কৃষি অর্থনীতি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৫ ১২:২৭ পিএম
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত কৃষি ও কৃষক। দেশের কৃষিনির্ভর উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা এখনও জাতীয় অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। সহজ করে বললে, কৃষি দেশের ক্রমবর্ধন জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণের অন্যতম অবলম্বন। চলমান অর্থনৈতিক সংকটে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এখনও মূল্যস্ফীতি তথা খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির দিকে। তাই উৎপাদন বাড়ানো এবং উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে আধুনিক যান্ত্রিক কৃষি-কৌশল গ্রহণের বিকল্প নেই। এমন বাস্তবতায় দেশের কৃষি-প্রযুক্তির নতুন সংযোজন হলো কৃষক পর্যায়ে ‘মিনি কোল্ডস্টোরেজ’। যার পরিচিতি ‘ফারমার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজ’ নামে। এটি টেকসই, বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী ও কৃষিবান্ধব। ২৭ আগস্ট, মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার ধল্লা ইউনিয়নের মেদুলিয়ায় এই ‘মিনি কোল্ডস্টোরেজ’-এর উদ্বোধন করেন কৃষি উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। প্রাথমিকভাবে সারা দেশে ১০০টি ফারমার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজ বিতরণ কার্যক্রম চলমান। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে। জানা যায়, ঢাকার সাভারের রাজালাখ হর্টিকালচার সেন্টারে দুটি কোল্ডস্টোরেজ আট মাস ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নিয়ে এলো এই প্রযুক্তি।
উল্লেখ্য, দেশে সবজি সংরক্ষণের হিমাগার ছিল না। আশা করা যায়, এটি কৃষকের ফসল সংরক্ষণে বড় পরিবর্তন আনবে, যা কৃষকের জন্য আশীর্বাদই বটে। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে কৃষি মন্ত্রণালয় বাস্তবায়িত ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ডস্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি প্রকল্প’-এর আওতায় কৃষকরা এতে মৌসুমে বাড়তি সবজি সংরক্ষণ করে পরে বাজারজাত করার সুযোগ পাবেন। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ উদ্যোগ সবজি সংরক্ষণে দেশে বড় পরিবর্তন আনবে, অপচয় কমাবে, দামের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করবে এবং কৃষকের আয় বাড়াবে। ২৮ আগস্ট আমাদের প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘এবার কৃষকের হাতে মিনি কোল্ডস্টোরেজ’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, এই প্রযুক্তি কৃষকের ঘরেই স্থাপন করা সম্ভব। প্রচলিত কোল্ডস্টোরেজের তুলনায় এই মিনি সংস্করণের খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ কম। এটি বছরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমায়, যা ১৪০-১৬০টি গাছের সমান পরিবেশবান্ধব সুবিধা। প্রকল্পের তথ্যানুযায়ী, এটি পুরোপুরি কৃষকবান্ধব প্রযুক্তি। বাংলাদেশের কৃষিকাজের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। এতে স্থানীয় এবং আমেরিকান হাই-টেক ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে। ঘরভিত্তিক টিএসসিআর এবং কন্টেইনারভিত্তিক টিএসসিসিÑ দুটি মডেলের কোল্ডস্টোরেজ তৈরি করা হয়েছে। সোলারচালিত এ প্রযুক্তিতে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ইন্টারনেটভিত্তিক এবং রিয়েল টাইম তদারক সুবিধা থাকায় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঘরে বসে এই মিনি কোল্ডস্টোরেজ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
বলা বাহুল্য, গত এক দশকে প্রযুক্তির কল্যাণে সবজি উৎপাদনে কৃষকরা বিপুল সাফল্য পেয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মোট সবজির উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৫২ লাখ টন। পাঁচ বছরের ব্যবধানে তা ২০২০-২১ অর্থবছরে দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টনে। পরের পাঁচ বছরে আরও ৫৩ লাখ টন বাড়ে উৎপাদন। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৫০ লাখ টনে। অর্থাৎ গত এক দশকে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় এক কোটি টন। শুধু শীতকাল নয়, সারা বছরই বাজারে মিলছে প্রায় সব ধরনের শাকসবজি। কিন্তু অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে মৌসুমে সবজির দাম পড়ে যায়। কৃষকের হাতে থাকে বিপুল সবজি। সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় বিক্রি করতে হয় পানির দরে। অনেক সময় ক্ষেতেই ফসল নষ্ট হয়। এমন পরিস্থিতিতে কৃষিপণ্যের অপচয় রোধ এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হিমাগার বা শীতল সংরক্ষণাগার সময়ের চাহিদা পূরণ করল। এতে কৃষক ফসল তোলার পর পচন রোধ, কৃষকদের পণ্যের দর নির্ধারণে সুবিধাসহ দেশজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সহায়ক হলো। এখন দেখার বিষয়, হিমাগারের পণ্যের উপযোগিতা, কৃষকের সামর্থ্যের উপযোগী খরচ নির্ধারণ এবং বিদ্যুতের অবাধ প্রাপ্যতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। আমরা স্বীকার করছিÑ কৃষকের আয় বৃদ্ধি, ফসলের অপচয় কমানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে এটি একটি যুগান্তকারী সংবাদ।
তবে কৃষকের এই আনন্দ সংবাদের মাঝেও রয়েছে নানা শঙ্কা। দীর্ঘদিন ধরেই কৃষকরা মৌসুমি সবজি ও ফলের ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদন হলে বাজারে দাম পড়ে যায়, আর তখন কৃষকের ফসল লোকসানে বিক্রি করতে হয়। বললে অত্যুক্তি হবে না, দেশের প্রান্তিক কৃষকদের দুঃখ-বেদনার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের। এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, আগাম বন্যা, খরার আশঙ্কা কিংবা ঘূর্ণিঝড়Ñ এসবের মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা। এখনও কৃষক মাঠে নামেন প্রকৃতির ভরসায়। সবারই লক্ষ্য, ফলন শেষে কষ্টার্জিত ফসলের সঠিক মূল্য পাওয়া। তাই সরকারের উচিত, ফসলের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে কৃষকের পাশে থাকা । দেখা দরকার তারা যেন কোনোভাবে নিরাশ না হন। আমরা মনে করি, সময় এসেছে কৃষককে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার। কৃষকের প্রতি সরকারের সুদৃষ্টি দেওয়ার এখনই সময়। আশা করছি, সরকার মিনি কোল্ডস্টোরেজ প্রকল্প কৃষকের কৃষিপণ্য সংরক্ষণসহ ন্যায্য মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করবে। এ এক চমৎকার পদক্ষেপ। এই প্রযুক্তিটি হোক রাষ্ট্রের প্রতি কৃষকের নির্ভরতার প্রতীক।