× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

ভূঁইয়া শফি, সাংবাদিক

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৫ ১০:৩৯ এএম

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ০০:০৭ এএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন- যা বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের একটি অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। এই বন তার জীববৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং চিত্রা হরিণের জন্য। সেই সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান আশ্রয়স্থল। কিন্তু এই অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে এক কালো অধ্যায়ের নাম ‘দস্যুতা’। জেলে, বাওয়ালি এবং মৌয়ালদের কাছে সুন্দরবন যেমন মায়ের কোল, তেমনি দস্যুদের উপদ্রবে তা একসময় পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে। সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে আবারও ছোট ছোট গোষ্ঠীর উত্থান সেই স্বস্তিতে চির ধরাচ্ছে।

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন দস্যুমুক্ত থাকার পর সুন্দরবনে আবারও নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে করিম শরীফ বাহিনী, দয়াল বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, মামা-ভাগিনা বাহিনী ও কাজল-রনি বাহিনী নামের পাঁচটি দস্যু বাহিনী। এসব বাহিনীর সদস্যরা জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ চাইছে। না হলে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। কোনো রকমে অনেকে মুক্তিপণের অর্থ জোগাড় করছেন। দস্যুরা জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে। আর তা না দিলে তাদের ওপর নেমে আসছে দস্যুদের নির্যাতন। 

সুন্দরবনের দস্যুতার ইতিহাস বেশ পুরনো। এর ভৌগোলিক গঠনই যেন অপরাধীদের জন্য এক প্রাকৃতিক দুর্গ। অসংখ্য নদী-খাল, ঘন জঙ্গল আর জনবিচ্ছিন্ন দুর্গম এলাকাগুলো দস্যুদের আত্মগোপন এবং কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য আদর্শ স্থান। দারিদ্র্য, বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে আশির দশক থেকে এখানে সংঘটিত দস্যুতার বিস্তার ঘটতে থাকে। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বাংলাদেশ সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তৎকালীন সরকারপ্রধান ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আওতায় র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, পুলিশ এবং নৌবাহিনীর সম্মিলিত অভিযানে একের পর এক দস্যু আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এই অভিযানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল দস্যুদের আত্মসমর্পণের সুযোগ প্রদান এবং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চাপ এবং সরকারের মানবিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে। সরকার তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা নিষ্পত্তিতে সহায়তা এবং আর্থিক অনুদান দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ করে দেয়। 

২০১৮ সালের ১ নভেম্বর, তৎকালীন সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেন, যা ছিল এক ঐতিহাসিক সাফল্য। এর ফলে সুন্দরবনের জলে-জঙ্গলে ফিরে এসেছিল স্বস্তি, জেলেরা নির্ভয়ে মাছ ধরতে পারত এবং পর্যটকদের আনাগোনাও বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু সেই স্বস্তির অধ্যায় যেন আবারও হুমকির মুখে। সম্প্রতি সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ছোট ছোট দস্যু গোষ্ঠীর তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের অনেকেই সরকারের দেওয়া পুনর্বাসনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও, কেউ কেউ পুরনো পথে ফিরে যাচ্ছে। তারা সুযোগ বুঝে জেলেদের নৌকা থেকে মাছ, কাঁকড়া এবং অন্যান্য সম্পদ লুট করছে। তাদের কাজের ধরন কিছুটা ভিন্ন; তারা বড় আকারের অপহরণের চেয়ে ছোটখাটো লুটপাট ও চাঁদাবাজিতে বেশি মনোযোগী। 

সুন্দরবনের দস্যুতা কেবল একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এর প্রভাব বহুমাত্রিক। এর অর্থনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর। জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালিদের আয়ের একটি বড় অংশ দস্যুদের হাতে চলে যায়, এতে তাদের পারিবারিক অর্থনীতি ভেঙে পড়ে এবং জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সামাজিক প্রভাব হিসেবে সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলোতে এক ধরনের ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করে, যা অনেক পরিবারকে পেশা পরিবর্তন বা এলাকা ছাড়তে বাধ্য করে। পরিবেশগতভাবেও এর প্রভাব মারাত্মক। দস্যুরা প্রায়শই অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী শিকার এবং বনজ সম্পদ পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকে, যা সুন্দরবনের সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। এ ছাড়া সুন্দরবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে পর্যটকদের আগমন কমে যায়, যা এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের বিকাশে বড় বাধা সৃষ্টি করে।

সুন্দরবনকে চিরতরে দস্যুমুক্ত রাখতে হলে একটি বহুমাত্রিক ও টেকসই পরিকল্পনা দরকার। শুধু শক্তি প্রয়োগ বা অভিযান দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এই লক্ষ্যে, প্রথমত আইন প্রয়োগ ও নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। র‍্যাব, কোস্ট গার্ড ও পুলিশের সমন্বয়ে সুন্দরবনের দুর্গম এলাকাগুলোতে নিয়মিত ও আকস্মিক টহল বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, যেমনÑ ড্রোন ও জিপিএস ট্র্যাকিং ব্যবহার করে দস্যুদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এর পাশাপাশি, আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের জন্য শুধু এককালীন আর্থিক সহায়তা নয়, বরং তাদের দক্ষতা অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। 

সুন্দরবন আমাদের জাতীয় অহংকার এবং প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। একে সুরক্ষিত রাখা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। অতীতে সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো দস্যু দমনে যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু সেই সাফল্যকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে সমস্যার মূলে হাত দিতে হবে। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিক পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে একটি সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই সুন্দরবনের আকাশ থেকে দস্যুতার কালো মেঘ চিরতরে সরে যাবে। ফিরে আসবে সেই দিন, যেদিন কোনো জেলে বা মৌয়ালকে জীবন হাতে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে বের হতে হবে না। সুন্দরবন তার সব সৌন্দর্য ও সম্ভাবনা নিয়ে বেঁচে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা