মব সহিংসতা
এস এম সৈকত
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৫ ১১:৫৪ এএম
বাংলাদেশে ন্যায়বিচার আজ তরুণদের কাছে ভরসার জায়গা নয়, বরং গভীর হতাশার প্রতীক। আদালতের ধীরগতি, রাজনৈতিক প্রভাব, বৈষম্যমূলক রায় এবং রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার অভাব এক প্রজন্মকে শিখিয়েছে যে আইন নয়, জনতার হাতে ‘তাৎক্ষণিক শাস্তি’ই কার্যকর। আর সেই শাস্তি এখন মব সহিংসতার ভয়ংকর মহামারিতে রূপ নিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত অন্তত ১১১ জন মানুষ গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছে। সংখ্যাটি নিছক পরিসংখ্যান নয়, বরং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার কাঠামোর প্রতি জনগণের অবিশ্বাসের নগ্ন প্রতিফলন। মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে সোহাগ হত্যাকাণ্ড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তোফাজ্জল হত্যা, কিংবা চট্টগ্রামে কিশোর মাহিনকে পিটিয়ে হত্যা; সবই প্রমাণ করে, এই সহিংসতা কোনো শ্রেণি, বয়স বা প্রজন্মকে রেহাই দিচ্ছে না। এই ভয়াবহ বর্তমানকে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি বৈষম্য-বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সহিংসতায় এত এত মানুষের মৃত্যু এবং দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা তরুণদের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের ধারণা মতে, মাত্র তিন সপ্তাহে প্রায় দেড় হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে। অথচ এখন পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে তরুণ প্রজন্মের মনে বদ্ধমূল হয়েছেÑ আইন দিয়ে ন্যায় পাওয়া যায় না।
কিন্তু এ সংকট কেবল বর্তমানের ফল নয়। বিচারব্যবস্থার পতন এক দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা। ওয়ার্ল্ড রুল অফ ল ইনডেক্স-এ বাংলাদেশ ২০২৪ সালে ১৪২ দেশের মধ্যে ১২৭তম স্থানে, স্কোর মাত্র ০.৩৮ (১.০০-এর মধ্যে)। ২০১৬ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নমুখী। বিশেষত, মৌলিক অধিকার, বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা ও আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা, দুর্নীতিÑ এসব বিভাগে ধারাবাহিক অবনতি ঘটেছে। এই পরিসংখ্যানই তরুণদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়Ñ মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, সরকারের হস্তক্ষেপে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলায় দ্রুত রায় হয়, সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার বিলম্বিত হয়। বৈষম্যমূলক এ অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থাকে অকার্যকর ও অবিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে মব সহিংসতা যেন এক সামাজিক ‘বিকল্প বিচারব্যবস্থা’। অভিযোগ উঠলেই ফেসবুক লাইভ, গুজব বা টিকটক ভিডিও মানুষকে উত্তেজিত করে, জনতা হয়ে ওঠে ‘বিচারক, জুরি ও জল্লাদ’। ফলে অপরাধের বিচার না হয়ে অভিযোগের বিচার হচ্ছে জনতার হাতে। মব সহিংসতা এখন শুধু নগর রাস্তায় নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রাম, এমনকি সামরিক স্থাপনাতেও ঘটছে। রংপুরের তারাগঞ্জে দুই ব্যক্তিকে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনার দায়ে অবহেলার জন্য আট পুলিশ বরখাস্ত হওয়া কিংবা কক্সবাজার বিমানঘাঁটিতে জনতার হামলা প্রমাণ করেছেÑ রাষ্ট্র অনেক সময় উপস্থিত থেকেও অক্ষম।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলোÑ এই ভীতি নারী, শিশু ও প্রবীণদের জীবনকেও সমানভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। একটি মাসিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই মাসে ৫১টি মব আক্রমণে ১৬ জন নিহত ও ৫৩ জন আহত হয়েছেন; একই সময়ে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৩৫২টি। সমাজজুড়ে তৈরি হয়েছে এক সর্বব্যাপী ভীতি, যা ন্যায়বিচারের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে।
তরুণদের আস্থা ক্ষয়ের মূল কারণ চারটি। প্রথমত, বিচারের ধীরগতিÑ যেখানে ভাইরাল ভিডিও ছাড়া মামলা সচল হয় না। দ্বিতীয়ত, অভিযোগের ভিত্তিতে জনতার তাৎক্ষণিক বিচার। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচারের দ্বৈত চিত্রÑ রাজনৈতিক মামলার বিচার ঝুলে থাকে, অথচ সাধারণ মানুষের জীবনে আইন প্রতিদিন ব্যর্থ। চতুর্থত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সময়োচিত ও সাহসী হস্তক্ষেপের অভাব। ফলে তরুণ প্রজন্মের কাছে আদালত নয়, জনতার শাস্তিই বাস্তব মনে হয়।
এই আস্থাহীনতার ভয়াবহ পরিণতি হলো সর্বজনীন ভীতি। পুলিশ ভীত, ছাত্র ভীত, আইনজীবী ভীত, নারী-শিশু ভীত, প্রবীণরাও নিরাপদ মনে করেন না। যখন ভয় সমাজের প্রধান অনুভূতি হয়ে ওঠে, তখন ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি ভেঙে পড়ে। আইন তখন কেবল সংবিধানের পাতায় টিকে থাকে, জীবনে কার্যকর হয় না।
এখন প্রশ্নÑ পথ কোন দিকে? প্রথমত, প্রতিটি মব সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও ধারাবাহিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু স্পিডি ট্রায়ালের ঘোষণা নয়, কার্যকর রায়ের নজির তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবেÑ বডিক্যাম, সিসিটিভি, হটস্পট টহল ও কমিউনিটি পুলিশিং কার্যকর করতে হবে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল গুজব নিয়ন্ত্রণে ‘র্যাপিড রিউমর রেসপন্স’ টিম গঠন ও স্থানীয় ভাষাভিত্তিক কনটেন্ট মডারেশন প্রয়োজন। চতুর্থত, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তাকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে। এবং সবচেয়ে জরুরি হলো শিক্ষাঙ্গনে আইন ও সহমর্মিতা শেখানো, যাতে তরুণরা বুঝতে পারে, গণপিটুনি কোনো ন্যায় নয়, বরং আইনের অবমাননা।
তরুণ প্রজন্ম আজ ন্যায়বিচারে আস্থা হারাচ্ছেÑ এটি কেবল একটি প্রজন্মের সংকট নয়, বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্যই এক ভয়াবহ বিপৎসংকেত। যদি রাষ্ট্র আবারও তরুণদের আস্থা ফিরে পেতে চায়, তবে তাকে নিরপেক্ষতা, ধারাবাহিকতা ও মানবিকতার ভিত্তিতে আইনকে জীবন্ত করতে হবে। অন্যথায়, বাংলাদেশকে আরও দীর্ঘ সময় ধরে ‘মব ন্যায়বিচারের’ অভিশাপ বইতে হবেÑ আর তখন ন্যায়বিচার ইতিহাসের পাতায় হারানো এক মূল্যবোধে পরিণত হবে।