× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অর্থনীতি

খেলাপি ঋণ ও মেরুদণ্ডহীন ব্যাংকিং খাত

ড. মো. আইনুল ইসলাম

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:২৩ এএম

খেলাপি ঋণ ও মেরুদণ্ডহীন ব্যাংকিং খাত

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের অর্থনীতি তথা ব্যাংকিং খাতের সংকট একটি মারাত্মক উদ্বেগজনক চিত্র এঁকেছে। মূল কারণ হলো, লাগামহীন খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থ পাচার। এই অবস্থার ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধন কাঠামো ভেঙে পড়ছে, সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ২৭ শতাংশ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই খেলাপি ঋণ ১ লাখ কোটির বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই সম্পূর্ণ আদায় অযোগ্য। এই বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি বাড়াচ্ছে এবং সম্পদের গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষয় করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, যদি প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ দুজন ঋণগ্রহীতা খেলাপি হয়ে যায়, তবে অন্তত ২৪টি ব্যাংক প্রয়োজনীয় মূলধন ধরে রাখতে অক্ষম হবে। এর ফলে ব্যাংকগুলোতে প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মূলত রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর সীমাহীন লোভ ব্যাংকিং খাতকে জিম্মি করে ফেলেছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলো সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ব্যাংকে গ্রাহকরা তাদের সঞ্চিত অর্থ তুলতে না পেরে হতাশার মধ্যে পড়েছেন। চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের শিক্ষার খরচ, কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য টাকা তুলতে গিয়ে তারা ব্যর্থ হচ্ছেন। ব্যাংকের শাখাগুলোতে দীর্ঘ লাইন, গ্রাহকদের কান্নাকাটি এবং ক্ষোভ এখন প্রতিদিনের দৃশ্য। এই দৃশ্য অন্য ব্যাংকের গ্রাহকদের মনেও সঞ্চারিত হচ্ছে। এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং সামাজিক ও মানবিক সংকটও বটে। মানুষ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকলে তা জনমনে আস্থাহীনতা তৈরি করে- যা রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। এমনটি দীর্ঘ সময় চললে অর্থনৈতিক বিপর্যয় দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে ত্বরান্বিত করবে। 

বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংকট কেবল অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার ফল নয়, বৈশ্বিক পুঁজিবাদের অন্ধকার দিকও এতে ভূমিকা রাখছে। রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও কিছু ব্যবসায়ী এলসির আড়ালে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে। গবেষণা বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকা বিভিন্ন মাধ্যমে দেশ থেকে পাচার হয়েছে। এই অর্থ বিদেশি ব্যাংকে জমা থাকছে বা বিদেশে বিলাসবহুল সম্পদ ক্রয়ে ব্যয় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, ট্যাক্স হেভেন দেশগুলোর আশ্রয় এবং বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শোষণমূলক চরিত্র এই অর্থ পাচারকে সহজতর করেছে। একদিকে বৈশ্বিক বাজারে বহুজাতিক কোম্পানি ও ধনী দেশগুলোর প্রভাবশালী নীতি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিকে চাপে রাখছে; অন্যদিকে দেশের ভেতরের দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো সেই চাপকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা বাংলাদেশি টাকার অবমূল্যায়নের চাপ বাড়িয়েছে। আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে টাকার মান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২১.৬০ টাকায়, যা এক বছরের ব্যবধানে ১.৭৬ শতাংশ কম। টাকার এই অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি দ্বিগুণ চাপে ফেলছে সাধারণ মানুষকে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত, যা দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস, এই সংকটের মারাত্মক প্রভাব অনুভব করছে। ব্যাংকগুলো নতুন এলসি খুলতে পারছে না, রপ্তানি আয়ের অর্থ সময়মতো পাচ্ছে না, ফলে কারখানাগুলো শ্রমিকদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছে। ইতোমধ্যেই প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি আয় ৪.৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষ বাড়ছে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা কমছেÑ যা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও রিজার্ভ সংকটে আরও চাপ সৃষ্টি করছে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের কারণে বহুমুখী চাপের ভেতরে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক সংকটকে এ থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না। বৈশ্বিক অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক চাপে রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে উচ্চ সুদের হার নীতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর মূলধনপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। চীনের প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের দাম অস্থিতিশীল করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশেষ করে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও কৃষিখাতের উৎপাদনকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিকে আরও চাপের মধ্যে ফেলছে। পণ্য রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক ঋণের মতো তিনটি প্রধান খাতেই ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। বৈদেশিক ঋণের প্রবাহ কমে আসছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতার কারণে আস্থা হারাচ্ছেন। এর মধ্যে আবার রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অর্থনীতির ভবিষ্যৎকে আরও অন্ধকারে নিমজ্জিত করার চোখ রাঙাচ্ছে। 

সামনের দিনগুলোয় কী হবে, তা সবার জানা। কিন্তু ইতোমধ্যেই অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানপরবর্তী সময় থেকে দেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে রাজনীতি চলছে। আগামী নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়ছে- যা বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার অন্যতম কারণ। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং দুর্বল প্রশাসনিক জবাবদিহি অর্থনীতিকে আরও ভঙ্গুর করে তুলছে। ব্যাংকিং খাত সংস্কার, খেলাপি ঋণ আদায় বা অর্থ পাচার রোধÑ এসব উদ্যোগের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই সংস্কার বাস্তবায়ন অনিশ্চিত। ফলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ধীর হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা অপরিহার্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর কঠোর নিয়ন্ত্রক সংস্কার  আনা হয়েছিল, যা ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করে তোলে। একইভাবে, ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ডে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে বা বন্ধ করে দিয়ে ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠন করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণের বোঝা কমানো সম্ভব হয়। বাংলাদেশের জন্যও খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত সংস্কার এনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো এবং পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অর্থ পাচার রোধে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতা স্থাপন করে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সর্বোপরি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা গেলে তা দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে আস্থা তৈরি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথ খুলে দেবে।

খেলাপি ঋণ, ব্যাংক লুটপাট, অর্থ পাচার এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতি এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। যদি এখনই কাঠামোগত সংস্কার, সুশাসন ও কঠোর জবাবদিহির ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে ব্যাংকিং খাতের এই সংকট পুরো অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলবে। বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং বৈশ্বিক বাস্তবতাকে দক্ষভাবে মোকাবিলা করার ক্ষমতার ওপর। অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের জন্য প্রয়োজন আস্থা, সুশাসন এবং একটি ন্যায্য অর্থনৈতিক কাঠামো। অন্যথায় খেলাপি ঋণ ও ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।

  • অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা