মোজাহিদ হোসেন
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৫ ১১:০৮ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৮টি। এর মধ্যে ১৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই। সেগুলোতে ভাড়া করা ভবনে শিক্ষাকার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় একটি। স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও কর্তৃপক্ষ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের বুড়ি পোতাজিয়ার চলনবিলের অংশে ১০০ একর জায়গা ভরাট করে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করতে চায়। ইতোমধ্যে সব বন্দোবস্ত শেষের দিকে। কিন্তু এর মাধ্যমে আমরা কী পাচ্ছি? দেশের শিক্ষার মান বৃদ্ধি হচ্ছে নাকি প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট হচ্ছে?
চলনবিল বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিল এবং সমৃদ্ধ জলাভূমি। ৬টি জেলার ৪১ উপজেলার ১ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে চলনবিল। চলনবিলে ১০৫ প্রজাতির দেশি মাছ, ২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৭ প্রকারের উভচর প্রাণী, ৩৪ প্রজাতির পাখি এবং অসংখ্য জলজ উদ্ভিদ রয়েছে। এ জায়গায় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনা নিয়ে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০০ একরের মধ্যে ইতোমধ্যে ৪ একর ভরাট করার কারণে বড়াল নদের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাকি ৯৬ একর ভরাট করা হলে বর্ষাকালে চলনবিল ও বড়াল নদের পানিপ্রবাহ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শুষ্ক মৌসুমে জায়গাটি গোচারণ ভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এখানে স্থাপনা হলে গোচারণ ভূমির পরিমাণ কমে আসবে। জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়বে। পরিবেশ ও পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘এভাবে পানিপ্রবাহের স্থানে বাধা তৈরি করে কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণ করা হলে সেটি একদিকে চলনবিলের জলজ বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, অন্যদিকে পানির এই শক্তিশালী প্রবাহ বাধা পেলে তা আশপাশের এলাকার জন্য জলাবদ্ধতা ও বন্যার প্রকোপ বাড়িয়ে তুলবে।’
বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাব নেই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়েও মান নেই, শিক্ষারও মান নেই। দেশের বিভাগীয় শহর শেষ করে জেলা-উপজেলা শহরে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ চলছে। অথচ শিক্ষার মান তলানিতে। এভাবে গণহারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে কর্তৃপক্ষ কি শিক্ষার মান বৃদ্ধি করতে চায়? বর্তমান বাংলাদেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তো আছেই। এছাড়া রয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক কলেজ, যেগুলোতে সম্মান স্নাতক পড়ানো হয়। কিন্তু সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতখানি উন্নত! কতখানি শিক্ষার্থীদের উপযোগী! সবাই জানি বাংলাদেশে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই দিকেই যদি তাকাই তাহলে বোঝা যাবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় কতটুকু শিক্ষার্থী উপযোগী! এরপর বাংলাদেশের ক্যামব্রিজখ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়েই সমস্যা লেগে আছে। আবাসিক সমস্যা, হলগুলোতে খাবার সমস্যা, অস্বাস্থ্যকর খাবার, নিরাপত্তাহীনতা, ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষক-রাজনীতি ইত্যাদি লেগেই আছে। অথচ সেগুলো কর্তৃপক্ষের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নতুন করে আরও বিশ্ববিদ্যালয় তৈরিতে ব্যস্ত। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তো একাডেমিক বিল্ডিং পর্যন্ত নেই। পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা সমাধান না করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে কি কর্তৃপক্ষ দেশের শিক্ষার মান বাড়াচ্ছে নাকি তলানিতে নিয়ে যাচ্ছে!
বিশ্বের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিংয়ে সামনের সারিতে কখনও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে? পায়নি। কারণ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই যোগ্যতা নেই। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং অনুযায়ী ‘২০২৫ সালে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। আবার এশিয়া অঞ্চলে সেরা ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও বাংলাদেশের কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জায়গা হয়নি। আবার বিশ্বের সব দেশের বিশ্ববিদ্যালয় জরিপে যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডসের (কিউএস) র্যাঙ্কিংয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বের সেরা ৬০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংস ২০২৬ : টপ গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিস’-এর তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবারের অবস্থান ৫৮৪তম।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেসব সমস্যা আছে, তা চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। আবাসন সমস্যা দূর করতে হবে। শিক্ষার্থীদের গবেষণার উপকরণাদিসহ সব দিক দিয়ে সুযোগ প্রদান করতে হবে। ক্যাম্পাসে রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ দক্ষতার সহিত করতে হবে। ক্যাম্পাসগুলোকে ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। আধুনিকায়ন করতে হবে। জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। আমরা মনে করি, প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে শিক্ষার মান তলানিতে নিয়ে যাওয়ার কোনো মানেই হয় না।