বিনিয়োগ প্রস্তাব
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৫ ১১:১৫ এএম
দেশে দীর্ঘদিন বিনিয়োগ খাতে মন্দাভাব চলছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাপক হারে কমে গেছে। যদিও রেমিট্যান্সের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড এবং রপ্তানি খাতের ধারাবাহিক সাফল্যের বদৌলতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনেকটা স্থিতিশীল। অর্থনৈতিক এই অর্জন সত্ত্বেও দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানো যাচ্ছিল না। নতুন নতুন বিনিয়োগে গতি ছিল মন্থর, যা কোনো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিনিয়োগে উৎসাহ বাড়াতে এবং পরিবেশ তৈরির জন্য বিনিয়োগ সন্মেলনসহ নানাবিধ চেষ্টা চালায়। কিন্তু তা সত্ত্বেওÑ এই খাতে আশানুরূপ সাফল্যের কথা শোনা যাচ্ছিল না। এমন বাস্তবতায়, বিনিয়োগ নিয়ে সুসংবাদের বার্তা পাওয়া গেল। জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশ ১.২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব পেয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৪৬৫ মিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগের। সংবাদটি দেশের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ ও শিল্পায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরা যায়। এই প্রস্তাব যে, দেশের বিনিয়োগ খাতে নতুন আস্থা ও আগ্রহের প্রতিফলন ঘটাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা সরকার এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (বিডা) সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। ২৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ সমন্বয় কমিটির ৫ম সভায় এ তথ্য জানানো হয়।
২৯ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘১২৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রাপ্ত বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ মোট ৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এ ছাড়া স্থানীয় বিনিয়োগ মোট ৭০ কোটি ডলার এবং যৌথ বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের। বিদেশি বিনিয়োগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৩০ কোটি ৩০ লাখ ডলারের প্রস্তাব এসেছে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। জানা যায়, প্রস্তাবিত বিনিয়োগের প্রায় ৬০ শতাংশ বর্তমানে অনুসন্ধানমূলক বা যথাযথ পরিশ্রমের পর্যায়ে রয়েছে। রয়েছে সম্ভাব্যতা অধ্যয়ন, প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা এবং প্রাথমিক প্রকল্প পরিকল্পনা। প্রাপ্ত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ অগ্রসর পর্যায়েরÑ যার মধ্যে রয়েছে স্বাক্ষরিত চুক্তি, জমি ইজারা নিশ্চিতকরণ এবং বরাদ্দপত্র। আমরা মনে করি, যদি এই গতি অব্যাহত থাকে এবং সুবিধা প্রদান আরও সুগম হয়, তাহলে আগামীতে আরও কার্যকর ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। সেজন্য কেবল বিনিয়োগের পরিমাণের ওপর নয়, বিনিয়োগের মান এবং স্থায়িত্বের ওপর নজর দেওয়া জরুরি।
প্রস্তাবগুলো বিনিয়োগে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করলেও এখনও রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এ ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা। অর্থনীতিবিদ ও বিনিয়োগ সংশ্লিষ্টরাও মনে করেন, দেশে সকল ধরনের বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। তারা এও মনে করেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে দেশকে দীর্ঘদিন বিনিয়োগ সংকটে ভুগতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, এখনই বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানো না গেলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। এমনিতেই দেশে বিনিয়োগের হার বেশ কয়েক বছর ধরে নিম্নগামী। রয়েছে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, উচ্চ সুদের হার, তারল্য সংকট ও চাপের মুখে থাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থা উন্নয়নের পথে অন্তরায়ের বিষয়ও। পাশাপাশি, আগের সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলÑ এমন অনেক ব্যবসায়ী এখন কার্যক্রম বন্ধ করেছেন অথবা সমস্যায় পড়েছেন, যা বিনিয়োগকে আরও নিরুৎসাহিত করছে। এসব সমস্যার মোকাবিলায় সরকারকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টিতে প্রাধান্য দিতে হবে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কমানো ও ব্যবসা করার পথে বাধাগুলোকে দূর করার বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীর মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু নীতিমালা বিনিয়োগ পরিপন্থী। সরকারের উচিত হবে, বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে নীতিমালাকে আরও ব্যবসাবান্ধব করার পদক্ষেপ নেওয়া।
এ কথা সত্য যে, অধিকাংশ বিনিয়োগকারী এখনও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। চূড়ান্ত বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে তারা যাবেন, দেশ যখন স্থিতিশীল পর্যায়ে যাবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো দেশে বিনিয়োগ প্রবাহ মসৃণ হয় না। অনিশ্চয়তা থাকলে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। তবে সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কাঙ্ক্ষিত স্পষ্টতা এসেছে, যা ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। সংবাদটি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে, বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ত্বরান্বিত হবে। আমরা মনে করি, কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নযোগ্য ও পরিমাপযোগ্য পরিকল্পনাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে পারে।
বাস্তবতা হচ্ছে, বিনিয়োগ আরও বাড়বে, যখন আমরা একটা বিনিয়োগানুকূল পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারব। ভুলে গেলে চলবে না, দেশের অর্থনীতির প্রধান সমস্যা এখন অনিশ্চয়তা। তাই যেকোনো মূল্যে এই অনিশ্চয়তা দূর করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হবে। এসব সমাধানের পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে একটি সেতুবন্ধ গড়ে তুলতে পারলেই আরও বিদেশি বিনিয়োগ আসা সহজ হবে। আশা করি, সরকার বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে সর্বাত্মক সচেষ্ট হবেন।