নুরাল পাগলা’র মাজারে হামলা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৫৮ এএম
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে ‘ইমাম মাহাদি’ দাবি করা নুরুল হক ওরফে ‘নুরাল পাগলা’র মাজারে হামলা ও তার মরদেহ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার বিক্ষুব্ধ জনতা ‘ঈমান-আকিদা রক্ষা কমিটি’ নামক ব্যানারে আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে গিয়ে মাজারে ভাঙচুর চালায় এবং কবর থেকে নুরাল পাগলার মরদেহ তুলে পুড়িয়ে ফেলে। মাজার ভাঙচুর, আগুন ধরিয়ে দেওয়া এবং মরদেহে অগ্নিসংযোগের এ ঘটনায় আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে যেভাবে বিভিন্ন স্থানে মাজারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে তাতে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা মনে করি, এ রকম ন্যক্কারজনক একটি ঘটনা শুধু মানবিক মূলবোধকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং এর মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধও লঙ্ঘিত হয়। এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারো নেই।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মাজার ভাঙচুরের সময়ে উত্তেজিত জনতা পুলিশের দুটি গাড়ি এবং ইউএনওর গাড়িও ভাঙচুর করেছে। সে সময় নুরাল পাগলার অনুসারী ও উত্তেজিত জনতা একে অপরের ওপর ইট-পাথর নিক্ষেপ করে। এতে একজন নিহত এবং অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছে। আমরা নিহতের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করি।
আমাদের স্মরণে আছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং গত ১৮ জানুয়ারি গণমাধ্যমকে পুলিশের দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল, দেশে গত ৪ আগস্ট থেকে পরবর্তী সাড়ে ৫ মাসে ৪০টি মাজার, সুফি সমাধিস্থল ও দরগাহে ৪৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার প্রতিটি ঘটনাতেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে সময় প্রেস উইং আরও বলেছিল, ‘অন্তর্বর্তী সরকার মাজারে যেকোনো হামলার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স (শূন্য সহনশীলতা) নীতি গ্রহণ করেছে। পুলিশের সব ইউনিটকে কঠোরভাবে মামলা তদন্ত এবং হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকার দেশের মাজার ও দরগাহগুলোর নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।’
আমাদের প্রশ্ন, গত কয়েক দিন ধরেই যখন নুরাল পাগলার কবর নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল, স্থানীয়দের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল, এ নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে উভয় পক্ষের বৈঠকও হয়েছে। তাহলে সহিংসতার ইঙ্গিত থাকার পরও স্থানীয় প্রশাসন কেন জোরালো পদক্ষেপ নেয়নি? এ ব্যর্থতা ও দায় কার?
নুরাল পাগলার কবর অবমাননা এবং মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।’ আমরা কথা নয়, কাজ দেখতে চাই। যেভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘মব’ তৈরি করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা হচ্ছে, তা জনজীবনের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এ ধরনের অপচেষ্টা ও অপপ্রয়াসের লাগাম যদি এখনই টেনে ধরা না যায়, তার পরিণতি কারও জন্যই শুভ হবে না, এটা বলার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। আমরা মনে করি, আইনের শাসন, আইনের যথাযথ প্রয়োগই পারে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে। দেশে অরাজকতা, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির মাধ্যমে কেউ যদি ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের দুরভিসন্ধিতে লিপ্ত হয়, তা-ও থামিয়ে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। বছর শেষে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে জাতি। নির্বাচন ঘিরে নাশকতা তৈরিতে বারবার ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে কোনো পক্ষ শান্তি নষ্টের অপচেষ্টা করছে কি না সরকারকে তা-ও খুঁজে দেখতে হবে। অপরাধীকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই।
সেই সঙ্গে আমরা পরমত-সহিষ্ণুতা চর্চা বাড়ানোর আহ্বান জানাই। একে অন্যের মতকে যদি সম্মান করতে না পারি, তাহলে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে যেতে পারে। নিজের মতাদর্শকে আদর্শ ধরে যদি আমরা অন্যের মতকে দমিয়ে রাখতে চেষ্টা করি, তাহলে সামাজিক অপরাধ বাড়বে। নষ্ট হবে সামাজিক স্থিতিশীলতাও। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দেশের ভাবমূর্তি হবে প্রশ্নবিদ্ধ। তাই সকল মতের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিতে সরকারকে যেকোনো ধরনের সহিংসতা রোধে কঠোর হতে হবে। ব্যক্তি পর্যায়ে কারও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধীর বিচারে দেশে আইন রয়েছে, আদালত রয়েছে। আদালতের মাধ্যমে অপরাধী বিচার নিশ্চিত করার দায় সরকারের। আমরা মনে করি, এই বার্তাটিও খুব কঠোরভাবে সরকারের তরফ থেকে দেওয়ার সময় এসেছে। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে শুধু বিবৃতি জানিয়ে নিন্দা প্রকাশ নয়, আমরা সরকারের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন নিশ্চিত করার জন্যও বলি।