অলিউর রহমান ফিরোজ
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:১৬ এএম
গণমাধ্যমে সেই ১৯৯২ সাল থেকে কাজ শুরু। দীর্ঘ তিন দশকে অনেক জাতীয় পত্রিকায় কাজ করার সুযোগ আমার ঘটেছে। নিজের চোখে দেখেছি সাংবাদিকদের দুঃখ-দুর্দশা চিত্র। ১৯৯২ সালে শক্তি পত্রিকা ছেড়ে দৈনিক আল মুজাদ্দেদ পত্রিকায় কাজ শুরু করি। দেশের প্রথম চার কালারের পত্রিকায়। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ব্যাপক আয়োজন করে পত্রিকাটি। বাজারে মোটামুটি কাটতিও ছিল তখন। কিন্তু তারা পত্রিকাটি একটি দলের মুখপাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেই বাজার হারায়। একসময় একটানা দুই বছর সাংবাদিকরা বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত হন। মালিকপক্ষ বেতন দেন না। কেউ কেউ বিকল্প ব্যবস্থা বেছে নেন। কিন্তু যাদের বিকল্প ব্যবস্থা নেই তাদের কী ভয়াবহ দুঃখ-দুর্দশা তা নিজের চোখে অবলোকন করেছি। সেখান থেকে কাজ শুরু করি মুক্তকণ্ঠে। তা ছিল নামিদামি একটি শিল্পগোষ্ঠীর। কিন্তু সেখানেও কয়েক বছর পর হতাশা বিরাজ করতে থাকে। একসময় সে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। অনেকেই কাজ হারিয়ে বিপাকে পড়েন।
এরপর কাজ শুরু করি দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায়। মালিকপক্ষ ব্যাপক আয়োজন করেন। কিন্তু পত্রিকাটি যাদের হাতে পরিচালনা করতে দিয়েছিলেন তারা গাড়ির তেল খরচ ঘণ্টায় ঘণ্টায় ব্যয় দেখিয়ে টাকা উত্তোলন করতে থাকেন। বিজ্ঞাপনের টাকা লোপাট হয়ে যায়। পরে নিজে বড় দায়িত্ব নিলেও অরাজ্যের ভিড়ে সেখানে টিকতে পারিনি। কাজ শুরু করি দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকায়। সেখানে মোটামুটি পত্রিকায় টাকাতেই সব খরচ হয়েছিল। চলছিলও ভালো। সেখানে টাকা বেহাতের চিত্র ছিল ভয়াবহ।
একে একে অনেকেই ইনডিপেনডেন্ট ছেড়ে চলে গেল। তারপর শুরু করলাম মানবজমিন পত্রিকায়। সেখানকার চিত্র ছিল আরও ভয়ানক। পত্রিকা খরচের বেশিরভাগ টাকাই আসে একটি বড় শিল্প গ্রুপ থেকে। কিন্তু সেখানকার বিজ্ঞাপনের কর্মচারী হবিগঞ্জে নিজ বাড়িতে যান বিমানে চড়ে। তাহলে পত্রিকার আয় কীভাবে বেহাত হচ্ছে তা এ চিত্র থেকেই বোঝা যায়।সম্পাদককে ঘটনাটি বললে তিনি একসঙ্গে ছয়জনকে বের করে দেন। সর্বশেষ একটি বড় পত্রিকার বিজ্ঞাপন ম্যানেজারের আক্ষেপ ছিল বড় ধরনের। প্রথম আলো ছেড়ে একটি বড় শিল্প গোষ্ঠীর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ম্যানেজার জয়েন করেছেন। সেখানেও বেতন অনিয়ম। তার কারণ- পত্রিকা যদি বাজারে কাটতি না থাকে তাহলে বিজ্ঞাপন পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন না পেলে পত্রিকা মালিক পক্ষ কিছুদিন চালিয়ে যখন দেখেন ভর্তুকি দেওয়া ছাড়া পত্রিকা বের করা অসম্ভব তখনই পত্রিকা বন্ধের পাঁয়তারা শুরু করেন। আসলে পত্রিকার দৈন্যদশা মানা যায় না। সামান্য বেঁচে থাকার মতো বেতন-ভাতা যদি পত্রিকাগুলো বহন করতে না পারেন তাহলে পত্রিকা প্রকাশ করা উচিত নয়। দীর্ঘ তিন দশকের অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো ছিল না। বিভুরঞ্জনের মতো অনেকেই আর্থিক অনটনে এখনও ভুগছেন। তাদের হয়তো বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। তাই তাদের প্রতি মালিকপক্ষের একটু সুদৃষ্টি দেওয়া আবশ্যক মনে করছি। নইলে বিভুরঞ্জনের মতো অনেকেই মেঘনা নদীতে নিজেই সলিল সমাধি রচনা করতে পিছপা হবেন না।