পরিবেশ
মাহজাবিন আলমগীর
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৩০ এএম
নগরায়ণ এবং আধুনিক জীবনব্যবস্থা নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের কারণে আমাদের দেশের জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশকে স্বভাবতই নগরমুখী হতে হয়। জনসংখ্যার চাপে রাজধানী ঢাকায় নগরায়ণ ঘটেছে একেবারেই অপরিকল্পিতভাবে, যা নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানকে নিম্নমুখী করে তুলেছে। আমাদের প্রাণের শহর দিন দিন পরিণত হচ্ছে বসবাসের অনুপযোগী এবং এখানে নিঃশ্বাস ফেলাই দায় হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে ঢাকা শহরের ৬২ শতাংশ ভূমিই চলে গেছে আবাসিক এলাকার দখলেÑ যার মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ আবাসিক এলাকা বাস্তবায়িত হয়েছে পরিকল্পনা অনুযায়ী আর বাকি ৩৭ শতাংশ অপরিকল্পিত। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার পরিবেশের ওপর পরিচালিত ‘চেঞ্জ ইনশিয়েটিভ’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে গত চার দশকে ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বেড়েছে সাতগুণ, ঢাকার আশপাশের অঞ্চলগুলোর তুলনায় এর ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়েছে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ঢাকা শহরের খাল ও জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে গেছে, মুনাফর অভিপ্রায়ে। একসময় ঢাকা নগরী ছয়টি নদী, শতাধিক খাল এবং অসংখ্য জলাশয়বেষ্টিত ছিল। ফলে তাপমাত্রা বাড়লেও জলীয় বাষ্পের কারণে মেঘের সৃষ্টি হতো, যা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করত। ১৯৮০ সাল থেকে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত ঢাকার জলাশয়গুলো ৬০ শতাংশ কমেছে, বর্তমানে অবশিষ্ট আছে কেবল ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। বৃক্ষরাজি বিলুপ্ত হতে হতে এখন অবশিষ্ট আছে মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। এই হার এতটাই বেড়েছে যে ঢাকার আশপাশের কৃষিজমির পরিমাণ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। অধিকাংশ জমিই চলে গেছে ভূমিদস্যু এবং ফ্ল্যাট নির্মাণকারীদের দখলে।
জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামতে শুরু করেছে। গাছপালা না থাকায় নগরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কৃষিজমিগুলো যতটুকু অবশিষ্ট আছে তাও উর্বরতা হারাতে বসেছে। একদিকে জলাশয়গুলো ভরাট যেমন হয়েছে, পাশাপাশি শহরের অভ্যন্তরের খালগুলো ভরাট করে সংকীর্ণ কালভার্ট ড্রেনেজ ব্যবস্থা পানি নির্গত হওয়ার পথ প্রায় বন্ধ হওয়ার ফলে অল্প বৃষ্টিতেই ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সীমাহীন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগেও ঢাকার মোহাম্মদপুর, আদাবর এলাকা এতটা বৃক্ষহীন ছিল না। এলাকার উন্মুক্ত স্থানগুলো দখল করে নিচু জলাশয়গুলো ভরাট করে ভূঁইফোড় আবাসন মালিকেরা তৈরি করছে একের পর এক বহুতলীয় সুউচ্চ আবাসন প্রকল্প। এসব প্রকল্পে যথেষ্ট বৃক্ষনিধন চলেছে। তথাকথিত নগর উন্নয়নের নামে সারা শহরের সবুজ বৃক্ষ অপসারণের ফলে অতিরিক্ত অবকাঠামোগত নির্মাণ আর প্রাকৃতিক দূষণের মাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নগরবাসীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনা না করেই ক্রমবর্ধমান এসব আবাসন খাত তাদের তৎপরতা জারি রেখেছে। কেননা নগরবাসীর স্বাস্থ্যসমস্যার একটি অন্যতম কারণ নির্মাণকাজের ধুলা-আবর্জনা। সারা বছর ধরেই চলতে থাকা এসব নির্মাণযজ্ঞে অ্যাজমাসহ শ্বাসতন্ত্রীয় অসুখগুলোর প্রকোপ বৃদ্ধির কারণ ঘটেছে। তা ছাড়া এসব নির্মাণাধীন প্রকল্প জনস্বাস্থ্যের পরোয়া করছে না। দিনরাত চলতে থাকে উচ্চমাত্রার শব্দদূষণ।
ঢাকা নগরী দিন দিন পরিণত হচ্ছে বিত্তশালী আবাসন মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা এবং নগরস্থপতিদের অদক্ষতা আর খামখেয়ালিপনার এক নির্মম প্রদর্শনীতে। শহরের ৫০টি থানার ভেতর ৩৭টি থানায় ৯০ শতাংশই কংক্রিটের আচ্ছাদনে ভরে গেছে। আমরা যেন ভুলে না যাই মানুষ প্রকৃতিরই সন্তান। প্রকৃতি বিচ্ছিন্ন হয়ে টিকে থাকা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এ শহরে কান পাতলে এখন আর কাকের ডাকও শোনা যায় না, শোনা যায় না সন্ধ্যাবেলায় ঝিঁঝিঁর শব্দ। ইট, কাঠ, পাথর আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে এতটাই বেঁধে ফেলেছে যে এখানে প্রাণের স্পন্দন পাওয়াই যায় না। সবুজ বৃক্ষরাজি আর অধিকাংশ জলাশয়গুলো হারিয়ে বৃক্ষহীন নীরস এক মরুপ্রান্তরে যেন পরিণত হচ্ছে আমাদের প্রিয় নগরী। জীবনকে অতিশয় গতিশীল আর সুসজ্জিত করতে গিয়ে এই তথাকথিত নগর উন্নয়ন আমাদেরকে মনুষ্য অনুপযোগী নগরবাসী করে তুলেছে? কেননা প্রকৃতি থেকে ক্রমবিচ্ছিন্ন হতে হতে মানুষ এক পর্যায়ে রুক্ষ আর কৃত্রিম হয়ে ওঠে। নগরে আজ প্রাণের ছোঁয়া নেই। রাজধানীর ফুসফুস বলে খ্যাত রমনার মতো দ্বিতীয় একটি পার্ক নেই, যেখানে সবুজ বৃক্ষরাজির ছায়ায় প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কিংবা বোটানিক্যাল গার্ডেনের মতো দুয়েকটি পার্ক যাও বা অবশিষ্ট আছে সেগুলো নগরীর মাদকসেবী আর অপরাধীদের অভয়ারণ্য। শিশুদের খেলার মাঠগুলোও পর্যন্ত নির্বিচারে দখল হয়ে যাচ্ছে।
গাছপালা উজাড় করে, জলাশয়গুলো একে একে ভরাট করে নগর উন্নয়নের নামে আমরা প্রকৃতি বিধ্বংসী মহোৎসবে মেতে উঠেছি, প্রকৃতি তো তার প্রতিশোধ নেবেই। কারণ এর ফলে পরিবেশের সজীব ও নির্জীব উপাদানগুলোর মাঝে যে ভারসাম্য বজায় ছিল তা বিনষ্ট হতে শুরু করেছে। নগরীর জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির কবলে, প্রতিবছরই যেন বাড়ছে দাবদাহের প্রকোপ, জলাবদ্ধতা, ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়ার হার। এক্ষেত্রে দার্শনিক এঙ্গেলসের একটি কথা স্মরণ করা যেতে পারে ‘প্রকৃতির বিরুদ্ধে জয়যাত্রা নিয়ে আমরা যেন খুব উল্লসিত না হই। কারণ প্রতিটি জয়ের জন্য প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নেয়।’ ঢাকা শহরের এই অপরিকল্পিত নগরায়ণ এমন একটি ভারসাম্যহীন অবস্থার দিকে আমাদের ক্রমশ টেনে নিয়ে যাচ্ছে সেখানে আমাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শহরের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ জলাভূমি থাকা দরকার, আমাদের মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ টিকে আছে, গাছপালা বেঁচে আছে ১১ শতাংশেরও কম। ফলে প্রতিনিয়ত এখানকার তাপমাত্রা বেড়ে চলেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকা শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্যগত দিকটি নষ্ট হয়ে যাওয়াটা এখন আর কেবল পরিবেশগত অবক্ষয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই বরং তা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার পর্যন্ত লঙ্ঘন করেছে। এই পরিবেশগত ভারসাম্যহীন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দরকার এখানে জরুরি প্রাতিষ্ঠানিক এবং অবকাঠামোগত পুনর্গঠন।
নগর উন্নয়ন কোনোভাবেই যাতে প্রকৃতি বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে পরিণত আর না হয় সেজন্য পরিবেশগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট মডেলভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। আর দরকার পরিবেশবান্ধব জরুরি পরিকল্পনা আর সেই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য দরকার জনসম্পৃক্ততা আর জনস্বার্থের প্রতি সদিচ্ছা। ঢাকা নগরীর উন্নয়নের অনেক পরিকল্পনাই গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু জনসম্পৃক্ততা না থাকায় একে পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তোলা যায়নি। সমন্বিত গবেষণা আর উদ্যোগ গ্রহণ আজ সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানী ঢাকা তার প্রাণপ্রকৃতিকে হারিয়ে আজ পুঁজিপতিদের মুনাফা বৃদ্ধির এক বিশাল কারখানায় পরিণত হয়েছে। নগরীকে স্বাভাবিক আর মানবিক কারবার দায় যেন কারও নেই। এখন আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের অস্তিত্বের স্বার্থেই এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ না ঘটলে আমাদের আরও চরম মাশুল দিতে হবে। আমাদের প্রিয় নগরীকে বাসযোগ্য করে তুলবার দায় যেমন রাষ্ট্র ও সরকারের, তেমনি আমাদের সবারও।