সামুদ্রিক বাণিজ্যিক জাহাজ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৫ ১০:৩১ এএম
দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যিক জাহাজ শিল্প সম্ভাবনাময় ও ক্রমবিকাশমান খাত। এই খাতটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয়ভাবে জাহাজ নির্মাণ করে রপ্তানি বাড়ানোর মাধ্যমে একটি প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু হতাশাজনক সংবাদ হচ্ছে, সাফল্যের এই ধারা বিদ্যমান থাকার পরও ‘রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা’য় এক কঠিন সময় পার করছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাসহ সংশ্লিষ্ট খাতে কর ছাড় ও ভ্যাট মওকুফ সুবিধায় বিগত বছরগুলোতে সাফল্যের ছোঁয়া পেয়েছিল এ খাতটি। কিন্তু সম্প্রতি এসব সুযোগ-সুবিধা বাতিল হওয়ায় চরম সংকটে পড়েছে জাহাজ শিল্প। এমন পরিস্থিতিতে এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ফলে কমতে শুরু করেছে দেশীয় পতাকাবাহী সামুদ্রিক জাহাজের সংখ্যা। ২০২৪ সালে যেখানে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজ ছিল ১০২টি, সেখানে এখন কমে ১০০টি। এর মধ্যে মাত্র ৫টি জাহাজ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের। বাকি ৯৫টি জাহাজের মালিক দেশের ১৬টি প্রতিষ্ঠান। গত সাত মাসে কোনো বিনিয়োগ না আসায় কমে যাচ্ছে জাহাজের বহরের আকার।
৩০ আগস্ট আমাদের প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে দেশীয় জাহাজ খাত’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সম্ভাব্য এই খাতটির এক হতাশার চিত্রই যেন উঠে এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই সংকটের কারণ বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বর্তমান সরকার চলমান সুবিধাগুলো বাতিল করে। ১৫ ডিসেম্বর জারি করা আরেক আদেশে শিল্পটিতে সাড়ে ৭ শতাংশ মূসক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সময়ে এসআরও জারির মাধ্যমে আয়কর ছাড়ের সুবিধা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ফলে শিল্পটিতে এখন আয়কর দাঁড়িয়েছে সাড়ে ২৭ শতাংশে। খরচ বেড়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা জাহাজ কিনছেন না। তাই রেজিস্ট্রেশনও হচ্ছে না। আমরা মনে করি, এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার প্রয়োজন ছিল। উল্লেখ করা প্রয়োজন, সমুদ্রগামী জাহাজ পরিবহন শিল্পে দেশি উদ্যোক্তাদের আগ্রহী করে তুলতে ২০১৯ সালে এই শিল্পে ২০৩০ সাল পর্যন্ত আয়কর ছাড়ের সুবিধা ঘোষণা করেছিল বিগত সরকার। একই সময় সমুদ্রগামী জাহাজ পরিবহন শিল্পে ভ্যাট মওকুফ করা হয়। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে এ শিল্পে বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালে সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা ছিল ৩৭টি। আয়কর ছাড়ের সুবিধা এবং ভ্যাট মওকুফ করার পর ৫ বছরের ব্যবধানে ২০২৪ সালে জাহাজ দাঁড়ায় ১০২টিতে। কিন্তু চলতি বছরের গত ৭ মাসে এর অগ্রগতি শূন্য।
ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সূচনা ১৫ থেকে ১৭ শতাব্দীর মধ্যে। ১৮০৬ সালের দিকে চট্টগ্রাম শিপইয়ার্ড ১০০০ টন পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণ করে। একই সময় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জন্য যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করা হয়। তখনকার সময়ে সম্পূর্ণ কাঠের জাহাজ নির্মাণ করা হতো। বর্তমান সময়ে সম্পূর্ণ স্টিলের বডি জাহাজ নির্মাণ করা হচ্ছে। এখন দেশে ছোট-বড় সব মিলিয়ে প্রায় ২০০টি জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব জাহাজ প্রতিষ্ঠান ছোট-বড় যাত্রীবাহী এবং পণ্যবাহী জাহাজ নির্মাণ করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে নির্মিত জাহাজ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এ শিল্পের বিকাশ ঘটে মূলত ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল ও খুলনার মতো শহরগুলোকে কেন্দ্র করে। ‘জাহাজ নির্মাণ শিল্প উন্নয়ন নীতি-২০২০’-এর মাধ্যমে ২০২৫ সালের মধ্যে জাহাজ রপ্তানি থেকে বার্ষিক ৪ বিলিয়ন ডলার আয় করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই লক্ষ্যও কার্যত ব্যাহত। আমাদের আমদানি-রপ্তানি যেই ভলিউম তার মাত্র ১১ শতাংশ নিজেদের জাহাজে পরিবহন করতে পারে। বাকি ৮৯ শতাংশ বিদেশি জাহাজ দিয়ে পরিবহন করা হয়। দেশের জাহাজ দিয়ে শতভাগ করতে হলে ৯০০টির মতো জাহাজ প্রয়োজন। সেখানে এখন রয়েছে ১০০টি। শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করেছিলেন ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের পতাকাবাহী জাহাজ ২০০ ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু ভ্যাট আরোপের কারণে সেটি থেমে গেল। দেশের সামুদ্রিক জাহাজ পরিবহনকে এগিয়ে নিতে আয়কর ছাড়সহ ভ্যাট মওকুফের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, শুধু সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপের কারণেই এখন একটি জাহাজ কেনায় ৫০ কোটি টাকার বেশি খরচ বেড়ে গেছে।
এভাবে একটি ক্রমবিকাশমান শিল্প খাত রাষ্ট্রীয় অবহেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা কাম্য হতে পারে না। হওয়া উচিতও নয়। বিষয়টি এখনই সরকারকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের সুনাম। জাতি হিসেবে গর্ব করার মতো উপলক্ষ। রয়েছে অসংখ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সার্বিক সহযোগিতা পেলে এ খাতে আগামীতে ১ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সম্ভব। বিনিয়োগকারীরা যাতে এ-খাতে আগের মতো এগিয়ে আসে, সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের সে পদক্ষেপ নিতে হবে। সংকটের উত্তরণ চাই, কোনোভাবেই তা জিইয়ে রাখা ঠিক হবে না। আমরা মনে করি, দেশে ও বিশ্ববাজারে অর্থনীতি শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করতে জাহাজশিল্পকে আরও সমৃদ্ধ ও পরিবেশবান্ধব করতে হবে। পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে সঠিক কর্মপরিবেশও। এটা করা গেলে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি দাঁড়াবে ভিন্নরূপ নিয়ে। খাতটি হোক জাতীয় অর্থনীতির নতুন দিগন্ত- এ আমাদের প্রত্যাশা।