মহেশখালী মহাপরিকল্পনা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:৪৪ পিএম
ভৌগোলিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে কক্সবাজার দেশের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতও এটি। দেশের উপকূলীয় এই জেলার মহেশখালী ও মাতারবাড়ী ঘিরে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। ৩ সেপ্টেম্বর, বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় নবগঠিত মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠককালে নতুন করে প্রসঙ্গটি উঠে আসে। বৈঠকে মহেশখালী-মাতারবাড়ী প্রকল্পের অগ্রগতির ওপর একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপিত হয়। এতে মিডার আগামী চার মাসের কর্মপরিকল্পনাও উপস্থাপন করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা এ মহাপরিকল্পনাকে কেবল অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ হিসেবেই দেখছেন না, প্রকল্পটিতে ‘ব্লু ইকোনমি’ গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন। তার মতে, সমুদ্রই হবে ভবিষ্যতের মহাসড়ক। তিনি আরও মনে করেন, মহেশখালী-মাতারবাড়ী হবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সংযোগের কেন্দ্র। এজন্য তিনি সমুদ্রকেন্দ্রিক গবেষণা, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং সংশ্লিষ্ট একাডেমি গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি চান, এলাকাটি কেবল ফ্যাসিলেটিং জোন হিসেবে নয়, বরং সেখানে একটা নতুন শহরের জন্ম হোক। যেখান থেকে আমাদের আন্তর্জাতিক কানেক্টিভিটি তৈরি হবে। সমুদ্রই হবে বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সংযোগের মহাসড়ক।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে বিগত সরকার ‘বিগ-বি’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি অর্থনৈতিক জোন তথা পাওয়ার হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নেয়। সেই আলোকে ২০১৮ সালে একটা খসড়া পরিকল্পনাও ঠিক করা হয়েছিল। ৩৩ হাজার একর জমি নিয়ে প্রকল্পটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সংক্রান্ত কাজগুলো করতে গিয়ে জটিলতায় পড়ছিল। সেই সমস্যা সমাধানে সম্প্রতি মিডার মতো কর্তৃপক্ষ গড়ে তোলা হয়।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান ও নবগঠিত মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) প্রধান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে গড়ে ওঠা এ মহাপরিকল্পনা আগামী ৩০ বছরে শুধু চট্টগ্রামের নতুন সংস্করণ নয়, বরং সিঙ্গাপুর বা সাংহাইয়ের মতো আধুনিক অর্থনৈতিক নগরীতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে ৬০ থেকে ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে প্রায় ৫ বিলিয়ন আসবে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) হিসেবে, বাকিটা স্থানীয় উৎস থেকে। প্রকল্পটি তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবেÑ প্রথম ধাপ ২০২৫ থেকে ২০৩০, দ্বিতীয় ধাপ ২০৩০ থেকে ২০৪৫ এবং তৃতীয় ধাপ ২০৪৫ থেকে ২০৫৫ সাল পর্যন্ত। বাস্তবায়ন শেষে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা দেশের জিডিপিতে যুক্ত হবে প্রায় দেড়শ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
জানা গেছে, মহেশখালী নিয়ে মহাপরিকল্পনার মূল চারটি স্তম্ভÑ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন এবং মৎস্য আহরণ। ইতোমধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ দৃশ্যমান হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে গ্যাস বা পারমাণবিক শক্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে পণ্য পরিবহনে সিঙ্গাপুর বা কলম্বো ঘুরে যেতে হবে না, সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানো যাবে, যা ব্যয় ও সময় উভয়ই কমাবে। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্প এবং ফ্রি ট্রেড জোন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমদানি, উৎপাদন ও রপ্তানিতে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আগের পরিকল্পনায় না থাকলেও এবার মৎস্য আহরণকে একটি বড় স্তম্ভ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সমুদ্র থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আহরণের লক্ষ্যে এ খাতকে আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের কাজ করবে মিডা। এ ছাড়া ইকোট্যুরিজম, আবাসন ও নগরায়ণ মিলিয়ে ২০৪৫ সালের পর মহেশখালী ও কক্সবাজার কার্যত একীভূত হয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় জনগণকে উন্নয়নের অংশীদার করা। তৃতীয়ত, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা। মহেশখালী অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, বনভূমি ও সামুদ্রিক পরিবেশকে রক্ষার প্রতি সরকারকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।
নিঃসন্দেহে মহেশখালী-মাতারবাড়ী প্রকল্প বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন যুগের সূচনা করবে। তবে তা টেকসই হতে হলে স্বচ্ছতা, পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা, পরিবেশবান্ধব নীতি এবং স্থানীয় মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। সফল বাস্তবায়ন হলে আগামী প্রজন্ম মহেশখালীকে কেবল একটি শহর নয়, বরং বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসের উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে দেখবে। আমরা মনে করি, এ সুবিশাল কর্মযজ্ঞ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বন্ধু দেশগুলোর সহায়ক ভূমিকা এবং সরকার প্রধানের দূরদর্শী চিন্তা দেশকে আরও এগিয়ে নেবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের নিজেদেরও পরিবর্তন আনতে হবে। নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নেও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। তবে উন্নয়ন সকলের কাম্য, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা চাই, সেই উন্নয়ন যেন ভূমি হারানো, জীবিকা হারানো কিংবা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিনিময়ে না হয়।