পিআর পদ্ধতি
ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৩২ এএম
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী সব সময়ই এক বিতর্কিত অধ্যায়। তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান, পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগিতা, স্বাধীনতার পরে নিষিদ্ধ হওয়া, পরবর্তীতে সামরিক শাসকের ছত্রছায়ায় পুনর্বাসন, কখনও বিএনপির ঘনিষ্ঠ মিত্র আবার কখনও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতÑ সব মিলিয়ে জামায়াতকে প্রায়শই ‘গিরগিটির মতো রঙ বদলানো রাজনৈতিক শক্তি’ বলা হয়। বিশেষ করে বিএনপির আন্দোলনের সময় বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করে তারা কখনও প্রকাশ্যে আবার কখনও গোপনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও নির্বাচন ঘিরে জামায়াতের দ্বিমুখী ভূমিকা আলোচনায় এসেছে। এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচিত হচ্ছে একটি তত্ত্বÑ ‘পিআর সিস্টেম’ যা জামায়াতকে বাঁচিয়ে রাখার একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা আজও জাতির জন্য এক কলঙ্কিত অধ্যায়। রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন এবং পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় গণহত্যা পরিচালনাÑ এসব কর্মকাণ্ডের দায় জামায়াত কখনও অস্বীকার করতে পারেনি। সেই বিশ্বাসঘাতকতার দায়েই স্বাধীনতার পরপরই জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বহুদলীয় রাজনীতির সুযোগে তারা আবার রাজনৈতিক মাঠে ফিরে আসে। আওয়ামী লীগ অভিযোগ তোলেÑ ‘জামায়াতকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিল বিএনপি।’ অভিযোগটি একপাক্ষিক হলেও এর বোঝা দীর্ঘদিন বিএনপিকেই বহন করতে হয়েছে। এখান থেকেই শুরু হয় জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশল ও সুবিধাবাদী রাজনীতির নতুন খেলা।
১৯৮০’র দশকে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতৃত্ব দিলেও ১৯৮৬ সালে হঠাৎ করেই জামায়াত নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়। এতে গণআন্দোলনের ভাঙন ঘটে। তখন জামায়াত নেতাদের বক্তব্য ছিল : ‘আমাদের গায়ে ১৯৭১-এর ছুঁচোর গন্ধ আছে; আওয়ামী লীগের পাশে থাকলে সেই গন্ধ থাকবে না।’
কিন্তু বাস্তব ফল হলো সেই সংসদ টেকেনি, আর অব্যাহত আন্দোলনের মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত পতন ঘটে এরশাদের। এখানেই স্পষ্ট হয়, জামায়াত নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় কখনও আন্দোলনকে বিভক্ত করতে, কখনও শাসকের সঙ্গে আঁতাত করতে দ্বিধা করে না।
১৯৯৬ সালে জামায়াত এককভাবে নির্বাচনে লড়লেও মাত্র তিনটি আসন পায়। এরপর ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতায় যায়। ক্ষমতায় অংশীদারত্বের সেই স্বাদ তাদের ভেতরে নতুন লোভ তৈরি করে। কিন্তু সেই সময় থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপি-জামায়াত জোটকে সন্ত্রাসবাদী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয়। একের পর এক সিরিজ বোমা হামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা ইত্যাদি ঘটনায় জামায়াতকে কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনা হয়। এর ফলে বিদেশি কূটনৈতিক চাপও বাড়তে থাকে।
২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল বিএনপিকে দুর্বল করা। খালেদা জিয়া ও তার পরিবারকে ঘিরে মামলা, গ্রেপ্তার, কুৎসা রটনা এবং আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুÑ সবকিছু মিলিয়ে বিএনপি চরম সংকটে পড়ে।
প্রথমে বিএনপি নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেও জামায়াতের চাপেই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ফলাফল হলো, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়। এরপর শুরু হয় বিরোধী দল দমন, গুম, বিচার-বহির্ভূত হত্যা, মামলা ও কারাবাসের অন্ধকার অধ্যায়।
কিন্তু দীর্ঘ ১৭ বছর পর ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী সরকারের পতন হলে আবারও জামায়াত কৃতিত্ব দাবি করতে এগিয়ে আসেÑ যদিও বাস্তবে আন্দোলনের পথে তারা বহুবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো জামায়াত ও আওয়ামী লীগের গোপন আঁতাতের নতুন রূপÑ ‘পিআর’ সিস্টেম। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হারে সংসদে আসন পাবে। জামায়াত দাবি করছে, এই ব্যবস্থাই বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গণতান্ত্রিক দেশে এটি নেই : যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাÑ কোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থায় ‘পিআর সিস্টেম’ নেই। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় প্রার্থীÑ জনসংযোগ ভেঙে পড়ে, জনগণ তাদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
বাংলাদেশের ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে সরাসরি ভোট দিতে চায়। কিন্তু ‘পিআর’ সিস্টেমে কেবল দলকেই ভোট দিতে হবে। এতে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে প্রার্থীর সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যাবে। এই ব্যবস্থায় ছোট ছোট দলগুলোর হাতে ক্ষমতার দরজা খুলে যাবে। তারা তখন ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে আঁতাত করে সরকার গঠন বা ভাঙার খেলায় মেতে উঠবে। ফলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা বেড়ে যাবে। বিশ্লেষকদের মতে, ‘পিআর’-এর মূল উদ্দেশ্য বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে রাখা। কারণ বিএনপি সব সময়ই একটি জনভিত্তিক শক্তি। অন্যদিকে জামায়াত বা এনসিপি জাতীয় ছোট দলগুলো এই কৌশলের মাধ্যমে সংসদে টিকে থাকার সুযোগ খুঁজছে।
ইতোমধ্যে ‘এনসিপি’ নামের নতুন একটি দল আত্মপ্রকাশ করেছে, যা জামায়াত ও সরকারের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে সক্রিয় করা হয়েছে বিশাল সাইবার টিম, যারা বিএনপির বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। এখানে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের হস্তক্ষেপ বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। এবারও ধারণা করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে ভারতের স্বার্থ কাজ করছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনটি মুখ্য শক্তি হলোÑ আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জামায়াত কখনও বিএনপির প্রকৃত মিত্র নয়; আবার আওয়ামী লীগেরও নয়। তারা কেবল নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সুযোগ খোঁজে।
১৯৮৬ সালে যেমন আওয়ামী লীগের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলÑ‘এতে আমাদের গন্ধ থাকবে না’, আজও তারা নতুন রঙ বদলে টিকে থাকতে চাইছে। তথাকথিত ‘পিআর সিস্টেম’-এর দাবি আসলে আরেকটি ষড়যন্ত্র, যা কোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক দেশে নেই। বাংলাদেশে এ ব্যবস্থার প্রয়োগ মানে হবেÑ রাজনৈতিক বিভাজন, অস্থিতিশীলতা এবং বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে রাখার পরিকল্পনা। বাংলাদেশের জনগণের মনে রাখা জরুরিÑ দেশপ্রেমে বলীয়ান রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া বিদেশি প্রভাব ও স্বার্থান্বেষী আঁতাত বারবার দেশকে বিপথে নেবে। যদি সত্যিই ‘বিএনপির বিকল্প বিএনপিই’ হয়, তবে তা প্রমাণ করতে হবে শক্তিশালী সংগঠন, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে। এই সংগ্রাম আজও চলমান।