× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভাসমান চাষ-পদ্ধতি

দেশীয় উদ্ভাবনে ছিন্ন করি জলবায়ু সংকট

ড. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:১৫ এএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

এখন থেকে কোনো বন্যায় কৃষি চাষ/ আবাদ থামবে না, এজন্য চাই এমন বিকল্প জমি, যা পানিতে ভেসে থাকবে, যতই বাড়ুক বন্যার পানি, কৃষকের ভাসমান কৃষিক্ষেত পানিতে আর ডুববে না। সাধারণত বন্যার পানিতে যখন জমি ডুবে যায়, পানির নিচে, তখন কৃষকের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। প্রতিবছর নিয়মিত হওয়া বন্যায়, কৃষকরা কীভাবে বাঁচবে, আর কৃষিকাজই বা করবে কোথায়? বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষিজমি প্রতিবছরই একটা দীর্ঘ সময় পানির নিচে তলিয়ে যায়। এই দীর্ঘ জলাবদ্ধতার সময়টা এলাকাভেদে তিন মাস থেকে ৯ মাস পর্যন্ত হয়। এই সময়ে বহু কৃষক প্রায় বেকার বা কর্মহীন হয়ে পড়ে। অনেকে এই সময়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। ভাসমান চাষ-পদ্ধতি বাংলাদেশের বন্যাকবলিত অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। 

বাংলাদেশের পিরোজপুর জেলার কৃষকরা এখন থেকে শতবর্ষ আগে সর্বপ্রথম এই বন্যার বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে অভিযোজন উদ্ভাবনের চেষ্টা করেন। দেশীয় ও প্রকৃতিতে সহজলভ্য উপাদানসমূহ যেমন কচুরিপানা, টোপাপানা আর নলখাগড়া, বাঁশের মাচা ও ঘাসকে স্তূপ করে তৈরি করা হয় ‘ভাসমান বেড’ বা ‘ধাপ’। এই ভাসমান বেড বা ভেলার ওপরই সিজন অনুসারে চাষ করা হয় নানা ধরনের শাকসবজি, প্রয়োজনীয় মসলা, এমনকি ধান পর্যন্ত! বাংলাদেশে প্রথমে পিরোজপুরের কৃষকরা এতে একচেটিয়া সাফল্য লাভ করলেও পরবর্তীতে দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত পানি, হাওর-বাঁওড়ের দীর্ঘস্থায়ী বন্যা বা নিম্নাঞ্চলের জলাবদ্ধতা, সর্বত্র এই ভাসমান চাষ-পদ্ধতি যেন প্রকৃতির চ্যালেঞ্জকেই নিজের শক্তিতে পরিণত করেছে। বর্তমানে পিরোজপুরে তিন পুরুষ ধরে চলছে ভাসমান চাষ-পদ্ধতিতে বছরব্যাপী কৃষিকাজ। এখন পিরোজপুরে কৃষকদের সারা বছরে কোনো অবসর নেই, সারা বছরই চলছে নতুন ফসলের কৃষিকাজ । এই ভাসমান চাষ-পদ্ধতি বর্তমানে বন্যাদুর্গত ৭১টি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে সরকারি উদ্যোগে সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এই স্থানীয় উদ্ভাবনের ফলে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বর্তমানে একদম বদলে গেছে। এখন বাংলাদেশের কৃষকরা কৃষির জন্য বন্যাকে আর ভয় পায় না। ৬-৮ মাস পানিবন্দি থাকা হাওর বা বিলাঞ্চলে ভাসমান বেড পানি বাড়ার সময়ে ফসলকে ডুবে যাওয়া ও ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। যেই জমা পানিই ছিল কৃষির মূল সমস্যা, সেই পানিই এখন হয়ে উঠেছে স্থানীয় সমাধানের ভিত্তি।

দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ত পানিতে মাটি বিষিয়ে উঠলেও ভাসমান বেডে ব্যবহার করা হয় মিষ্টি পানি বা বৃষ্টির পানি। ফলে মাটির লবণ ভাসমান ভেলার ফসলের শিকড় ছুঁতেই পারে না। ফলে কৃষি উৎপাদনে কোনোরকম সমস্যা হয় না। নিচু জলাভূমি বা পতিত ডোবাগুলো ভাসমান পদ্ধতিতে কৃষি উৎপাদনের নতুন আখড়ায় পরিণত হয়। বর্তমানে ‘অপচয়শূন্য কৃষি’র এক আদর্শ উদাহরণও এই ভাসমান কৃষি-পদ্ধতি। ক্ষতিকর জলজ আগাছা যেমন- কচুরিপানা, টোপাপানা এই ভাসমান কৃষির বেড তৈরির মূল কাঁচামাল। এই ভাসমান কৃষি-পদ্ধতিতে একটি জলজ সমস্যাকে ব্যবহারযোগ্য সম্পদে রূপান্তর করা হয়েছে! সঠিক পরিচর্যায় ভাসমান বেডে প্রচলিত জমির চেয়েও বেশি ফলন পাওয়া যায় নানা ধরনের শাকসবজির (যেমন- লালশাক, বেগুন, লাউ, কুমড়া, বরবটি, পেঁপে, শসা, মরিচ, টমেটো, পাতাকপি, ব্রকলি, লেটুস ইত্যাদি) চাষে। 

এই চাষ-পদ্ধতিতে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন তুলনামূলক বেশ কম এবং পরবর্তীতে পানি নেমে গেলে ভাসমান বেডগুলোই জমিতে জৈবসার হিসেবে ভেঙে ব্যবহার করা যায়। ফলে, বছরজুড়ে পরিবেশবান্ধব কৃষি উৎপাদন বজায় থাকে এবং স্থানীয় উদ্ভাবনের জন্য এর প্রশিক্ষণ বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য তুলনামূলক অনেকটা সহজতর। ভাসমান চাষ-পদ্ধতির কারণে দেশের নানান বন্যাপীড়িত এলাকায় কৃষকরা সহজেই নিজ নিজ পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা বন্যার মধ্যেও নিশ্চিত করতে পারছে। এর মধ্যে পিরোজপুর, বরিশাল, গোপালগঞ্জ জেলা উল্লেখযোগ্য। ভাসমান, পরিবেশবান্ধব কৃষি উৎপাদন সহজ ও বছরজুড়ে চলার কারণেই গ্রামের নারী কৃষকরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং নিজেদের অবসরের সময়কে কাজে লাগিয়েই পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবদান রাখে।

জলবায়ুর ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত আশাব্যঞ্জক এই ভাসমান চাষ-পদ্ধতি আজও কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এর মধ্যে এখনও অনেক সম্ভাবনাময় অঞ্চলের চাষি এই ভাসমান চাষ-পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত নন বা পুরোপুরি রপ্ত করতে পারেননি। ভালো ভাসমান বেড তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রচুর শ্রমিকের শ্রমের দরকার হয়। এই ক্ষেত্রে দক্ষ শ্রমিকের অভাব, অনেক এলাকায় বেশ প্রকট। নির্দিষ্ট মৌসুম ও স্থানভেদে কচুরিপানার প্রাপ্যতা নির্ভর করে, আর এটাই ভাসমান চাষ-পদ্ধতির মূল উপাদান। কাজেই কাঁচামালের অনিশ্চয়তা এর সম্ভাবনাময় প্রসারকে ব্যাহত করে। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি ও স্থিতিশীল বাজার নিশ্চিতকরণ ভাসমান চাষ-পদ্ধতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত তাপ বা দীর্ঘস্থায়ী খরা ভাসমান চাষের পানির উৎসকেও প্রভাবিত করতে পারে।

স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত প্রজ্ঞাকে প্রসারের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে নেওয়া ও ভাসমান চাষকে বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন জেলাভিত্তিক সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ। এছাড়া কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে (বিরি, বারি) ভাসমান পদ্ধতির জন্য উপযোগী উচ্চমূল্যের, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও রোগ ও পোকা নিরোধী ফসলের জাত ( যেমনÑ টমেটো, মিষ্টিকুমড়া) উদ্ভাবনে মনোনিবেশ করতে হবে। বেড তৈরির জন্য আরও সহজ ও টেকসই কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে। স্থানীয়ভাবে কচুরিপানা সংরক্ষণ ও টেকসই আহরণের ব্যবস্থা করা। বিকল্প ভাসমান মাধ্যম (বায়োডিগ্রেডেবল বস্তু) নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। ভাসমান চাষে বর্তমানে নারীরাও অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তাদের প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা (কৃষিঋণ) এবং উৎপাদিত পণ্য বিপণনে সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে। এটি হতে পারে তাদের আর্থিক স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির হাতিয়ার।

কৃষকের সমবায় গঠন, ‘ভাসমান কৃষি পণ্য’র জন্য আলাদা ব্র্যান্ডিং, শহুরে হাট বা অনলাইন প্লাটফর্মে সরাসরি বিপণনের সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের ( যেমন : ভাসমান সবজির আচার, চিপস) উদ্যোগ নেওয়া। সরকারের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ও কৃষিনীতিতে ভাসমান চাষকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন কৌশল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, প্রণোদনা দেওয়া এবং এই চাষাবাদে নিয়োজিত কৃষকদের জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দেওয়া।

ভাসমান চাষ শুধু একটি স্থানীয় উদ্ভাবিত কৃষি-পদ্ধতি নয়, এটি জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে টিকে থাকার সংগ্রামে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের মেধা ও সহনশীলতার উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। এটি প্রমাণ করে, প্রকৃতির সঙ্গে সব সময় যুদ্ধ নয়, বরং তারই ছন্দে গা ভাসিয়ে দিয়ে তাকে ব্যবহার করেই সার্বিক খাদ্য ও আর্থিক নিরাপত্তা সহজেই নিশ্চিত করা সম্ভব। 

গবেষণা, প্রযুক্তি ও নীতির সমর্থনে এই স্থানীয় উদ্ভাবনী প্রজ্ঞাকে শক্তিশালী করে, এর দেশব্যাপী বিস্তার ঘটিয়ে আমরা জলবায়ু সংকটের ভয়াবহ পরিণতিকে মোকাবিলার এক অনন্য সুযোগে রূপান্তর করতে পারি। আসুন, আমাদের দেশের এই প্রাচীন স্থানীয় জ্ঞানকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তুলি। ভাসমান চাষ হোক বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজনের স্থানীয় অভিযোজনের এক গৌরবদীপ্ত প্রতীক, ভাসিয়ে দিক ভবিষ্যতের সব জলবায়ুর সংকটের প্রতিকূলতা!

  • জলবায়ু গবেষক ও সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট 
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা