর যে মুহূর্তে জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছিল, ঠিক সে মুহূর্তেই মূর্তিমান আতঙ্কের ন্যায় হাজির হয় মব সন্ত্রাস; যা আজ গোটা সমাজকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের ঘটনাটিও ক্রমবর্ধমান মব সন্ত্রাসেরই বর্ধিত রূপ। পার্থক্য- এক্ষেত্রে রাজনৈতিক ইস্যুর পরিবর্তে ধর্মীয় উন্মাদনাকে ব্যব্হার করেছে স্বার্থান্বেষী মহল। মৃত নুরাল পাগলা নিজেকে ইমাম মাহাদি দাবি করে নিশ্চয়ই গুনাহের কাজ করেছে। তার সে গুনাহের বিচার তো করবেন সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক আল্লাহ, কোনো মানুষ নয়। তার কবর উচ্ছেদ করে লাশ পুড়িয়ে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তারা কি ইসলামের মূলনীতির অনুসারী? কেননা, মৃত ব্যক্তিকে (এক্ষেত্রে লাশ) শাস্তি দেওয়ার অধিকার দেশের আইন বা শান্তির ধর্ম ইসলাম কাউকে দেয়নি। আর আইন হাতে তুলে নেওয়ার এ প্রবণতা দিনকে দিন বৃদ্ধির পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন প্রয়োগে দুর্বলতাই যে সর্বাংশে দায়ী, তা অস্বীকার করার উপায় আছে কি?