শিক্ষাঙ্গন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:২৬ এএম
সারা দেশে টহল জোরদারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা অভিযান অব্যাহত থাকলেও জনমনে ভয় আর আতঙ্ক যেন কাটছে না। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। মব হাঙ্গামা, গণপিটুনি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ছেই। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হচ্ছে খুনাখুনিও। সহজ করে বললে মানুষের মধ্যে অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা যেন চরমে পৌঁছেছে। এমন বাস্তবতায় হঠাৎই বুয়েট, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহসহ নানা স্থানে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। নিজস্ব দাবি দাওয়ার ভিত্তিতে আন্দোলন ছাড়াও স্থানীয়দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘাত বাধছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি পক্ষ ছাত্রদের সংঘর্ষে জড়িয়ে বা রাস্তায় নামিয়ে ফায়দা লুটতে চাইছে। ঘটনাগুলোর সূত্রপাত যা-ই হোক, দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বÑ তাদের দায়িত্ব কি ঠিকভাবে পালন করেছে? বলা বাহুল্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষ এবারই নতুন নয়। কিন্তু সংঘর্ষ বন্ধে স্থায়ী কোনো সমাধান এখনও করা যায়নি।
এমন পরিস্থিতিতে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোল বেজে উঠেছে। অন্যদিকে দেশের অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ছাত্র সংসদ’ নির্বাচনের উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ডাকসুকে বলা হয় দেশের ‘দ্বিতীয়’ পার্লামেন্ট। কেউ কেউ ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতা সৃষ্টির সাপ্লাই লাইনও বলেন ডাকসুকে। উল্লেখ্য, এ নির্বাচন সামনে রেখে উৎসবমুখর প্রচারণার পাশাপাশি নানা ভয় ও শঙ্কা কাজ করছে। এ কথা সত্য যে, জাতীয় রাজনীতিতে যে ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনগুলোকে প্রভাবিত করবে, এটাই স্বাভাবিক। আর সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এসব পরিস্থিতি সামাল দেওয়া চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ যেকোনো বিষয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে প্রশাসনকে। ২ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঘিরে বাড়তি সতর্কতা, নজরদারি জোরদার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে এসেছে। আমরা মনে করি, কোনো রাজনৈতিক দল বা পক্ষের এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা উচিত হবে না, যাতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত কিংবা বিলম্ব হয়। যদিও প্রশাসন বলছে, সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঘিরে বাড়তি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে র্যাব ও পুলিশ। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। এ ছাড়া গুজব সৃষ্টি, জনদুর্ভোগ ও মব ভায়োলেন্সকারীদের (দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা) বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলো।
এ কথা সত্য যে, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি ছাত্রদের গণতান্ত্রিক চর্চা, নেতৃত্ব গঠন এবং ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিচ্ছবিও। দীর্ঘদিন পর যখন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রসমাজের মধ্যে আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা, দলীয় দ্বন্দ্ব এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির শঙ্কা। তখন প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলো প্রায়ই উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়ে। পোস্টারিং, মিছিল-মিটিং, প্রভাব বিস্তারÑ এসবকে কেন্দ্র করে প্রায়ই অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। কখনও কখনও তা সংঘর্ষে রূপ নেয়, যার ফলে শিক্ষাঙ্গনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অতীতে এই ধরনের দৃষ্টান্তও রয়েছে। তবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন তরুণদের দায়িত্বশীলতা শেখায়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চর্চার পথ করে দেয় এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা জাগায়। এটি নেতৃত্ব তৈরির এক অমূল্য ক্ষেত্রও। দেশের অনেক জাতীয় নেতা এই ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে উঠে এসেছেন। তাই ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেবল সংঘর্ষ বা দ্বন্দ্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ঠিক হবে না; বরং গণতন্ত্রের অনুশীলনের সুযোগ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
আমরা মনে করি, ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে সংঘাতমুক্ত রাখতে সব পক্ষেরই দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ছাত্র সংগঠনগুলোরই বেশি দায়িত্ব ক্যাম্পাসে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার। সব ধরনের উস্কানি উপেক্ষা করে উত্তেজনা সৃষ্টির প্রবণতা থেকে মুক্ত থাকতে হবে সব পক্ষকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দৃঢ় এবং সংযত ভূমিকা পালন করতে হবে। বলে রাখা ভালো, ডাকসু নির্বাচনসহ যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে, সেসব নির্বাচনগুলোর অবাধ ও সুষ্ঠুতার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী জাতীয় নির্বাচন। তাই এ নির্বাচনগুলোকে একটি মডেল হিসেবে প্রমাণ করাই হবে দায়িত্বশীল কাজ, যাতে ভবিষ্যতের সব নির্বাচনেই শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সবাই উৎসাহী হতে পারে।
আমরা আরও মনে করি, ছাত্র সংসদ নির্বাচন কেবল আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রাজনীতির হিসাব-নিকাশও যুক্ত আছে। রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক যেকোনো ধরনের সহিংসতা হোক না কেন, সরকারকে তা শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় যেমন জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, তেমনি তা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের সূতিকাগার। তাই শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও অবিলম্বে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ধরে রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করবেÑ এটাই আমাদের প্রত্যাশা।